নিম্নমানের পাইপ, পানি সরবরাহে ঘাটতি: ওয়াসার প্রকল্পে বড় অনিয়মের অভিযোগ
প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে নেওয়া প্রকল্পটির লক্ষ্য ছিল পদ্মা নদীর পানি শোধন করে ঢাকায় সরবরাহ করা
ডেইলি সান রিপোর্ট, ঢাকা
প্রকাশ: ০২ নভেম্বর ২০২৬, ০২:৪১ পিএম
ফাইল ছবি
ঢাকা ওয়াসার পদ্মা (যশলদিয়া) পানি শোধনাগার প্রকল্পে নিম্নমানের পাইপ ব্যবহার, সরবরাহ লাইন নির্মাণ না করা এবং নির্ধারিত পরিমাণ পানি সরবরাহ না করেই ঠিকাদারকে বিল ও জামানত পরিশোধের অভিযোগ উঠেছে। সংশ্লিষ্টদের দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, এসব অনিয়মে সম্ভাব্য আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ ১ হাজার ৫৬২ কোটি টাকা।
প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে নেওয়া প্রকল্পটির লক্ষ্য ছিল পদ্মা নদীর পানি শোধন করে ঢাকায় সরবরাহ করা। তবে প্রয়োজনীয় সরবরাহ অবকাঠামো নির্মাণ না করায় প্রত্যাশিত পরিমাণ পানি পাওয়া যাচ্ছে না বলে অভিযোগ রয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ২ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে পাইপ কেনার ক্ষেত্রে ৫০০ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে। ওয়ারেন্টির আওতায় থাকা ত্রুটি ওয়াসার অর্থে মেরামতের পরও ঠিকাদার ৩৬০ কোটি টাকার জামানত তুলে নেন। এ ছাড়া প্রায় ৫০০ কোটি টাকা ব্যয়ে সরবরাহ লাইন নির্মাণ সম্ভব হলেও তা করা হয়নি।
ওয়াসার গড় উৎপাদনের হিসাব অনুযায়ী, প্রকল্পে দৈনিক পানির ঘাটতি ২০ কোটি লিটার। ২০১৯ সালের ১ জুন থেকে ২০২৬ সালের ২৪ অক্টোবর পর্যন্ত ২ হাজার ৭০৩ দিনে ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়ায় ৫৪ হাজার ৬০ কোটি লিটার। এই পানি বিক্রি করা গেলে সম্ভাব্য আয় হতো প্রায় ১ হাজার ৬২ কোটি টাকা। পাইপ কেনায় ৫০০ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ যুক্ত করে মোট অঙ্ক দাঁড়ায় ১ হাজার ৫৬২ কোটি টাকা। তবে এটি সম্ভাব্য বিক্রয়মূল্য ও আত্মসাতের অভিযোগের সমষ্টি, নিরীক্ষিত নিট আর্থিক ক্ষতি নয়।
অনুসন্ধানে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ছোট বোন শেখ রেহানা, ঢাকা ওয়াসার সাবেক এমডি তাকসিম এ খান, প্রকল্প পরিচালক মো. রফিকুল ইসলাম এবং চীনা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের বাংলাদেশ প্রতিনিধি ও পরামর্শক আজিজুল আকিল ডেভিডের বিরুদ্ধে অনিয়ম ও দুর্নীতিতে জড়িত থাকার অভিযোগ উঠেছে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, তাঁদের যোগসাজশে কারিগরি আপত্তি উপেক্ষা করে নিম্নমানের পাইপ ব্যবহার করা হয়।
২০১৪ সালে প্রকল্প পরিচালক প্রকৌশলী এমএ রশীদ সিদ্দিকী কে-৯ ডাকটাইল পাইপের মান নিয়ে আপত্তি জানিয়ে ঠিকাদারকে চিঠি দেন। পরে তাঁকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে রফিকুল ইসলামকে দায়িত্ব দেওয়া হয় বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। রশীদ সিদ্দিকীর দাবি, নিম্নমানের পাইপ গ্রহণে অস্বীকৃতি জানানোয় তাঁকে সরানো হয়েছিল। পাইপের মান বুয়েটে পরীক্ষা করানোর উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা বাস্তবায়িত হয়নি।
সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, পাঁচটি পাম্প একসঙ্গে চালিয়ে সক্ষমতা যাচাইয়ের সময় সঞ্চালন লাইনের দুটি স্থানে পাইপ ফেটে যায়। এতে সড়ক ভেদ করে পানি উঠে আসে এবং একটি ভবনের দেয়াল ভেঙে পড়ে। মেরামতের পর আর পাঁচটি পাম্প একসঙ্গে চালিয়ে পরীক্ষা করা হয়নি বলেও তাঁরা জানিয়েছেন।
প্রকল্পের নির্মাণপদ্ধতি নিয়েও আপত্তি উঠেছিল। ডেনমার্কের পরামর্শক প্রতিষ্ঠান গ্রন্টমিজের বিশেষজ্ঞ বোদো গোপাট একটি নির্মাণপদ্ধতিকে আন্তর্জাতিক মানসম্মত নয় বলে প্রত্যাখ্যান করেন। পরে প্রতিষ্ঠানটি ওই বিশেষজ্ঞকে ফিরিয়ে নেয় বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
প্রকল্পের অনিয়ম ধামাচাপা দেওয়া ও তদন্তে বাধা দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে রফিকুল ইসলাম ও ডেভিডের বিরুদ্ধে।
ডেভিডের বিরুদ্ধে ঠিকাদারি কাজে প্রভাব বিস্তার এবং পরামর্শক নিয়োগে চাপ দেওয়ার অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে ডেভিড বলেছেন, সরকার বিষয়টি তদন্ত করছে এবং তদন্তে যাঁরা দোষী সাব্যস্ত হবেন, তাঁদের শাস্তি হওয়া উচিত। এ বিষয়ে তিনি আর কোনো ব্যাখ্যা দিতে চাননি।
নগর পরিকল্পনাবিদ অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, ওয়াসার কর্মকর্তা, প্রকৌশলী, ঠিকাদার ও সরকারের ঊর্ধ্বতন পর্যায়ের একটি অসাধু চক্র প্রকল্পে দুর্নীতি করেছে। দায়ীদের শাস্তির পাশাপাশি প্রকল্পের সেবা নিশ্চিত করা জরুরি। ওয়াসা বোর্ডের সাবেক চেয়ারম্যান প্রকৌশলী ড. গোলাম মোস্তফাও সরবরাহ লাইন নির্মাণ না হওয়া এবং প্রকল্পের নির্মাণমান নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁর মতে, এ বিষয়ে কারিগরি নিরীক্ষা প্রয়োজন।
স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম জানিয়েছেন, প্রকল্পের অনিয়ম তদন্তে মন্ত্রণালয়ের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছিল। কমিটির প্রতিবেদন দুদকে পাঠানো হয়েছে। দুদকের তদন্তে অনিয়ম প্রমাণিত হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।
সূত্র: বাংলা এডিশন
