তেল আনতে ফুরাচ্ছে তেল, বাড়ছে যানজট-জ্বালানি অপচয়
ডেইলি সান রিপোর্ট, ঢাকা
প্রকাশ: ০৬ অক্টোবর ২০২৬, ০৯:৩২ এএম
ছবি: সংগৃহীত
রাজধানীর পূর্বাঞ্চলে দ্রুত বাড়ছে আবাসিক ও বাণিজ্যিক স্থাপনা। বাড়ছে জনসংখ্যা ও ব্যক্তিগত যানবাহনের সংখ্যাও। কিন্তু সেই অনুপাতে বাড়েনি জ্বালানি সরবরাহের অবকাঠামো। ফলে ৩০০ ফিট সড়ক ও আশপাশের আবাসিক এলাকার বাসিন্দাদের গাড়িতে জ্বালানি নিতে যেতে হচ্ছে কয়েক কিলোমিটার দূরের কুড়িল, খিলক্ষেত কিংবা জলসিঁড়ি এলাকায়। এতে অতিরিক্ত জ্বালানি ও সময় ব্যয়ের পাশাপাশি বাড়ছে যানবাহনের চাপ।
সম্প্রতি তেল নিতে কুড়িল থেকে খিলক্ষেতের দিকে যাওয়া মামুন বলেন, ‘মাত্র দুই দিন আগে গাড়িতে কয়েক লিটার তেল নিয়ে তেল আনতে রওনা হই। যেতে যেতেই অর্ধেক তেল শেষ হয়ে যায়। যদি কোনো কারণে তেল নিতে না পারতাম, তাহলে হয়তো বাকি তেলও শেষ হয়ে রাস্তায় আটকে থাকতে হতো। আশপাশে পর্যাপ্ত ফিলিং স্টেশন থাকলে এত দূরে আসতে হতো না। এমন সমস্যায় অন্যদেরও পড়তে হচ্ছে।’
সরেজমিনে দেখা গেছে, রাজধানীর কুড়িল থেকে ৩০০ ফিট সড়ক হয়ে পূর্বাচল প্রকল্পের আগ পর্যন্ত সড়কের দুই পাশে বসুন্ধরা, পুলিশ অফিসার্স হাউজিং সোসাইটি, নৌবাহিনী, স্বদেশ স্বর্ণালী, স্বদেশ সানভ্যালি, ইউনাইটেড সিটি বিভিন্ন আবাসিক এলাকায় বিপুলসংখ্যক মানুষ বসবাস করেন। এসব এলাকার বাসিন্দাদের ব্যবহৃত গাড়ির জন্য স্থানীয়ভাবে পর্যাপ্ত ফিলিং স্টেশন নেই। অথচ গুলশান-তেজগাঁও লিংক রোড থেকে সাতরাস্তা পর্যন্ত প্রায় দেড় কিলোমিটার সড়কেই রয়েছে সাতটি ফিলিং স্টেশন।
বাসিন্দাদের অভিযোগ, আশপাশে পর্যাপ্ত ফিলিং স্টেশন না থাকায় জ্বালানি নিতে প্রতিদিন অতিরিক্ত পথ পাড়ি দিতে হচ্ছে হাজারো যানবাহনকে। এতে বাড়ছে জ্বালানি ও সময়ের অপচয়। পাশাপাশি তৈরি হচ্ছে অপ্রয়োজনীয় যান চলাচল।
এর প্রভাব পড়ছে কুড়িল, খিলক্ষেতসহ আশপাশের গুরুত্বপূর্ণ সড়কেও। স্থানীয়দের হিসাবে, প্রায় পাঁচ লাখ মানুষের বসবাসের এ অঞ্চলে অন্তত কয়েকটি ফিলিং স্টেশন স্থাপন করা প্রয়োজন।
জ্বালানি নিতে দূরে, বাড়ছে যানবাহনের চাপ
জ্বালানি নিতে দূরে যাওয়ার কারণে ব্যক্তিগত গাড়ির পাশাপাশি গণপরিবহন, পণ্যবাহী যান, রাইড শেয়ারিংয়ের গাড়ি ও মোটরসাইকেলসহ বিভিন্ন ধরনের যানবাহনের অপ্রয়োজনীয় চলাচল বাড়ছে। এরই মধ্যে আবাসিক এলাকাগুলোতে যানবাহনের চাপ রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, ভবিষ্যতে এ অঞ্চলে প্রতিদিন তিন থেকে চার লাখ পর্যন্ত যানবাহনের চলাচল হতে পারে। ফলে স্থানীয়ভাবে জ্বালানি সরবরাহের ব্যবস্থা না থাকলে বাড়তি যান চলাচল আরও বাড়বে।
জ্বালানি নিতে বর্তমানে একটি গাড়ির অতিরিক্ত ৩০ থেকে ৬০ মিনিট পর্যন্ত সময় নষ্ট হচ্ছে বলে জানান বাসিন্দারা। এতে কর্মঘণ্টা নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি যাত্রী ও চালকদের দুর্ভোগ বাড়ছে। একই সঙ্গে কুড়িল-খিলক্ষেতমুখী সড়কগুলোতেও বাড়ছে যানবাহনের চাপ।
জানা গেছে, প্রতিদিন মাত্র ৫০ হাজার যানবাহন যদি জ্বালানি নিতে গড়ে অতিরিক্ত ৭ কিলোমিটার পথ পাড়ি দেয়, তাহলে দিনে অতিরিক্ত প্রায় ৩ লাখ ৫০ হাজার কিলোমিটার চলাচল করতে হয়। প্রতি কিলোমিটারে একটি যানবাহনে গড়ে ০.১০ থেকে ০.১২ লিটার জ্বালানি খরচ হলে এই অতিরিক্ত চলাচলে প্রতিদিন প্রায় ৩৫ হাজার থেকে ৪২ হাজার লিটার জ্বালানি ব্যয় হতে পারে।
দীর্ঘ মেয়াদে এর আর্থিক মূল্য দাঁড়ায় বিপুল অঙ্কে। অর্থাৎ স্থানীয়ভাবে ফিলিং স্টেশন না থাকায় শুধু সময় ও যানজটের সমস্যা নয়, অতিরিক্ত জ্বালানিও পুড়ছে। এর সঙ্গে বাড়ছে কার্বন নিঃসরণ, বায়ু ও শব্দদূষণ।
পুরনো সিদ্ধান্তের প্রভাব
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বিশেষ আদেশের মাধ্যমে নতুন ফিলিং স্টেশন স্থাপনের কার্যক্রম বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। তবে এলপিজি স্টেশন স্থাপনের কার্যক্রম চালু রাখা হয়। তাদের দাবি, ওই সময়ের সিদ্ধান্তের কারণে দ্রুত সম্প্রসারিত আবাসিক এলাকাগুলোতে প্রয়োজনের তুলনায় জ্বালানি সরবরাহের অবকাঠামো গড়ে ওঠেনি।
একদিকে নতুন আবাসিক এলাকা সম্প্রসারিত হয়েছে, অন্যদিকে এসব এলাকার বাড়তি জ্বালানি চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ফিলিং স্টেশন স্থাপনের সুযোগ তৈরি হয়নি। ফলে বর্তমানে জ্বালানি নিতে বাসিন্দাদের দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হচ্ছে।
৩০০ ফিট সড়কের আশপাশে প্রয়োজনীয়সংখ্যক ফিলিং স্টেশন থাকলে জ্বালানি সংগ্রহের জন্য যানবাহনকে কুড়িল, খিলক্ষেত বা জলসিঁড়ির দিকে যেতে হতো না। এতে প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক অপ্রয়োজনীয় যান চলাচল কমানো সম্ভব হতো বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
১০ থেকে ১৮ কিলোমিটার পর্যন্ত অতিরিক্ত পথ
জ্বালানি নিতে এ এলাকার গাড়িগুলোকে কুড়িল, খিলক্ষেত কিংবা জলসিঁড়ির দিকে যেতে হচ্ছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে কুড়িল পর্যন্ত ১০ কিলোমিটারের বেশি, খিলক্ষেত পর্যন্ত প্রায় ১৩ কিলোমিটার এবং জলসিঁড়ি পর্যন্ত প্রায় ১৮ কিলোমিটার অতিরিক্ত পথ পাড়ি দিতে হচ্ছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সামনের সময়ে মহাখালী বাস ডিপো পুরোপুরি স্থানান্তর হলে এ অঞ্চলে যানবাহনের চাপ আরও বাড়তে পারে। ফলে জ্বালানি নিতে দূরে যাওয়ার কারণে সৃষ্ট বাড়তি যান চলাচল পরিস্থিতিকে আরও জটিল করতে পারে।
দুই-তিনটি ফিলিং স্টেশনের দাবি
এ অবস্থায় বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা ও আশপাশের আবাসিক এলাকাগুলোর বর্তমান ও ভবিষ্যৎ জ্বালানি চাহিদা এবং যানবাহনের সংখ্যা বিবেচনায় নিয়ে সমন্বিত সমীক্ষার দাবি জানিয়েছেন বাসিন্দারা। তাদের মতে, সমীক্ষার ভিত্তিতে অন্তত দুই থেকে তিনটি উপযুক্ত স্থানে পরিকল্পিত ফিলিং স্টেশন স্থাপন করা প্রয়োজন।
তবে স্থান নির্ধারণের ক্ষেত্রে অগ্নিনিরাপত্তা, পরিবেশগত ছাড়পত্র, নগর পরিকল্পনা, সড়কের ধারণক্ষমতা, প্রবেশ ও বের হওয়ার ব্যবস্থা এবং যানবাহনের অপেক্ষার পর্যাপ্ত জায়গা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা।
এ জন্য বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি), রাজউক, সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর, সিটি করপোরেশন এবং পরিবেশ অধিদপ্তরের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন বলেও মনে করছেন তারা।
পুলিশ অফিসার্স হাউজিং সোসাইটির বাসিন্দা মোহাম্মদ আলী বলেন, ‘পরিকল্পিতভাবে ফিলিং স্টেশন স্থাপন করা হলে জ্বালানি নিতে দূরে যাওয়ার প্রয়োজন কমবে। এতে অপ্রয়োজনীয় যান চলাচল, জ্বালানি ও অর্থের অপচয় এবং মানুষের কর্মঘণ্টা নষ্ট হওয়া কমবে।’
ইউনাইটেড সিটি এলাকার বাসিন্দা তাজুল ইসলাম বলেন, ‘অহেতুক যানবাহন চলাচল কমানো গেলে কুড়িল-খিলক্ষেত এলাকার ওপর বাড়তি যানচাপের পাশাপাশি বায়ু ও শব্দদূষণও কমানো সম্ভব হবে।’
তিনি বলেন, ‘পূর্ব ঢাকার এ অঞ্চলে দ্রুত আবাসিক ও বাণিজ্যিক সম্প্রসারণ ঘটছে। তাই ভবিষ্যতের যানবাহন ও জ্বালানির চাহিদা বিবেচনায় নিয়ে এখনই প্রয়োজনীয় অবকাঠামো গড়ে তোলা জরুরি।’
এ বিষয়ে নাম প্রকাশ না করার শর্তে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, ‘বিদ্যমান নীতিমালার আওতায় নতুন পেট্রোলপাম্প অনুমোদনের কার্যক্রম একটি বিশেষ অফিস আদেশের মাধ্যমে বন্ধ রাখা হয়েছে। বিদ্যমান নীতিমালাটি ২০১৯-২০ সালের দিকে প্রণয়ন করা হয়েছিল।’
তিনি বলেন, ‘নতুন পেট্রোলপাম্প ও ফিলিং স্টেশন অনুমোদনের জন্য সরকার বিপিসির কাছে একটি খসড়া নীতিমালা চেয়েছে। এর আগে বিপিসি থেকে একটি খসড়া নীতিমালা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছিল। তবে অধিকতর যাচাই-বাছাইয়ের জন্য সেটি আবার বিপিসির কাছে পাঠানো হয়েছে।’
বিপিসির ওই কর্মকর্তা বলেন, ‘খসড়া নীতিমালা নিয়ে বিভিন্ন অংশীজনের সঙ্গে আলোচনা ও মতামত নেওয়া হয়েছে। বর্তমানে এটি যাচাই-বাছাইয়ের শেষ পর্যায়ে রয়েছে। শিগগিরই নীতিমালাটি চূড়ান্ত করার প্রক্রিয়া সম্পন্ন হবে। নতুন ফিলিং স্টেশন অনুমোদন বন্ধ থাকার এটিই মূল কারণ।’
নগর বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. আদিল মোহাম্মদ খান বলেন, ‘নির্দিষ্ট এলাকার মানুষের বসবাসের ওপর ভিত্তি করেই সবকিছুর পরিকল্পনা করতে হয়। পরিকল্পনা ঠিক না থাকলে বাসিন্দাদের এর নেতিবাচক ফল ভোগ করতে হয়। এই ক্ষেত্রেও অনেকটা তাই হয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘মানুষের বসবাস বাড়ছে; কিন্তু সে অনুযায়ী প্রয়োজনমতো জ্বালানি সংগ্রহের ব্যবস্থা করা হচ্ছে না বা যাচ্ছে না। এতে অন্য এলাকাতেও বাড়তি চাপ পড়ছে।’
ফলে পূর্ব ঢাকার দ্রুত সম্প্রসারিত আবাসিক এলাকাগুলোতে জ্বালানি সরবরাহের অবকাঠামো নিয়ে এখনই দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। পরিকল্পিতভাবে ফিলিং স্টেশন স্থাপন করা গেলে একদিকে যেমন বাসিন্দাদের ভোগান্তি কমবে, অন্যদিকে অপ্রয়োজনীয় যান চলাচল, জ্বালানি অপচয় ও সংশ্লিষ্ট সড়কের ওপর বাড়তি চাপও কমানো সম্ভব হতে পারে।
সূত্র: কালের কণ্ঠ
