লক্ষ্মীপুরে মাদরাসা অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে নানা অনিয়মের অভিযোগ
ডেইলি সান রিপোর্ট, লক্ষ্মীপুর
প্রকাশ: ০৫ অক্টোবর ২০২৬, ১০:০৮ এএম
লক্ষ্মীপুরের কমলনগর উপজেলার ফজুমিয়ারহাট মাতাব্বরনগর দারুচ্ছুনাত ফাজিল মাদরাসার অধ্যক্ষ আলী হোছাইনের বিরুদ্ধে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে বিভিন্ন খাতে অতিরিক্ত অর্থ আদায়, অনুপস্থিতির জরিমানা, শ্রেণিকক্ষ ভাড়া দেওয়া এবং শিক্ষকদের নিয়মিত পাঠদান না করাসহ নানা অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় অভিভাবক, শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের সঙ্গে কথা বলে এসব অভিযোগের তথ্য পাওয়া গেছে।
তবে এসব অভিযোগের সবগুলো স্বীকার করেননি অধ্যক্ষ আলী হোছাইন। তাঁর দাবি, প্রতিষ্ঠানের উন্নয়নের জন্য বিভিন্ন খাতে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে অর্থ নেওয়া হয়। এসব অর্থ কীভাবে ব্যয় করা হয়েছে, জানতে চাইলে তিনি নির্দিষ্ট কোনো তথ্য দিতে পারেননি।
মাদরাসায় গিয়ে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, অনুপস্থিত শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে প্রতিদিন ১০ টাকা করে জরিমানা নেওয়া হয়। সপ্তম শ্রেণির ১৩৫ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে সেদিন উপস্থিত ছিল ৭২ জন। অনুপস্থিত ৬৩ জনের কাছ থেকে ৬৩০ টাকা জরিমানা নেওয়া হয়। অষ্টম শ্রেণির ১১৭ জনের মধ্যে উপস্থিত ছিল ৫৫ জন। অনুপস্থিত ৬২ জনের কাছ থেকে নেওয়া হয় ৬২০ টাকা।
শিক্ষার্থীদের ভাষ্য, অন্যান্য শ্রেণিতেও অনুপস্থিতির জন্য একই হারে জরিমানা নেওয়া হয়। তাঁদের হিসাবে, প্রতিদিন গড়ে ৯০০ থেকে ১ হাজার ২০০ টাকা পর্যন্ত জরিমানা আদায় হতে পারে। সে হিসাবে মাসে প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ হাজার টাকা এবং বছরে প্রায় সাড়ে তিন লাখ টাকা আদায় হওয়ার কথা। তবে এসব অর্থের হিসাব ও ব্যয়ের বিষয়ে তাঁরা স্পষ্ট তথ্য জানেন না।
অষ্টম শ্রেণির তিন শিক্ষার্থী অভিযোগ করে, পরীক্ষার ফি হিসেবে তাদের কাছ থেকে ৪৫০ টাকা করে নেওয়া হয়েছে। কিন্তু হিসাবের খাতায় ৪০০ টাকা করে দেখানো হয়েছে। এ ছাড়া শ্রেণিভেদে মাসিক বেতন হিসেবে ২০০ থেকে ৪০০ টাকা পর্যন্ত নেওয়া হয় বলে শিক্ষার্থীরা জানায়।
তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সেশন ফি বাবদ ৩০০ থেকে ১ হাজার টাকা, ভর্তি ফি ৫০০ থেকে ১ হাজার টাকা, পরীক্ষার ফি ১৩০ থেকে ৫৫০ টাকা, সনদপত্রের জন্য ২৫০ থেকে ৮০০ টাকা, মার্কশিটের জন্য ১৫০ থেকে ৬০০ টাকা, প্রশংসাপত্রের জন্য ১০০ থেকে ৫০০ টাকা এবং ছাড়পত্রের জন্য ৫০ থেকে ৬৫০ টাকা পর্যন্ত নেওয়া হয়। এসব খাতে আদায় করা অর্থের হিসাব নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন অভিভাবকেরা।
মাদরাসার আরবি বিভাগের প্রভাষক মাহমুদুল হাসানের বিরুদ্ধেও প্রায় চার মাস ধরে নিয়মিত ক্লাস না নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। কয়েকজন শিক্ষক বলেন, অধ্যক্ষের সঙ্গে সমঝোতার কারণে ওই শিক্ষক নিয়মিত ক্লাস না করেও দায়িত্ব পালন করছেন। বিষয়টি অধ্যক্ষের কাছে জানতে চাইলে তিনি ওই শিক্ষকের নিয়মিত ক্লাস না করার কথা স্বীকার করেন।
এর আগে মাদরাসার শ্রেণিকক্ষ ভাড়া দেওয়া নিয়েও অভিযোগ উঠেছিল। সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের প্রায় ২০ লাখ টাকা ব্যয়ে ছয়টি শ্রেণিকক্ষসহ নয়টি কক্ষ নির্মাণ করা হয়। পরে এসব কক্ষের কয়েকটি মাসিক ৩ হাজার টাকা হারে ভাড়া দেওয়া হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। এতে একপর্যায়ে শিক্ষার্থীদের অফিস কক্ষের ছাদের ওপর টিনের ছাপরায় ক্লাস করতে হয়েছে বলে স্থানীয় বাসিন্দারা জানান।
এ ঘটনায় গত মাসে স্থানীয় বাসিন্দারা বিক্ষোভ কর্মসূচির প্রস্তুতি নেন। পরে স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিদের মাধ্যমে অধ্যক্ষের অনুরোধে কর্মসূচি স্থগিত করা হয়।
মাদরাসার কয়েকজন শিক্ষক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, শিক্ষকদের সঙ্গে আলোচনা না করেই অধ্যক্ষ বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নেন। তাঁর ঘনিষ্ঠ কয়েকজন শিক্ষক নিয়মিত ক্লাস না করেও বেতন-ভাতা নিচ্ছেন বলেও অভিযোগ করেন তাঁরা।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, এসব অনিয়মের বিষয়ে উপজেলা প্রশাসন ও শিক্ষা কর্মকর্তাকে জানানো হলেও কার্যকর ব্যবস্থা নিতে দেরি হয়েছে। তবে উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মিজানুর রহমান ভূঁইয়া বলেন, ‘অভিযোগের বিষয়ে অধ্যক্ষকে ইতিমধ্যে শোকজ করা হয়েছে। তাঁর জবাব পাওয়ার পর বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. রাহাত উজ জামান বলেন, ‘বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশের পর আমি সরেজমিনে মাদরাসাটি পরিদর্শন করেছি। কিছু অনিয়মের সত্যতা পাওয়া গেছে। এ বিষয়ে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।’
অধ্যক্ষ আলী হোছাইন বলেন, ‘প্রতিষ্ঠানের উন্নয়নের জন্য বিভিন্ন খাতে টাকা নেওয়া হয়।’ তবে এসব অর্থ দিয়ে কী কী উন্নয়ন করা হয়েছে, সে বিষয়ে তিনি বিস্তারিত তথ্য দিতে পারেননি।
মাদরাসার গভর্নিং বডির সভাপতি ও অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক সম্রাট খীসার বক্তব্য জানতে একাধিকবার মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি।
১৯৮৬ সালে প্রতিষ্ঠিত মাদরাসাটি মেঘনা নদীর ভাঙনের কারণে ২০১৩ সালে মাতাব্বরহাট থেকে ফজুমিয়ারহাটে স্থানান্তর করা হয়। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটিতে ২৮ জন শিক্ষক-কর্মচারী ও আট শতাধিক শিক্ষার্থী রয়েছে। স্থানীয় অভিভাবকেরা মাদরাসাটির আর্থিক লেনদেন, শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে আদায় করা ফি ও জরিমানার অর্থ এবং শ্রেণিকক্ষ ভাড়া দেওয়ার বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।