মুক্তিযুদ্ধের উত্তাল অক্টোবর: যে বাংলাদেশ আত্মসমর্পণ করেনি
১৯৭১ সালের অক্টোবরে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ এক গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে পৌঁছেছিল
বিশেষ প্রতিনিধি
প্রকাশ: ১৬ অক্টোবর ২০২৬, ১২:৪৯ পিএম
১৯৭১ সালের অক্টোবরে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ এক গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে পৌঁছেছিল। পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর দমন-পীড়নের মুখে মুক্তিবাহিনী গেরিলা অভিযান জোরদার করছিল। লাখ লাখ মানুষ ভারতে আশ্রয় নিয়েছিল। অন্যদিকে বাংলাদেশের অস্থায়ী সরকার আন্তর্জাতিক সমর্থন আদায়ে তৎপর ছিল। ভারতও সম্ভাব্য পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছিল।
১৬ ডিসেম্বর ঢাকায় পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতার চূড়ান্ত বিজয় আসে। কিন্তু অক্টোবর মাসে সেই পরিণতি নিশ্চিত ছিল না। সশস্ত্র প্রতিরোধ, সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ, রাজনৈতিক সংগঠন ও আন্তর্জাতিক কূটনীতি—সব মিলিয়ে মাসটি মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে বিশেষ তাৎপর্য বহন করে।
দমেনি প্রতিরোধ
অক্টোবর নাগাদ মুক্তিবাহিনীর গেরিলা অভিযান বিভিন্ন অঞ্চলে বিস্তৃত হয়। পাকিস্তানি সেনাদের টহলদলের ওপর অতর্কিত হামলা, সামরিক অবস্থানে আক্রমণ এবং রেল, বিদ্যুৎ ও যোগাযোগব্যবস্থায় বিঘ্ন ঘটিয়ে দখলদার বাহিনীর চলাচল ও রসদ সরবরাহে বাধা সৃষ্টি করা হচ্ছিল।
১৬ অক্টোবরের একটি বাংলাদেশ ফোর্সেস বুলেটিনে বলা হয়, অক্টোবরের প্রথম সপ্তাহে চট্টগ্রামে গেরিলা অভিযানে চারটি বিদ্যুৎ উপকেন্দ্র ধ্বংস করা হয়েছিল। এতে বিস্তীর্ণ এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যাহত হয়। ২৫ অক্টোবরের আরেকটি বুলেটিনে বিভিন্ন সেক্টরে অতর্কিত হামলা, পাকিস্তানি অবস্থানে আক্রমণ এবং রেল যোগাযোগ বিঘ্নিত করার তথ্য দেওয়া হয়।
মুক্তিবাহিনীর কৌশল ছিল পাকিস্তানি বাহিনীর চলাচল সীমিত করা, রসদ সরবরাহে বাধা দেওয়া এবং দখলদার বাহিনীর ওপর ক্রমাগত চাপ বজায় রাখা। প্রতিটি অভিযানে যোদ্ধাদের পাশাপাশি সামরিক স্থাপনা ও যোগাযোগপথের আশপাশে বসবাসকারী সাধারণ মানুষেরও ঝুঁকি ছিল।
যুদ্ধের আগুনে পুড়েছিল জনপদ
মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস কেবল সামরিক অভিযান ও ভূখণ্ডের নিয়ন্ত্রণ দিয়ে বোঝা যায় না। এর কেন্দ্রে রয়েছে নিহত মানুষ, পুড়ে যাওয়া ঘরবাড়ি এবং সহিংসতায় বিপর্যস্ত জনপদের অভিজ্ঞতা।
বিভিন্ন বিবরণ অনুযায়ী, ১৪ অক্টোবর পাবনার নাজিরপুরে পাকিস্তানি সেনারা স্থানীয় শান্তি কমিটির সদস্যদের সহায়তায় হামলা চালায়। এতে ৫৭ জন বেসামরিক মানুষ নিহত হন এবং প্রায় ৫০০ বাড়িঘর পুড়িয়ে দেওয়া হয় বলে এসব বিবরণে উল্লেখ রয়েছে।
পাকিস্তানি বাহিনীর দমন অভিযান শুরু হয়েছিল ২৫ মার্চ। পরবর্তী মাসগুলোতে ব্যাপক হত্যাকাণ্ড, যৌন সহিংসতা ও বসতিতে ধ্বংসযজ্ঞের ঘটনা ঘটে। বাঙালি জাতীয়তাবাদী, রাজনৈতিক কর্মী, বুদ্ধিজীবী এবং হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষও বিভিন্নভাবে লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হন।
এই সহিংসতায় বিপুলসংখ্যক মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে ভারতে আশ্রয় নিতে বাধ্য হন। ১৯৭১ সালে প্রায় এক কোটি বাংলাদেশি ভারতে আশ্রয় নিয়েছিলেন। এটি ছিল বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ শরণার্থী সংকট। আশ্রয়শিবিরে খাদ্য, চিকিৎসা ও নিরাপদ পানির সংকট দেখা দেয়। শিশুদের মধ্যে অনাহার ও রোগের ঝুঁকিও বাড়ে।
শরণার্থী সংকট শুধু মানবিক বিপর্যয় ছিল না; এটি ভারতের অর্থনীতি, প্রশাসন ও নিরাপত্তাব্যবস্থার ওপরও ব্যাপক চাপ সৃষ্টি করে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক মহলে বাংলাদেশের পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
নির্বাচনের রায় থেকে স্বাধীনতার সংগ্রাম
মুক্তিযুদ্ধের পটভূমি বুঝতে হলে ফিরে তাকাতে হয় ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনের দিকে। ওই নির্বাচনে শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। কিন্তু ক্ষমতা হস্তান্তর নিয়ে রাজনৈতিক সংকট তৈরি হয়। জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিত করা হলে উত্তেজনা বাড়তে থাকে। এর ধারাবাহিকতায় ১৯৭১ সালের মার্চে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী দমন অভিযান শুরু করে।
বহু বাঙালির কাছে নির্বাচনের রায় অস্বীকারের ঘটনা স্পষ্ট করে দেয়, পাকিস্তানের কাঠামোর মধ্যে রাজনৈতিক অধিকার প্রতিষ্ঠার পথ ক্রমেই সংকুচিত হয়ে আসছে। স্বায়ত্তশাসনের দাবি ধীরে ধীরে স্বাধীনতার সংগ্রামে রূপ নেয়।
অক্টোবরেও শেখ মুজিবুর রহমান পশ্চিম পাকিস্তানে বন্দী ছিলেন। অন্যদিকে, এপ্রিলে গঠিত বাংলাদেশের অস্থায়ী সরকার মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনা এবং আন্তর্জাতিক সমর্থন আদায়ে কাজ করছিল। সরকারের কার্যক্রমের অন্যতম কেন্দ্র ছিল কলকাতা।
অস্থায়ী সরকারের সামনে দুটি বড় চ্যালেঞ্জ ছিল—একদিকে সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক মহলে বাংলাদেশের রাজনৈতিক বৈধতা প্রতিষ্ঠা করা। সরকার বোঝাতে চেয়েছিল, স্বাধীনতার সংগ্রামের ভিত্তি ছিল নির্বাচনে পাওয়া গণতান্ত্রিক ম্যান্ডেট এবং বাঙালির রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা।
ভারত, যুক্তরাষ্ট্র ও কূটনীতির হিসাব
বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামে ভারতের ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। লাখ লাখ শরণার্থীকে আশ্রয় দেওয়া, অস্থায়ী সরকারকে কাজ করার সুযোগ দেওয়া এবং মুক্তিবাহিনীকে প্রশিক্ষণ ও রসদ দিয়ে সহায়তার মাধ্যমে ভারত প্রতিরোধযুদ্ধকে শক্তিশালী করে। একই সময়ে পাকিস্তানের সঙ্গে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনা পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধে রূপ নিতে পারে—এমন আশঙ্কাও বাড়ছিল।
ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী আন্তর্জাতিক মহলের দৃষ্টি সংকটের দিকে ফেরানোর চেষ্টা করেন। তার অবস্থানে শরণার্থীদের নিরাপদে দেশে ফেরার পরিবেশ তৈরি এবং বাঙালি জনগণের ইচ্ছাকে গুরুত্ব দেওয়ার বিষয়টি প্রাধান্য পায়।
অন্যদিকে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন ও তার জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা হেনরি কিসিঞ্জার পাকিস্তানকে গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করতেন। বিশেষ করে চীনের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক স্বাভাবিক করার গোপন কূটনৈতিক উদ্যোগে পাকিস্তান মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করছিল। ফলে পূর্ব পাকিস্তানে দমন-পীড়ন নিয়ে উদ্বেগ থাকা সত্ত্বেও নিক্সন প্রশাসন পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ককে গুরুত্ব দেয়।
মার্কিন প্রশাসনের ভেতরেও এই নীতির বিরোধিতা ছিল। ঢাকায় নিযুক্ত তৎকালীন মার্কিন কনসাল জেনারেল আর্চার ব্লাডসহ কয়েকজন কূটনীতিক সামরিক দমন-পীড়নের মুখে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়ার সমালোচনা করেন। ১৯৭১ সালের এপ্রিলে পাঠানো তাদের ভিন্নমতসংবলিত বার্তা মার্কিন নীতির বিরুদ্ধে কূটনৈতিক প্রতিবাদের গুরুত্বপূর্ণ দলিল।
এদিকে, আগস্টে ভারত ও সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে স্বাক্ষরিত শান্তি, মৈত্রী ও সহযোগিতা চুক্তি আঞ্চলিক কূটনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করে। সংকটের সামরিক ও কূটনৈতিক দিক ক্রমেই পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়ছিল।
৩০ অক্টোবর মার্কিন প্রেসিডেন্ট নিক্সন পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানকে চিঠি লিখে যুদ্ধের ঝুঁকি কমাতে পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান। সীমান্তবর্তী এলাকা থেকে সেনা প্রত্যাহার এবং রাজনৈতিক সমাধানের প্রয়োজনীয়তার বিষয়ও এতে উঠে আসে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের নীতি পাকিস্তানের সঙ্গে তার বৃহত্তর কৌশলগত সম্পর্কের প্রভাব থেকে মুক্ত ছিল না।
বিজয়ের পথ তখনো অনিশ্চিত
অক্টোবরের শেষ দিকে মুক্তিযুদ্ধের সামরিক চাপ ও আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক তৎপরতা—দুটিই বাড়ছিল। ২৮ অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া ধলাই সীমান্ত ফাঁড়িকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষ নভেম্বরের শুরু পর্যন্ত চলে। এতে ভারতীয় ও পাকিস্তানি বাহিনী সরাসরি জড়িয়ে পড়ে। সংকট ক্রমেই দুই দেশের মধ্যে সম্ভাব্য যুদ্ধের দিকে এগোচ্ছিল।
অক্টোবরেও কোনো রাজনৈতিক সমাধান আসেনি। তবে মুক্তিবাহিনীর ধারাবাহিক অভিযান, অস্থায়ী সরকারের তৎপরতা, ভারতের ভূমিকা এবং আন্তর্জাতিক শক্তিগুলোর অবস্থান পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহের ক্ষেত্র তৈরি করছিল।
কেন গুরুত্বপূর্ণ অক্টোবর ১৯৭১
ইতিহাসের স্মৃতিতে ২৫ মার্চ ও ১৬ ডিসেম্বর বিশেষ গুরুত্ব পেলেও মাঝখানের দীর্ঘ সংগ্রামের সময়টিও সমানভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। অক্টোবর ১৯৭১ দেখায়, কীভাবে সশস্ত্র প্রতিরোধ, রাজনৈতিক সংগঠন, আন্তর্জাতিক কূটনীতি এবং সাধারণ মানুষের আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে স্বাধীনতার সংগ্রাম এগিয়ে গিয়েছিল।
মুক্তিবাহিনী পাকিস্তানি সেনাদের ওপর চাপ বজায় রেখেছিল। অস্থায়ী সরকার আন্তর্জাতিক বৈধতা প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেছিল। ভারত শরণার্থী সংকট সামলানোর পাশাপাশি যুদ্ধের সম্ভাবনা বিবেচনা করছিল। অন্যদিকে, বৃহৎ শক্তিগুলোর অবস্থান দেখিয়ে দিয়েছিল, মানবিক বিপর্যয়ের মুখেও কৌশলগত স্বার্থ আন্তর্জাতিক সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করতে পারে।
নতুন প্রজন্মের জন্য এই ইতিহাসের শিক্ষা শুধু মুক্তিযোদ্ধাদের সাহস স্মরণ করার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। কেন তাদের অস্ত্র হাতে তুলে নিতে হয়েছিল, রাজনৈতিক সিদ্ধান্তগুলো কীভাবে যুদ্ধের পথ তৈরি করেছিল এবং সাধারণ মানুষ কীভাবে একটি মুক্তিসংগ্রামকে টিকিয়ে রেখেছিল—এসব প্রশ্নের উত্তর খোঁজাও জরুরি।
এ জন্য প্রয়োজন যুদ্ধকালীন প্রতিবেদন, কূটনৈতিক চিঠিপত্র, প্রত্যক্ষদর্শীর সাক্ষ্য এবং স্বাধীন ঐতিহাসিক গবেষণার পাঠ। সমকালীন সামরিক বুলেটিন ও বিভিন্ন ঘটনার বিবরণকে অন্যান্য প্রমাণের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা প্রয়োজন, যাতে ইতিহাসের তথ্য ও ব্যাখ্যার মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য থাকে।
বাংলাদেশের স্বাধীনতা কোনো স্বয়ংক্রিয় পরিণতি ছিল না। তা অর্জিত হয়েছিল মানুষের সিদ্ধান্ত, সম্মিলিত প্রতিরোধ ও অসীম আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে। অক্টোবর ১৯৭১ সেই দীর্ঘ ও অনিশ্চিত সংগ্রামের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।