ক্রেনের চাকায় প্রাণ গেল প্রকৌশলীর, অনিশ্চয়তায় ৮ বছরের সন্তানের ভবিষ্যৎ
ডেইলি সান রিপোর্ট, ঢাকা
প্রকাশ: ০৫ নভেম্বর ২০২৬, ১০:২৬ এএম
ছবি: সংগৃহীত
মায়ের জন্য খাবার নিয়ে হাসপাতালে যাচ্ছিলেন প্রকৌশলী এবিএম আহসান উল্লাহ আরিফ (৩৭)। রাজধানীর মগবাজার রেলক্রসিংয়ের কাছে পৌঁছালে ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের নির্মাণকাজে ব্যবহৃত একটি ক্রেন তাঁর মোটরসাইকেলকে ধাক্কা দেয়। এতে সড়কে ছিটকে পড়েন তিনি। এরপর ক্রেনের লোহার চাকা তাঁর শরীরের ওপর দিয়ে চলে যায়। গুরুতর আহত অবস্থায় তাঁকে উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। চার দিন আইসিইউতে মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করে ২২ অক্টোবর মারা যান তিনি।
গত ১৮ অক্টোবর সকাল ৮টার দিকে ঘটে এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনা। দুর্ঘটনায় আরিফের শরীরের নিচের অংশ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ঘটনাস্থলে রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে থাকা তাঁকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যান পথচারীরা। দুর্ঘটনার পর ক্রেনচালক মেহেদী হাসান সানিকে আটক করে পুলিশে সোপর্দ করেন স্থানীয়রা। হাতিরঝিল থানা পুলিশ ক্রেনটি জব্দ করে। ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে চীনা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান সিনোহাইড্রো জেভি। এ ঘটনায় প্রতিষ্ঠানটির নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
নিহত আরিফের ছোট ভাই ডা. এবিএম ইয়াসিন উল্লাহ জানান, তাঁর মা সেলিনা বেগম নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে রাজধানীর ইউনিভার্সেল হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন। মুগদার বাসা থেকে মায়ের জন্য খাবার নিয়ে যাচ্ছিলেন আরিফ। সেই খাবার খেয়েই মায়ের সকালের নাশতা করার কথা ছিল। চার দিন পর মা সুস্থ হয়ে উঠলেও ভাইকে আর বাঁচানো যায়নি। ছেলের মৃত্যুর খবর পাওয়ার পর মায়ের শারীরিক অবস্থারও অবনতি হয়েছে।
আহসান উল্লাহ আরিফ মতিঝিল আইডিয়াল স্কুল ও নটর ডেম কলেজে পড়াশোনা শেষে স্টামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পুরকৌশলে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। পরে নিজেই একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। স্ত্রী ও আট বছর বয়সী ছেলে তাফরেজউল্লাহ আরশকে নিয়ে ছিল তাঁর সংসার। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকে হারিয়ে এখন অনিশ্চয়তায় পড়েছে স্ত্রী ও সন্তানের ভবিষ্যৎ।
নিহতের ফুফাতো ভাই সাদেক হোসেন ভুঁইয়া বাদী হয়ে গত ১৯ অক্টোবর হাতিরঝিল থানায় মামলা করেন। মামলার তথ্য অনুযায়ী, দুর্ঘটনায় রাইড শেয়ারিং মোটরসাইকেলের চালক ফারুক মিয়াও গুরুতর আহত হন। তবে প্রাণে বেঁচে যান তিনি।
ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্যদের দাবি, দুর্ঘটনার সময় সকাল ৮টার দিকে সড়কে তেমন যানবাহন বা মানুষের ভিড় ছিল না। তাঁদের মতে, ক্রেনচালকের অবহেলা ছাড়া এ ধরনের দুর্ঘটনার অন্য কোনো কারণ থাকতে পারে না। ওই সময় রেললাইন দিয়ে কোনো ট্রেন চলাচলের খবরও তাঁরা পাননি।
সাদেক হোসেন বলেন, আরিফের স্ত্রী ও ছোট সন্তানের সামনে এখন অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ। পরিবারের এই ক্ষতি কোনোভাবেই পূরণ হওয়ার নয়।
ক্রেন দুর্ঘটনায় আরিফের মৃত্যুর ঘটনায় করা মামলার তদন্ত কর্মকর্তা হাতিরঝিল থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মো. সুমন বলেন, মামলার তদন্ত চলছে। সাক্ষীদের সঙ্গে কথা বলা হচ্ছে। অভিযোগপত্র দিতে আরও কিছুটা সময় লাগবে।
এ বিষয়ে ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে প্রকল্পের পরিচালক মো. মোরতোজা ও তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মাহমুদুর রহমানের সঙ্গে মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁদের পাওয়া যায়নি।
গত সোমবার ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান সিনোহাইড্রো জেভির গুলশানের ১১৩ নম্বর সড়কের ৪/এ হোল্ডিংয়ে অবস্থিত কার্যালয়ে গেলে সাংবাদিক পরিচয় পেয়ে প্রবেশ করতে দেওয়া হয়নি। অভ্যর্থনাস্থলে দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা জানান, সাংবাদিকদের কার্যালয়ে প্রবেশ করতে দেওয়া কিংবা কোনো কর্মকর্তার সঙ্গে দেখা করার অনুমতি না দেওয়ার নির্দেশনা রয়েছে।
সিনোহাইড্রোর অবহেলায় আগেও প্রাণহানি
ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের নির্মাণকাজে দুর্ঘটনায় প্রাণহানির ঘটনা এটিই প্রথম নয়। এর আগেও পর্যাপ্ত নিরাপত্তাব্যবস্থার অভাবে প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। তবে এসব দুর্ঘটনার পরও নির্মাণকাজে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়টি যথাযথ গুরুত্ব পায়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।
২০২৩ সালের ২৯ মে রাজধানীর মহাখালীতে এক্সপ্রেসওয়ের নির্মাণকাজ চলাকালে ওপর থেকে একটি রড পড়ে ১২ বছর বয়সী এক শিশুর মৃত্যু হয়। রডটি শিশুটির মাথায় ঢুকে গিয়েছিল।
এর আগে ২০২২ সালের ১৫ আগস্ট রাজধানীর উত্তরায় বাস র্যাপিড ট্রানজিট (বিআরটি) প্রকল্পের নির্মাণকাজ চলাকালে ক্রেন থেকে একটি গার্ডার ছিঁড়ে নিচে থাকা প্রাইভেটকারের ওপর পড়ে। এতে গাড়িতে থাকা চালকসহ পাঁচজন ঘটনাস্থলেই নিহত হন। নিহতদের মধ্যে ছিলেন একজন পুরুষ, দুজন নারী ও দুটি শিশু। তাঁরা এক আত্মীয়ের বৌভাতের অনুষ্ঠান থেকে ফিরছিলেন। ক্রেন দিয়ে গার্ডারটি ওপরে তোলার সময় তার ছিঁড়ে এ দুর্ঘটনা ঘটে।
মহাখালীর রড পড়ে শিশুর মৃত্যু এবং মগবাজারের ক্রেন দুর্ঘটনা—দুটি ঘটনায়ই চীনা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান সিনোহাইড্রো জেভি শ্যাংডং হাই স্পিড লিমিটেডের নাম এসেছে। অন্যদিকে, উত্তরার বিআরটি প্রকল্পের দুর্ঘটনায় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ছিল চীনা কোম্পানি গাজুবা গ্রুপ করপোরেশন।
তদন্তে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তাব্যবস্থার দুর্বলতা এবং গাফিলতির বিষয়টি উঠে আসে। ঝুঁকিপূর্ণভাবে নির্মাণকাজ পরিচালনার কারণেও দুর্ঘটনাগুলো ঘটেছে বলে উচ্চপর্যায়ের তদন্তে উল্লেখ করা হয়। তবে এসব ঘটনায় এখন পর্যন্ত কারও শাস্তি হয়নি বলে জানা গেছে। আদালতে একটি মামলা বিচারাধীন রয়েছে। এরপরও একের পর এক নির্মাণ দুর্ঘটনা ঘটছে।
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী খন্দকার মাহবুব আলম বলেন, যেকোনো নির্মাণকাজের ক্ষেত্রে নিরাপত্তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ বিষয়ে গণপূর্ত অধিদপ্তরের বিস্তারিত নির্দেশিকা রয়েছে। কোনো উন্নয়নকাজ ঠিকাদারকে দেওয়া হলে সেই নির্দেশিকা অনুসরণ করা বাধ্যতামূলক।
তিনি বলেন, কী ধরনের নির্মাণকাজে কী ধরনের নিরাপত্তাব্যবস্থা নিতে হবে, নির্দেশিকায় তার বিস্তারিত উল্লেখ রয়েছে। এমনকি নির্মাণশ্রমিকদের জীবনবিমা করাও বাধ্যতামূলক। কিন্তু বাস্তবে শ্রমিকদের জীবনবিমা থাকে না। নির্মাণকাজের আশপাশ যেভাবে নিরাপত্তাবেষ্টনী দিয়ে ঘিরে রাখার কথা, অনেক ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান তা-ও করে না। এসব অবহেলার কারণেই বারবার দুর্ঘটনা ঘটছে।