মাহ্দী আমিন
বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার মধ্যেও বাংলাদেশের রয়েছে নিশ্চয়তা, পরিকল্পনা ও সম্ভাবনা
সমাজে কিংবা জাতীয় পর্যায়ে যখনই কোনো সংকট দেখা দেয়, তা কার্যকরভাবে মোকাবিলায় সরকারের প্রস্তুতি রয়েছে
ডেইলি সান রিপোর্ট, ঢাকা
প্রকাশ: ০৫ অক্টোবর ২০২৬, ০৩:৫১ পিএম
বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার মধ্যেও বাংলাদেশের নিশ্চয়তা, পরিকল্পনা ও সম্ভাবনা রয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও তার কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহ্দী আমিন।
সোমবার (৫ অক্টোবর) সকালে রাজধানীর সোনারগাঁওয়ে ‘বে অব বেঙ্গল কনভারসেশন’-এর তৃতীয় দিনের ‘লিডারশিপ ইন অ্যান এজ অব আনসার্টেইনটি’ শীর্ষক সেশনে তিনি এসব কথা বলেন।
মাহ্দী আমিন বলেন, বিশ্ব বর্তমানে এমন এক অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, যার প্রভাব দৈনন্দিন জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে দৃশ্যমান। প্রযুক্তিগত পরিবর্তন, পরিবেশগত বিপর্যয়, অর্থনৈতিক ও আর্থিক সংকট, স্বাস্থ্যসেবা কিংবা রাজনৈতিক ও আঞ্চলিক অস্থিরতা—যে ক্ষেত্রেই হোক না কেন, অনিশ্চয়তা এখন বাস্তবতা। এই বৈচিত্র্যময় অনিশ্চয়তাকে মেনে নিয়েই সামনে এগিয়ে যেতে হয়। চ্যালেঞ্জ আসবেই। তবে প্রশ্ন হলো, এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আদর্শ ও নীতিবোধে কোনো নিশ্চয়তা রয়েছে কি না।
তিনি বলেন, সরকারের পরিকল্পনা ও কর্মসূচিতে সুনির্দিষ্ট নিশ্চয়তা ও সম্ভাবনা রয়েছে। সমাজে কিংবা জাতীয় পর্যায়ে যখনই কোনো সংকট দেখা দেয়, তা কার্যকরভাবে মোকাবিলায় সরকারের প্রস্তুতি রয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র বলেন, প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে তারা এমন একটি সরকারের প্রতিনিধিত্ব করছেন, যারা দীর্ঘ সময় পর জনগণের বিপুল ম্যান্ডেট নিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করেছে। এটি জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিনিধিত্বকারী একটি গণতান্ত্রিক সরকার।
তিনি বলেন, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা থাকতে পারে। তবে জনগণের প্রতি সত্যিকার অর্থে দায়বদ্ধ একটি সরকার হিসেবে মানবাধিকার, আইনের শাসন ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার দায়িত্ব গভীরভাবে উপলব্ধি করা হয়েছে।
ভূ-রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার প্রসঙ্গ তুলে ধরে মাহ্দী আমিন রোহিঙ্গা সংকটের কথা উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, রোহিঙ্গা সংকট মূলত বাংলাদেশের সরাসরি নিয়ন্ত্রণে নেই। তবে এ বিষয়ে বাংলাদেশ প্রস্তুত থাকতে পারে। বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক অংশীজনদের সঙ্গে সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে নিশ্চিত করতে হবে, সংকটটির সূত্রপাত যেহেতু মিয়ানমারে, এর সমাধানও যেন মিয়ানমারেই হয়।
তিনি বলেন, বাংলাদেশ ১৩ লাখ রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়েছে। তারা যতদিন বাংলাদেশে অবস্থান করবে, ততদিন তাদের মানবিক জীবন নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক সহায়তা ও অর্থায়ন অব্যাহত রাখা প্রয়োজন। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সঙ্গে একযোগে কাজ করে রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করতে হবে।
দ্রুত পরিবর্তনশীল প্রযুক্তির যুগে চতুর্থ শিল্পবিপ্লব, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও রোবোটিক্সের প্রভাবের কথা তুলে ধরে দেশের তরুণ প্রজন্মকে আধুনিক দক্ষতায় গড়ে তোলার ওপর গুরুত্বারোপ করেন মাহ্দী আমিন।
তিনি বলেন, প্রযুক্তির বিবর্তনে কর্মসংস্থান হারানোর ঝুঁকি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে না থাকলেও সঠিক প্রশিক্ষণ এবং দেশের বিশাল জনমিতিক সুবিধাকে কাজে লাগিয়ে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা সম্ভব। এ লক্ষ্যে সরকার শিক্ষাক্রম আধুনিকায়ন, শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও শিক্ষাঙ্গনের মধ্যে সংযোগ বৃদ্ধি, সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব জোরদার এবং বাজারের চাহিদা অনুযায়ী শিক্ষা ব্যবস্থায় প্রয়োজনীয় সংস্কারের উদ্যোগ নিয়েছে।
পরিবেশগত সংকট ও জলবায়ু ঝুঁকি মোকাবিলায় সরকারের কর্মপরিকল্পনার কথা তুলে ধরে মাহ্দী আমিন বলেন, আগামী পাঁচ বছরে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ এবং ভূগর্ভস্থ ও প্রাকৃতিক পানি সংরক্ষণে ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খনন ও পুনঃখননের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
পাশাপাশি কৃষির উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি ও পানি ব্যবস্থাপনায় পদ্মা ব্যারেজ নির্মাণ এবং তিস্তা ব্যারেজ মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলেও জানান তিনি।
ভবিষ্যতের বৈশ্বিক আর্থিক ধাক্কা ও অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলায় টেকসই নীতি প্রণয়নের ওপর জোর দেন মাহ্দী আমিন। এ সময় সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর বিভিন্ন উদ্যোগের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, নারীদের সুরক্ষায় ‘ফ্যামিলি কার্ড’ চালু করা হচ্ছে। কৃষকদের জন্য রয়েছে ‘ফার্মার কার্ড’। দেশের প্রতিটি নাগরিকের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে ‘হেলথ কার্ড’ চালুর চূড়ান্ত প্রক্রিয়া চলছে।
তিনি বলেন, মূলত একটি সমন্বিত ‘ইউনিভার্সাল কার্ড’-এর দিকে এগিয়ে যাচ্ছে সরকার। এর মাধ্যমে রাষ্ট্রের প্রতিটি নাগরিককে নাগরিক সুযোগ-সুবিধা ও সুরক্ষা দেওয়ার লক্ষ্য রয়েছে।
প্রতিটি চ্যালেঞ্জকে সমস্যা সমাধান এবং জনগণের ক্ষমতায়নের সুযোগ হিসেবে দেখার ওপর গুরুত্বারোপ করে মাহ্দী আমিন তৃণমূল পর্যায়ে স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়ার পরিকল্পনার কথাও জানান।
তিনি বলেন, আধুনিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে তৃণমূল পর্যায়ের স্বাস্থ্যসুরক্ষা নিশ্চিত করতে সরকার ১ লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। এর ৮০ শতাংশই নারী হবেন। এর মাধ্যমে দেশের প্রতিটি পরিবারে মা ও শিশুর স্বাস্থ্যসুরক্ষায় নিবেদিত কর্মী উপস্থিত রাখার লক্ষ্য রয়েছে।
আঞ্চলিক সম্পর্কের বিষয়ে মাহ্দী আমিন বলেন, কিছু আঞ্চলিক প্রতিকূলতা রয়েছে, যা হয়তো এককভাবে বাংলাদেশের নিয়ন্ত্রণে নেই। তবে সমতা, ন্যায্যতা ও মর্যাদার ভিত্তিতে প্রতিটি দেশের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় ও বহুপক্ষীয় পর্যায়ে সুদৃঢ় সম্পর্ক গড়ে তোলা সম্ভব। এর মূল ভিত্তি হবে ‘সবার আগে বাংলাদেশ’।
তিনি বলেন, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, অবাধ যাতায়াত, কানেক্টিভিটি, প্রযুক্তি ও সমুদ্র নিরাপত্তার মতো ক্ষেত্রে মানুষে মানুষে যোগাযোগ স্থাপন করে সর্বোচ্চ আঞ্চলিক সহযোগিতা নিশ্চিত করা সম্ভব।
বিশ্বজুড়ে রাজনৈতিক টানাপোড়েনের কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র বলেন, নীতি প্রণয়নের কেন্দ্রে জনগণকে রাখা হলে এবং জাতি গঠনের মূল কেন্দ্রবিন্দুতে মানুষকে স্থান দেওয়া হলে যেকোনো অনিশ্চয়তা সাহসের সঙ্গে মোকাবিলা করা সম্ভব।
তিনি বলেন, জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষাকে গুরুত্ব দিয়ে প্রয়োজনীয় সংস্কার ও নীতি প্রণয়ন করতে হবে। দৃঢ় মূল্যবোধ, সঠিক পরিকল্পনা, কার্যকর কর্মসূচি ও আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে প্রস্তুত থাকলে বড় পরিবর্তন আনা এবং ইতিবাচক প্রভাব তৈরি করা সম্ভব।
জ্বালানি খাতের বিভিন্ন চ্যালেঞ্জের প্রসঙ্গ তুলে ধরে মাহ্দী আমিন বলেন, বাংলাদেশ উত্তরাধিকার সূত্রে বেশ কিছু সংকট পেয়েছে। এর মধ্যে জ্বালানি খাত অন্যতম। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ কীভাবে মোড় নেবে, তা বাংলাদেশের নিয়ন্ত্রণে নেই। তবে ভবিষ্যৎ জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা সুরক্ষিত করা এবং জ্বালানির উৎসে বৈচিত্র্য আনা বাংলাদেশের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।
তিনি বলেন, জ্বালানি তেল, গ্যাস কিংবা বিদ্যুৎ—সব ক্ষেত্রেই বহুমুখী উৎসের দিকে যাওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি সৌরবিদ্যুৎসহ নবায়নযোগ্য জ্বালানির ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
মাহ্দী আমিন বলেন, প্রতিটি সংকটের সময় সরকারের লক্ষ্য থাকে জনগণ কী চায়, তা শোনা এবং নীতি প্রণয়নের মাধ্যমে তার প্রতিফলন ঘটানো।
‘বে অব বেঙ্গল কনভারসেশন’-এর গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি বলেন, আঞ্চলিক সংহতির গুরুত্ব অনুধাবন করে সবাইকে একযোগে কাজ করতে হবে। এ অঞ্চলের পাশাপাশি বিশ্বমঞ্চেও একে অপরকে সম্মান, পারস্পরিক আস্থা এবং সম্পর্কের প্রতিটি ক্ষেত্রে পারস্পরিক কল্যাণ নিশ্চিত করতে হবে।
তিনি বলেন, যেকোনো সংকট একসঙ্গে মোকাবিলা করা সম্ভব। একসঙ্গেই এগিয়ে যেতে হবে এবং ঐক্যবদ্ধভাবে সব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে।
নেপালের দ্য অন্নপূর্ণা এক্সপ্রেসের প্রধান সম্পাদক কমল দেব ভট্টরাইয়ের সঞ্চালনায় আলোচনায় আরও অংশ নেন কাতারের লন্ডন সংলাপের নন-রেসিডেন্ট ফেলো আমনা খান, ভারতের সেন্টার ফর সোশ্যাল অ্যান্ড ইকোনমিক প্রগ্রেসের সিনিয়র ফেলো কনস্টান্টিনো জাভিয়ার, ইন্দোনেশিয়ার ইসলামিক ইউনিভার্সিটির ইনস্টিটিউট ফর গ্লোবাল অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের পরিচালক হাদজা মিন ফাদলি রবি, মালয়েশিয়ার টেলরস ইউনিভার্সিটির সিনিয়র লেকচারার জুলিয়া রকনিফার্ড, পোল্যান্ডের দ্য বয়ম ইনস্টিটিউটের প্রেসিডেন্ট ক্রিস্তফ মার্সিন জালেভস্কি, যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব অক্সফোর্ডের পিএইচডি গবেষক হালেলুয়াহ লুলি ওনদিমু, তুরস্কের তুর্কি ন্যাশনাল ডিফেন্স ইউনিভার্সিটির আন্তর্জাতিক সম্পর্কের অধ্যাপক মেহমেত ওজকান এবং রাশিয়ার স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউটের অ্যাসোসিয়েট সিনিয়র গবেষক পেত্র তোপিচাকানভ।