নারীস্বাস্থ্যে বৈশ্বিক অংশীদারত্ব ও উদ্ভাবনী অর্থায়নের আহ্বান ডা. জুবাইদার
ডেইলি সান রিপোর্ট, ঢাকা
প্রকাশ: ১২ অক্টোবর ২০২৬, ০৫:২৮ পিএম
বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্যসেবার চাহিদা পূরণে প্রচলিত উন্নয়ন সহায়তা যথেষ্ট নয় বলে মন্তব্য করেছেন জিয়াউর রহমান ফাউন্ডেশনের ভাইস প্রেসিডেন্ট ডা. জুবাইদা রহমান। এ চাহিদা পূরণে নারীস্বাস্থ্য খাতে বৈশ্বিক অংশীদারত্ব ও উদ্ভাবনী অর্থায়ন জোরদারের আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
রবিবার জার্মানির বার্লিনে অনুষ্ঠিত বিশ্ব স্বাস্থ্য সম্মেলনের (ওয়ার্ল্ড হেলথ সামিট) এক উচ্চপর্যায়ের অধিবেশনে বক্তব্য দেন ডা. জুবাইদা রহমান। ‘দ্য মোমেন্ট ইজ নাউ: আনলকিং নিউ ক্যাপিটাল ফর উইমেনস হেলথ বিয়ন্ড এইড’ শীর্ষক এ অধিবেশনে তিনি বলেন, ক্রমবর্ধমান স্বাস্থ্যসেবার চাহিদা পূরণে উদ্ভাবনী অর্থায়ন, জাতীয় পর্যায়ে অঙ্গীকার, সহজ শর্তে বিনিয়োগ, অনুদানভিত্তিক কারিগরি সহায়তা এবং টেকসই অভ্যন্তরীণ সম্পদের সমন্বয় প্রয়োজন।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমান বলেন, ‘ইনশা আল্লাহ, রাজনৈতিক অঙ্গীকার, উদ্ভাবনী অর্থায়ন ও আন্তর্জাতিক অংশীদারত্বের সমন্বয়ে কীভাবে নারীস্বাস্থ্যের উন্নয়ন ঘটানো যায়, বাংলাদেশ তা করে দেখাবে।’
নারীস্বাস্থ্যসেবা জোরদারে বাংলাদেশের পাশে দাঁড়াতে আন্তর্জাতিক অংশীদার, উন্নয়ন অর্থায়নকারী প্রতিষ্ঠান, দাতব্য সংস্থা ও বেসরকারি খাতের প্রতিনিধিদের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।
ডা. জুবাইদা রহমান বলেন, খণ্ডিত ও বিচ্ছিন্ন প্রকল্পের পরিবর্তে শক্তিশালী স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। স্বল্পমেয়াদি সহায়তার বদলে নিশ্চিত করতে হবে টেকসই বিনিয়োগ। পাশাপাশি রাজনৈতিক অঙ্গীকারকে পরিমাপযোগ্য ফলাফলে রূপ দিতে হবে।
তিনি বলেন, নারীস্বাস্থ্যে বিনিয়োগ কেবল স্বাস্থ্যসেবায় ব্যয় নয়। এটি মানবসম্পদ, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ও জাতির ভবিষ্যতের জন্য বিনিয়োগ। বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৫১ শতাংশ নারী। তাই দেশের সামগ্রিক উন্নয়নে নারীস্বাস্থ্য বিশেষ গুরুত্ব বহন করে।
বর্তমান সরকার স্বাস্থ্যব্যবস্থার উন্নয়নে কাজ করছে উল্লেখ করে ডা. জুবাইদা রহমান বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকার মাতৃস্বাস্থ্যের প্রচলিত সেবার পরিধি বাড়াতে অঙ্গীকারবদ্ধ। একই সঙ্গে কিশোরীদের রক্তস্বল্পতা, মাতৃ অপুষ্টি, প্রতিরোধযোগ্য মাতৃ ও নবজাতকের মৃত্যু এবং নারীদের প্রাণঘাতী ক্যানসার মোকাবিলায় বিনিয়োগ বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে।
তিনি বলেন, ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড এবং স্নাতক পর্যায় পর্যন্ত বিনা মূল্যে শিক্ষার মতো সরকারি উদ্যোগ নারী ও মেয়েদের জন্য নতুন সুযোগ সৃষ্টি করতে সহায়তা করছে।
দেশজুড়ে স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণে এক লাখ কমিউনিটি ও ওয়েলবিইং কর্মী নিয়োগের পরিকল্পনার কথাও জানান তিনি। এসব কর্মীর প্রায় ৮০ শতাংশ হবেন নারী। এ ছাড়া আরও ২৫ হাজার পেশাদার মিডওয়াইফ নিয়োগের পরিকল্পনা রয়েছে।
ডা. জুবাইদা রহমান বলেন, এসব উদ্যোগের লক্ষ্য নিরাপদ ও স্বাভাবিক প্রসব উৎসাহিত করা, অপ্রয়োজনীয় চিকিৎসা হস্তক্ষেপ কমানো এবং প্রত্যেক নারীর জন্য দক্ষ ও সহানুভূতিশীল মাতৃত্বকালীন স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের কোনো প্রান্তের নারীকে প্রয়োজনীয় ও সমন্বিত মাতৃ ও নবজাতক স্বাস্থ্যসেবা পেতে নিজের উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স বা জেলা হাসপাতালের বাইরে যেতে হবে না।
সন্তান জন্ম দিতে গিয়ে কোনো নারীর বেঁচে থাকা ঢাকায় যাতায়াতের সামর্থ্য কিংবা ব্যয়বহুল বেসরকারি চিকিৎসা নেওয়ার সক্ষমতার ওপর নির্ভর করা উচিত নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি। তাঁর ভাষায়, এটি শুধু স্বাস্থ্যসেবার লক্ষ্য নয়; বরং সমতা, মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার।
নারীর ক্ষমতায়নে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার অবদানের কথা তুলে ধরেন ডা. জুবাইদা রহমান।
তিনি বলেন, গ্রামীণ উন্নয়ন, পরিবার পরিকল্পনা, নারীশিক্ষা ও নারীর ক্ষমতায়নে তাঁদের উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। গ্রামীণ উন্নয়ন, জনগণের অংশগ্রহণ ও পরিবার পরিকল্পনার ওপর জিয়াউর রহমানের গুরুত্বারোপ সামাজিক উন্নয়নের ভিত্তি গড়ে তুলতে সহায়তা করেছে।
অন্যদিকে, বিশেষ করে মাধ্যমিক পর্যায়ে ছাত্রীদের উপবৃত্তি চালুর মাধ্যমে মেয়েদের শিক্ষার সুযোগ বাড়াতে খালেদা জিয়ার উদ্যোগের কথা উল্লেখ করেন তিনি। এ উদ্যোগ প্রজন্মের পর প্রজন্মের তরুণীর সামনে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছে বলে মন্তব্য করেন ডা. জুবাইদা রহমান।
নারীদের আক্রান্তকারী ক্যানসারে প্রতিরোধযোগ্য মৃত্যু কমানোর ওপরও বিশেষ গুরুত্ব দেন তিনি। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের নতুন নারীস্বাস্থ্য উদ্যোগের কথা তুলে ধরেন। উদ্যোগটিতে অংশীদারত্বের জন্য জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিল (ইউএনএফপিএ) ও ইউরোপীয় বিনিয়োগ ব্যাংকের (ইআইবি) প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান তিনি।
ডা. জুবাইদা রহমান বলেন, দেশের প্রতিটি মেয়ে নিরাপদ শৈশবের অধিকারী। প্রতিটি পরিবারের প্রতিটি মায়ের নিরাপদে সন্তান জন্ম দেওয়ার অধিকার রয়েছে। একই সঙ্গে গ্রাম ও শহরের প্রতিটি নারীর দীর্ঘ ও উৎপাদনশীল জীবন যাপনের সুযোগ থাকা উচিত।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সম্মেলনের ওই অধিবেশনে সম্মানিত অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ডা. জুবাইদা রহমান। এতে সরকার, উন্নয়ন অর্থায়নকারী প্রতিষ্ঠান, আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য সংস্থা ও বেসরকারি খাতের প্রতিনিধিরা প্রচলিত সহায়তার বাইরে নারীস্বাস্থ্য খাতে নতুন অর্থায়নের সুযোগ নিয়ে আলোচনা করেন।
অধিবেশনে ইউএনএফপিএর নির্বাহী পরিচালক দিয়েন কেইতা, ঘানার স্বাস্থ্যমন্ত্রী কোয়াবেনা মিনতাহ আকানদোহ, ইআইবির ভাইস প্রেসিডেন্ট মারেক মোরা, জার্মানির অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও উন্নয়নবিষয়ক ফেডারেল মন্ত্রণালয়ের বির্গিট পিকেল এবং প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্যবিষয়ক বিশেষ সহকারী ডা. এস এম জিয়াউদ্দিন হায়দারসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা অংশ নেন।
সম্মেলনের পাশাপাশি বাংলাদেশের প্রতিনিধিদল টেকসই স্বাস্থ্য অর্থায়ন ও মিডওয়াইফারি খাতে দক্ষিণ-দক্ষিণ সহযোগিতা নিয়েও আলোচনা করে।
এ ছাড়া নারীস্বাস্থ্য ও প্রজনন স্বাস্থ্যসেবায় সহযোগিতা জোরদারে আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান ও বেসরকারি খাতের অংশীদারদের সঙ্গে বৈঠক করে প্রতিনিধিদল। এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ছিল বায়ার, রোশে, বার্লিন ইনস্টিটিউট অব হেলথ এবং শারিতে-ইউনিভার্সিটেটসমেডিজিন বার্লিন।
নারীস্বাস্থ্য উদ্যোগে ২৫ কোটি ইউরোর ঋণ পুনর্বিন্যাস
বিশ্ব স্বাস্থ্য সম্মেলনে বাংলাদেশের প্রতিনিধিদলের অংশগ্রহণের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অর্জন হিসেবে ইউরোপীয় বিনিয়োগ ব্যাংকের (ইআইবি) ২৫ কোটি ইউরোর একটি সার্বভৌম ঋণ নারীস্বাস্থ্য উদ্যোগে ব্যবহারের জন্য পুনর্বিন্যাসের বিষয়ে চুক্তি ঘোষণার কথা জানানো হয়েছে।
এ উদ্যোগের আওতায় ২০২৭ থেকে ২০৩১ সাল পর্যন্ত প্রায় ৪ কোটি ৭০ লাখ নারী ও কিশোরীকে স্বাস্থ্যসেবার আওতায় আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। উদ্যোগটি বাস্তবায়নে সরকারের সঙ্গে অংশীদার হিসেবে কাজ করবে ইউএনএফপিএ।