EN ☀️
×

Follow Us

বাংলাদেশ

হামলার কারণ নিয়ে ধোঁয়াশা, সালমানের বক্তব্য ঘিরে নানা প্রশ্ন

বিশেষ প্রতিনিধি

প্রকাশ: ০৭ অক্টোবর ২০২৬, ০৯:২০ এএম

হামলার কারণ নিয়ে ধোঁয়াশা, সালমানের বক্তব্য ঘিরে নানা প্রশ্ন

ছবি: সংগৃহীত

অ অ

কনটেন্ট ক্রিয়েটর সালমান মুক্তাদিরের ‘ব্রাউনফিশ স্টুডিওতে’ হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনায় দেশজুড়ে ব্যাপক আলোচনা তৈরি হয়েছে। ঘটনার পর সালমানের দেওয়া বিভিন্ন বক্তব্য, হামলার নেপথ্য কারণ এবং জমি ও রাস্তা নিয়ে বিরোধ—সব মিলিয়ে তৈরি হয়েছে নানা প্রশ্ন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও এ নিয়ে চলছে নানা আলোচনা ও বিশ্লেষণ।

হামলার পর ফেসবুক লাইভে এসে সালমান মুক্তাদির অভিযোগ করেছিলেন, বিএনপির নাম ভাঙিয়ে তার কাছে চাঁদা দাবি করা হয়েছিল। চাঁদা না দেওয়ায় তার স্টুডিওতে হামলা চালানো হয় বলেও তিনি দাবি করেন। তবে পরবর্তী সময়ে তিনি ওই বক্তব্যের বিষয়ে ভিন্ন অবস্থান নেন। সোমবার রাতে সাংবাদিক খালেদ মুহিউদ্দীনের ‘ঠিকানা’ টকশোতে দেওয়া বক্তব্যেও তিনি বিএনপি ও সরকারকে নিয়ে একাধিক মন্তব্য করেন।

টকশোতে সালমান বলেন, ‘ওরা চাঁদাবাজ, ভূমিদস্যু, মিথ্যাবাদী।’ একই সঙ্গে সরকারের প্রতি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়ে নিজের বক্তব্যের পক্ষে তার কাছে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র রয়েছে বলেও দাবি করেন। তিনি বলেন, তার উপার্জনের সব টাকা বৈধ এবং বাংলাদেশে থাকবেন কি না, সেটিও পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করছে।

সালমানের বক্তব্যের এই পরিবর্তন নিয়েই এখন প্রশ্ন উঠেছে। প্রথমে বিএনপির নাম করে চাঁদাবাজির অভিযোগ, পরে সেই অবস্থান থেকে সরে আসা এবং সর্বশেষ আবার বিএনপির বিরুদ্ধে কঠোর মন্তব্য—এই ধারাবাহিকতায় তার বক্তব্যের পেছনে সুনির্দিষ্ট তথ্য কী, তা জানতে চাওয়া হচ্ছে।

চাঁদাবাজির অভিযোগের সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন

হামলার পর সালমান মুক্তাদিরের অভিযোগের বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদও বক্তব্য দিয়েছেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, সালমান জানিয়েছেন, কেউ সরাসরি তার কাছে চাঁদা দাবি করেনি। অন্যদিকে সালমানের প্রকাশ্য বক্তব্যে বিএনপির নাম ভাঙিয়ে চাঁদা দাবির অভিযোগ উঠে আসে।

এ কারণে অভিযোগটির ভিত্তি কী এবং কার তথ্যের ভিত্তিতে তিনি একটি রাজনৈতিক দলের বিরুদ্ধে এমন গুরুতর অভিযোগ করেছিলেন, তা স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তদন্তের স্বার্থে সালমানকে জিজ্ঞাসাবাদ করে এ বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য নেওয়া হতে পারে।

হামলার নেপথ্যে জমি-রাস্তার বিরোধ?

তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে জানা গেছে, সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিওকে কেন্দ্র করেই হামলার ঘটনা ঘটেছে—এমনটি নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না। ঢাকার ইসিবি চত্বরসংলগ্ন ওই জমি নিয়ে আবাসন নির্মাতা প্রতিষ্ঠান নিউ গিনি প্রপার্টিজ এবং এক অবসরপ্রাপ্ত সামরিক কর্মকর্তার মধ্যে দীর্ঘদিনের বিরোধ রয়েছে বলে জানা গেছে।

বিশেষ করে জমি ও চলাচলের রাস্তা ব্যবহার নিয়ে বিরোধের জেরে আবাসন প্রকল্পে হামলার পরিকল্পনা করা হয়ে থাকতে পারে বলে প্রাথমিক তদন্তে উঠে এসেছে। ওই ঘটনায় সেখানে থাকা সালমানের টিনশেড স্টুডিওও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

এ অবস্থায় বিতর্কিত জমিতে স্টুডিও নির্মাণের আগে জমির মালিকানা, ব্যবহার ও সংশ্লিষ্ট বিরোধ সম্পর্কে সালমান মুক্তাদির কতটা অবগত ছিলেন, সেটিও তদন্তের অংশ হতে পারে। পাশাপাশি জমি-সংক্রান্ত বিরোধের কোনো পক্ষের সঙ্গে তার সম্পৃক্ততা বা তাকে কোনো পক্ষ ব্যবহার করেছে কি না, সেটিও খতিয়ে দেখার দাবি উঠেছে।

মামলা নিয়ে কেন তৈরি হলো বিতর্ক

ঘটনার পর মামলা করা নিয়েও তৈরি হয়েছে বিভ্রান্তি। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এক পর্যায়ে বলেছিলেন, সালমান সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা করলেও থানায় সুনির্দিষ্টভাবে মামলা করেননি। এর জবাবে সালমান দাবি করেন, ঘটনার রাতেই তিনি ভোররাত পর্যন্ত থানায় অবস্থান করে মামলা করার আবেদন করেছিলেন। তার অভিযোগ, পুলিশ প্রথমে মামলা নেয়নি।

পরে মামলা গ্রহণ করা হয় এবং ঘটনায় একাধিক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়। ফলে ঘটনার রাতে থানায় ঠিক কী ঘটেছিল, সালমান কী ধরনের অভিযোগ নিয়ে গিয়েছিলেন এবং তার দেওয়া আবেদনে কী কী অভিযোগ ও ক্ষয়ক্ষতির বিবরণ ছিল—এসব বিষয়ও তদন্তের মাধ্যমে পরিষ্কার হওয়ার প্রয়োজন রয়েছে।


সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বক্তব্যের প্রভাব

সালমান মুক্তাদির সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পরিচিত মুখ। তার বিপুলসংখ্যক অনুসারী রয়েছে। ফলে তার দেওয়া কোনো বক্তব্য দ্রুত ব্যাপক মানুষের কাছে পৌঁছে যায়। এ কারণে হামলার মতো স্পর্শকাতর ঘটনা নিয়ে তার বক্তব্য জনমত ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে কী ধরনের প্রভাব ফেলছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

সরকারের বিভিন্ন পর্যায় থেকেও তাকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বক্তব্য দেওয়ার ক্ষেত্রে আরও দায়িত্বশীল হওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। কোনো তথ্য যাচাই না করে প্রচার করা হয়েছে কি না, কিংবা তাঁর বক্তব্যের কারণে কোনো ধরনের বিভ্রান্তি বা উত্তেজনা তৈরি হয়েছে কি না—তাও তদন্তে বিবেচনায় আসতে পারে।

জিজ্ঞাসাবাদের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আলোচনা

সালমান মুক্তাদির এ ঘটনায় নিঃসন্দেহে একজন ভুক্তভোগী। তার স্টুডিওতে হামলা, ভাঙচুর এবং মূল্যবান যন্ত্রপাতি ক্ষতিগ্রস্ত বা লুট হওয়ার অভিযোগ রয়েছে। তবে একই সঙ্গে ঘটনার পর তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যেসব বক্তব্য দিয়েছেন এবং পরে যেসব অবস্থান নিয়েছেন, সেগুলোও তদন্তের স্বার্থে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বিশ্লেষকদের কেউ কেউ বলছেন, তাকে জিজ্ঞাসাবাদ মানেই তাকে অভিযুক্ত করা নয়। বরং ঘটনার প্রকৃত কারণ, হামলাকারীদের উদ্দেশ্য, চাঁদাবাজির অভিযোগের ভিত্তি এবং জমি-সংক্রান্ত বিরোধের সঙ্গে হামলার সম্পর্ক—এসব বিষয়ে তার কাছ থেকে তথ্য নেওয়া তদন্তের স্বাভাবিক অংশ হতে পারে।

সালমান নিজেও বলেছেন, তদন্তের প্রয়োজনে সরকার তাকে তলব করতে পারে। একই সঙ্গে তিনি দাবি করেছেন, তার কাছে ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রয়োজনীয় নথিপত্র রয়েছে।

অর্থের উৎস নিয়েও অনুসন্ধান

এদিকে সালমান মুক্তাদিরের অর্থের উৎস নিয়েও অনুসন্ধান চলছে বলে জানা গেছে। তার ব্যাংক হিসাব, অ্যাকাউন্ট খোলার কাগজপত্র ও লেনদেনের তথ্য পর্যালোচনা করা হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। তবে সালমান দাবি করেছেন, তার উপার্জনের সব অর্থ বৈধ ও ‘সাদা’।

অন্যদিকে তার শ্বশুর শেখ নূর ইসলামের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের কয়েকটি গুদাম শুল্কমুক্ত মদ রাখার অভিযোগে সিলগালা করা হয়েছিল বলে জানা গেছে। সালমান ও তার শ্বশুর অবশ্য তাদের মধ্যে স্বাভাবিক সম্পর্ক নেই বলে দাবি করেছেন।

সব মিলিয়ে সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিওতে হামলার প্রকৃত কারণ এখনো পুরোপুরি স্পষ্ট নয়। চাঁদাবাজির অভিযোগ, জমি ও রাস্তা নিয়ে বিরোধ, হামলার প্রকৃত লক্ষ্য, মামলা গ্রহণ নিয়ে তৈরি হওয়া বিতর্ক এবং ঘটনার পর সালমানের পরস্পরবিরোধী বক্তব্য—সবকিছু মিলিয়ে বিষয়টি আরও তদন্তের দাবি রাখছে। হামলার প্রকৃত নেপথ্য কারণ উদ্ঘাটন এবং অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাই হলেই কেবল পুরো ঘটনার চিত্র পরিষ্কার হবে।

আরও পড়ুন