বিপুল সম্পদেও ক্যালিফোর্নিয়ায় আবাসনসংকট, বাংলাদেশের জন্য যে শিক্ষা
অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির পাশাপাশি সাশ্রয়ী আবাসন, সামাজিক সুরক্ষা ও সরকারি ব্যয়ের কার্যকারিতা নিশ্চিত করা কতটা জরুরি, ক্যালিফোর্নিয়ার বাস্তবতা তা সামনে এনেছে
ডেইলি সান রিপোর্ট
প্রকাশ: ১০ অক্টোবর ২০২৬, ০১:১০ পিএম
ছবি: সংগৃহীত
বিশ্বের অন্যতম সমৃদ্ধ অর্থনৈতিক অঞ্চল যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া। প্রযুক্তি, বিনোদন ও কৃষিতে বিপুল সম্পদ সৃষ্টি হলেও আবাসনসংকটে সেখানে অনেক মানুষকে দিন কাটাতে হচ্ছে অনিশ্চয়তায়; রাত পার করতে হচ্ছে তাঁবু, গাড়ি কিংবা অস্থায়ী আশ্রয়ে। অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির পাশাপাশি সাশ্রয়ী আবাসন, সামাজিক সুরক্ষা ও সরকারি ব্যয়ের কার্যকারিতা নিশ্চিত করা কতটা জরুরি, ক্যালিফোর্নিয়ার বাস্তবতা তা সামনে এনেছে। দ্রুত নগরায়ণ ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পথে থাকা বাংলাদেশের জন্যও এ অভিজ্ঞতা গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হয়ে উঠতে পারে।
বিপুল অর্থনীতি, তবু আবাসনের অনিশ্চয়তা
ক্যালিফোর্নিয়ার অর্থনীতির আকার ৪.৫ ট্রিলিয়ন ডলারের বেশি। সিলিকন ভ্যালির প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ও হলিউডের বিনোদনশিল্পের পাশাপাশি কৃষি, উৎপাদনশিল্প, স্বাস্থ্যসেবা ও অর্থায়ন খাতও অঙ্গরাজ্যটির অর্থনীতিকে শক্তিশালী করেছে। অথচ লস অ্যাঞ্জেলেসের বিলাসবহুল ভবনের পাশেই হাজারো মানুষকে রাত কাটাতে হয় অস্থায়ী আশ্রয়ে।
এই বৈপরীত্য দেখায়, বড় অর্থনীতি মানেই সবার আর্থিক নিরাপত্তা নয়। পূর্ণকালীন কাজ করেও অনেকের পক্ষে বাড়িভাড়া দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। আবাসনের সংকট, আয়বৈষম্য, মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা, মাদকাসক্তি ও সরকারি ব্যয় ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা গৃহহীনতার পেছনে ভূমিকা রাখছে।
ক্যালিফোর্নিয়ায় কর্মসংস্থানের কেন্দ্রগুলোর তুলনায় পর্যাপ্ত বাড়ি নির্মিত না হওয়া সংকটের অন্যতম কারণ। কঠোর ভূমি ব্যবহারবিধি, দীর্ঘ অনুমোদনপ্রক্রিয়া এবং নতুন আবাসন প্রকল্পে স্থানীয় বাসিন্দাদের বিরোধিতা বাড়ির সরবরাহ সীমিত রাখতে পারে। চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম থাকলে বাড়িভাড়া ও সম্পত্তির দাম বাড়ে। এতে নিম্ন আয়ের শ্রমজীবীদের স্থায়ী আবাসন নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ে।
প্রবৃদ্ধির সুফল সবার কাছে পৌঁছায় না
উচ্চ আয়ের মানুষ সীমিতসংখ্যক বাড়ির জন্য বেশি ভাড়া দিতে পারলে সম্পত্তির দাম সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার তুলনায় দ্রুত বাড়তে পারে। ফলে চাকরি থাকা সত্ত্বেও অনেকের পক্ষে আবাসন ব্যয় সামলানো কঠিন হয়ে পড়ে। অসুস্থতা, গাড়ি মেরামত কিংবা কয়েক দিনের কাজ হারানোর মতো ঘটনাও তাঁদের আর্থিক সংকটে ফেলতে পারে।
বাংলাদেশের ঢাকা ও অন্যান্য দ্রুত বর্ধনশীল শহরের জন্যও এটি সতর্কবার্তা। জমি ও বাড়িভাড়া মজুরির তুলনায় দ্রুত বাড়লে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সুফল সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যেতে পারে। তাই কর্মসংস্থানের কেন্দ্রগুলোর কাছে সাশ্রয়ী আবাসন নির্মাণ, গণপরিবহন সম্প্রসারণ এবং শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার মতো নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত করা জরুরি।
সরকারি ব্যয়ে জবাবদিহি জরুরি
ক্যালিফোর্নিয়ার স্টেট অডিটরের প্রতিবেদনের বরাতে জানা যায়, ২০১৮-১৯ থেকে ২০২২-২৩ অর্থবছর পর্যন্ত পাঁচ বছরে গৃহহীনতা ও আবাসনসংক্রান্ত কর্মসূচিতে প্রায় ২৪ বিলিয়ন ডলার বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল। তবে নিরীক্ষায় কর্মসূচিগুলোর ব্যয় ও ফলাফল অনুসরণে ঘাটতি উঠে আসে। পর্যালোচনা করা পাঁচটি কর্মসূচির মধ্যে দুটি ব্যয়-সাশ্রয়ী বলে প্রতীয়মান হয়েছিল। অন্য তিনটির কার্যকারিতা মূল্যায়নের জন্য পর্যাপ্ত তথ্য পাওয়া যায়নি।
এ অভিজ্ঞতা দেখায়, বিপুল অর্থ বরাদ্দই সামাজিক সংকটের সমাধান নয়। অর্থ কোথায় ব্যয় হয়েছে, কত মানুষ উপকৃত হয়েছেন এবং তাঁরা দীর্ঘ মেয়াদে আবাসন ধরে রাখতে পেরেছেন কি না—এসবের হিসাবও জরুরি।
বাংলাদেশের সামাজিক কর্মসূচিতে সুস্পষ্ট লক্ষ্য, স্বচ্ছ বাজেট, স্বাধীন নিরীক্ষা ও নিয়মিত মূল্যায়ন প্রয়োজন। একই সঙ্গে প্রকল্পের পুনরাবৃত্তি, দীর্ঘসূত্রতা ও অতিরিক্ত প্রশাসনিক ব্যয় কমাতে হবে। আশ্রয়কেন্দ্র, পুনর্বাসন ও সামাজিক সেবা পরিচালনায় এনজিও সহায়তা করতে পারে, তবে সরকারি অর্থের জবাবদিহি নিশ্চিত করার দায়িত্ব সরকারেরই।
গৃহহীনতা, মাদক ও মানসিক স্বাস্থ্য
গৃহহীনতার সঙ্গে দারিদ্র্য, মাদকাসক্তি, মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা ও পারিবারিক সম্পর্কের অবনতির জটিল যোগসূত্র রয়েছে। মাদকাসক্তি আয়, স্বাস্থ্য ও পারিবারিক সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। আবার রাস্তায় বসবাসের অনিশ্চয়তা মানসিক চাপ বাড়ায় এবং চিকিৎসা পাওয়ার পথ কঠিন করে তোলে।
যুক্তরাষ্ট্রে ফেন্টানিলের মতো শক্তিশালী মাদক নিয়ে উদ্বেগও এ সংকটের গুরুত্ব বাড়িয়েছে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও মাদকাসক্তিকে শুধু আইনশৃঙ্খলার সমস্যা হিসেবে দেখলে চলবে না। মাদক পাচার ও অপরাধের বিরুদ্ধে আইন প্রয়োগের পাশাপাশি প্রতিরোধ, চিকিৎসা, পুনর্বাসন, মানসিক স্বাস্থ্যসেবা এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
অপরাধ দমন ও পুনর্বাসনের ভারসাম্য
ক্যালিফোর্নিয়ায় অপরাধ ও মাদকনীতি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বিতর্ক চলছে। ২০১৪ সালে ‘প্রপোজিশন ৪৭’-এর মাধ্যমে কিছু স্বল্পমাত্রার চুরি ও মাদকসংক্রান্ত অপরাধের শাস্তি কমানো হয়। পরে পুনরাবৃত্ত অপরাধ ও জননিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের পরিপ্রেক্ষিতে ২০২৪ সালে ভোটাররা ‘প্রপোজিশন ৩৬’ অনুমোদন করেন। এতে নির্দিষ্ট কিছু পুনরাবৃত্ত চুরি ও মাদকসংক্রান্ত অপরাধের শাস্তি বাড়ানোর পাশাপাশি কিছু ক্ষেত্রে আদালতের তত্ত্বাবধানে চিকিৎসা কর্মসূচিতে অংশ নেওয়ার সুযোগ রাখা হয়।
এ অভিজ্ঞতা দেখায়, শুধু শাস্তি দিয়ে মাদকাসক্তি ও গৃহহীনতার অন্তর্নিহিত কারণ দূর করা কঠিন। আবার জননিরাপত্তার উদ্বেগ উপেক্ষা করাও সম্ভব নয়। তাই অপরাধ দমন, চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের মধ্যে ভারসাম্য প্রয়োজন।
বাংলাদেশের জন্য ছয়টি শিক্ষা
১. আবাসনকে অর্থনৈতিক অবকাঠামোর অংশ হিসেবে দেখা: কর্মসংস্থানের কেন্দ্রগুলোর কাছে সাশ্রয়ী ও অধিক ঘনত্বের আবাসন গড়ে তুলতে হবে। পাশাপাশি গণপরিবহন ও নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে।
২. প্রবৃদ্ধির সুফল পরিমাপ করা: শুধু জিডিপি বা বিনিয়োগের পরিমাণ নয়, মানুষের ক্রয়ক্ষমতা, আবাসনের নিরাপত্তা এবং মৌলিক সেবায় প্রবেশাধিকারের ভিত্তিতেও উন্নয়ন মূল্যায়ন করতে হবে।
৩. সরকারি ব্যয়ে জবাবদিহি নিশ্চিত করা: সামাজিক কর্মসূচিতে বরাদ্দের পাশাপাশি ব্যয়ের ফলাফল প্রকাশ, স্বাধীন নিরীক্ষা ও নিয়মিত মূল্যায়নের ব্যবস্থা থাকতে হবে।
৪. এনজিওর ভূমিকা ও সরকারি দায়বদ্ধতার সমন্বয়: এনজিও সেবা বাস্তবায়নে সহায়তা করতে পারে, কিন্তু সরকারি অর্থের স্বচ্ছতা ও ফলাফলের জবাবদিহি নিশ্চিত করার দায়িত্ব সরকারেরই।
৫. মাদকাসক্তিকে জনস্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবেও দেখা: আইন প্রয়োগের পাশাপাশি চিকিৎসা, পুনর্বাসন, মানসিক স্বাস্থ্যসেবা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়াতে হবে।
৬. অপরাধ দমন ও পুনর্বাসনের মধ্যে ভারসাম্য রাখা: গুরুতর ও পুনরাবৃত্ত অপরাধের ক্ষেত্রে আইন প্রয়োগের পাশাপাশি মাদকনির্ভরতা ও সামাজিক সংকট মোকাবিলায় কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।
সমৃদ্ধির পাশাপাশি নিরাপত্তাও জরুরি
ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী অর্থনৈতিক কেন্দ্র। তবু সেখানে গৃহহীনতার সংকট দেখায়, বিপুল সম্পদ সৃষ্টি করলেই সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত হয় না।
বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো, দ্রুত নগরায়ণের পাশাপাশি সাশ্রয়ী আবাসন, সামাজিক সুরক্ষা ও সরকারি ব্যয়ের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। অর্থনৈতিক সাফল্য শুধু জিডিপি, রপ্তানি কিংবা বিনিয়োগের পরিমাণ দিয়ে বিচার করা যায় না। সাধারণ মানুষ আয় দিয়ে সম্মানজনক জীবনযাপন করতে পারছেন কি না, নিরাপদ বাসস্থানে থাকতে পারছেন কি না এবং বিপদের সময় প্রয়োজনীয় সহায়তা পাচ্ছেন কি না—সেটিও উন্নয়নের গুরুত্বপূর্ণ মাপকাঠি।
সূত্র: নিউজ২৪
