EN ☀️
×

Follow Us

বাংলাদেশ

ঢাকার আবাসন হোক সবুজ, টেকসই ও সাশ্রয়ী

ডেইলি সান রিপোর্ট, ঢাকা

প্রকাশ: ০৫ অক্টোবর ২০২৬, ১০:০৬ এএম

ঢাকার আবাসন হোক সবুজ, টেকসই ও সাশ্রয়ী

ছবি: সংগৃহীত

অ অ

বুড়িগঙ্গার তীরের বাণিজ্যকেন্দ্র থেকে আজকের মহানগরী ঢাকা—এই নগরের ইতিহাস মূলত পরিবর্তন ও অভিযোজনের ইতিহাস। ১৬১০ সালে মোগল বাংলার রাজধানী হয়ে ওঠা শহরটি স্বাধীন বাংলাদেশের রাজধানী হিসেবে বর্তমানে কর্মসংস্থান, শিক্ষা ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের প্রধান কেন্দ্র। মানুষের সুযোগের কেন্দ্র হয়ে ওঠার পাশাপাশি ঢাকা এখন সবার জন্য নিরাপদ, বসবাসযোগ্য ও সাধ্যের মধ্যে আবাসন নিশ্চিত করার বড় চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি।

ঢাকার আবাসন সংকট শুধু বাড়ি বা ফ্ল্যাটের সংখ্যার সংকট নয়। বাসস্থানের অবস্থান, আলো-বাতাস, মৌলিক সেবা এবং মাসিক ব্যয়ও এর সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। কম ভাড়ার বাসা কর্মস্থল থেকে দূরে হলে যাতায়াতের খরচ সেই সাশ্রয় কমিয়ে দেয়। আবার অপরিকল্পিত ভবনে অতিরিক্ত গরম, বেশি বিদ্যুৎ ব্যবহার ও ঘন ঘন মেরামতের প্রয়োজন পরিবারের ওপর বাড়তি ব্যয়ের চাপ তৈরি করে।

৫ অক্টোবরের বিশ্ব বসতি দিবস ২০২৬-এর প্রতিপাদ্য ‘সবার জন্য পর্যাপ্ত আবাসন’। এই প্রতিপাদ্যের আলোকে সবুজ ও সাশ্রয়ী আবাসনের বিষয়টি আরও গুরুত্বের সঙ্গে আলোচনায় আসা প্রয়োজন। আবাসনকে মানুষের সাধ্যের মধ্যে আনতে শুধু নির্মাণমূল্য বা ভাড়া কমালেই হবে না, বসবাসের দীর্ঘমেয়াদি ব্যয়ও কমাতে হবে। ভালো সবুজ নকশা সেই লক্ষ্য অর্জনের একটি কার্যকর পথ হতে পারে।

সাশ্রয়ের জন্য বদলাতে হবে দৃষ্টিভঙ্গি

সবুজ ভবন মানেই ব্যয়বহুল ভবন—এ ধারণা বদলানো প্রয়োজন। ভবনের অভিমুখ, জানালার বিন্যাস, প্রাকৃতিক আলো-বাতাস, ছায়া এবং স্থানীয়ভাবে পাওয়া উপযুক্ত নির্মাণসামগ্রী শুরুতেই বিবেচনায় নিলে ব্যয় নিয়ন্ত্রণের সুযোগ তৈরি হয়। কিছু ব্যবস্থায় বাড়তি প্রাথমিক বিনিয়োগ প্রয়োজন হলেও কম বিদ্যুৎ ও পানি ব্যবহার এবং রক্ষণাবেক্ষণে সাশ্রয় দীর্ঘ মেয়াদে সেই ব্যয় পুষিয়ে দিতে পারে। ওয়ার্ল্ড গ্রিন বিল্ডিং কাউন্সিলের গবেষণা পর্যালোচনাতেও এ ধরনের অর্থনৈতিক সম্ভাবনার কথা উঠে এসেছে।

এখানেই জীবনচক্র ব্যয়ের গুরুত্ব। একটি পরিবারের প্রকৃত আবাসন ব্যয় শুধু ফ্ল্যাটের দাম বা ভাড়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এর সঙ্গে যুক্ত হয় বিদ্যুৎ, পানি, পরিচর্যা ও ভবিষ্যৎ মেরামতের খরচ। শুরুতে কম খরচের কোনো ভবন ব্যবহারের সময় ব্যয়বহুল হয়ে উঠতে পারে। তাই সচেতনতা তৈরির শুরুতেই ক্রেতা, বাড়ির মালিক ও নির্মাতাদের সামনে আবাসনের পুরো জীবনচক্রের ব্যয়ের হিসাব তুলে ধরা জরুরি। দেশীয় প্রকল্পগুলোর প্রকৃত নির্মাণ ব্যয় ও ব্যবহারকালীন সাশ্রয়ের তথ্য প্রকাশ করা গেলে এ বিষয়ে মানুষের আস্থাও বাড়বে।

দেশীয় গ্রিন বিল্ডিং কাঠামো ও রাজউকের প্রণোদনা

বাংলাদেশের বাস্তবতার উপযোগী সবুজ ভবন মূল্যায়নের জন্য হাউজিং অ্যান্ড বিল্ডিং রিসার্চ ইনস্টিটিউট (এইচবিআরআই) তৈরি করেছে এইচবিআরআই-ডিইএসএইচ ফ্রেমওয়ার্ক। জাতিসংঘ পরিবেশ কর্মসূচির (ইউএনইপি) বৈশ্বিক কর্মসূচির আওতায় এতে কারিগরি সহায়তা দিয়েছে জাতিসংঘ প্রকল্প সেবা কার্যালয় (ইউএনওপিএস)। ডিইএসএইচ-এর পূর্ণরূপ ‘ডিজাইন ফর এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড সাসটেইনেবল হ্যাবিট্যাটস’। আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা পর্যালোচনা করে বাংলাদেশের উষ্ণ ও আর্দ্র জলবায়ু, দুর্যোগঝুঁকি, স্থানীয় উপকরণ এবং আর্থসামাজিক বাস্তবতাকে এতে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ‘ডিইএসএইচবোর্ড’ নকশা ও মূল্যায়নে সহায়তা করে। কাঠামোটি কীভাবে বাস্তবে প্রয়োগ করা যায়, তা পর্যালোচনা করছে ইউএন-হ্যাবিট্যাট।

রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) সংশোধিত বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনা বা ড্যাপেও এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ রয়েছে। ১৪ ডিসেম্বর ২০২৫-এর সংশোধিত গেজেট অনুযায়ী, প্রয়োজনীয় অনুমোদন ও সনদসহ নির্ধারিত শর্ত পূরণকারী সবুজ ভবনের জন্য সর্বোচ্চ ০.৫ অতিরিক্ত এফএআর পাওয়ার সুযোগ রয়েছে। এফএআর হলো জমির আয়তনের তুলনায় ভবনের মোট গণনাযোগ্য মেঝের আয়তনের অনুপাত।

সাশ্রয়ী আবাসনের ক্ষেত্রেও অপরিকল্পিত এলাকায় এ৩ (অ্যাপার্টমেন্ট ও ফ্ল্যাট বাড়ি) ও এ৬ (সাশ্রয়ী আবাসন) মিশ্র ব্যবহারে নির্ধারিত শর্তে সর্বোচ্চ ০.৫ অথবা ০.৭৫ অতিরিক্ত এফএআরের সুযোগ রয়েছে। প্রথমটির জন্য অন্তত ১০ কাঠা জমিতে নির্ধারিত আয়তনের পাঁচটি ইউনিট এবং দ্বিতীয়টির জন্য অন্তত ২০ কাঠা জমিতে মোট ফ্লোর স্পেসের ৫ শতাংশ সংরক্ষণের বিধান রয়েছে। সাশ্রয়ী আবাসনের এ দুটি বিকল্পের মধ্যে একটি প্রযোজ্য হবে।

ডেভেলপার ও বাড়ির মালিকদের এসব সুযোগ গুরুত্বের সঙ্গে মূল্যায়ন করা উচিত। পুরোনো বাড়ির ক্ষেত্রেও প্রয়োজনীয় সংস্কার বা রেট্রোফিটের মাধ্যমে সম্পদ ব্যবহারের দক্ষতা বাড়ানো সম্ভব। ভবনের ধরন ও প্রযোজ্য শর্ত অনুযায়ী এইচবিআরআই-ডিইএসএইচ ফ্রেমওয়ার্কে মূল্যায়ন কিংবা এজ (ইডিজিই) ও লিড (এলইইডি)-এর মতো আন্তর্জাতিক পদ্ধতিতে সবুজ সনদায়নের সুযোগও বিবেচনা করা যেতে পারে।

স্মার্ট সবুজ আবাসন

স্বল্প কার্বন নিঃসরণকারী পরিবেশবান্ধব ভবন বা গ্রিন বিল্ডিং এমনভাবে নকশা ও নির্মাণ করা হয়, যাতে এর পুরো জীবনচক্রে পরিবেশের ওপর বিরূপ প্রভাব সর্বনিম্ন রাখা যায়। এ ধরনের ভবনে কম শক্তি ও পানি ব্যবহার, গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ হ্রাস, নির্মাণসামগ্রীর দক্ষ ব্যবহার এবং ভবনের অভ্যন্তরে স্বাস্থ্যকর পরিবেশ নিশ্চিত করার বিষয়গুলো গুরুত্ব পায়।

ঢাকার প্রেক্ষাপটে—যেখানে শীতলীকরণের চাহিদা, বিদ্যুৎ ব্যবহার, বায়ুদূষণ এবং শহরের তাপমাত্রা বৃদ্ধি বা ‘আরবান হিট’ বড় উদ্বেগের বিষয়—সেখানে টেকসই নগর উন্নয়নে পরিবেশবান্ধব ভবন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

প্রতি বছর রাজউকের আওতাধীন এলাকায় প্রায় ১০ হাজার ভবনের নকশা অনুমোদন দেওয়া হয়। এসব ভবনের মাত্র ১০ শতাংশও যদি গ্রিন বিল্ডিং হিসেবে নির্মিত হয়, তাহলেও তা ঢাকায় সবুজ আবাসন সম্প্রসারণে বড় ভূমিকা রাখতে পারে।

তবে সম্ভাবনা থাকলেও ঢাকায় কম কার্বন নিঃসরণকারী পরিবেশবান্ধব ভবন নির্মাণে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে। প্রচলিত নির্মাণপদ্ধতির তুলনায় জ্বালানি-সাশ্রয়ী প্রযুক্তির প্রাথমিক ব্যয় বেশি হতে পারে। পাশাপাশি ডেভেলপার, ভবনমালিক ও ভোক্তাদের মধ্যে এ বিষয়ে সচেতনতারও ঘাটতি রয়েছে। দক্ষ পেশাজীবী তৈরি এবং এফএআর প্রণোদনার পাশাপাশি কম সুদে ঋণ প্রদানের মাধ্যমে এ খাতকে উৎসাহিত করা যেতে পারে।


উদাহরণ তৈরি করুক বড় প্রতিষ্ঠান

বড় ডেভেলপাররা তাদের নকশা দল, ক্রয়ক্ষমতা ও অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে মধ্যম আয়ের মানুষের আবাসনেও সবুজ নির্মাণের উদাহরণ তৈরি করতে পারেন। সরকারি আবাসন, বিদ্যালয়, হাসপাতাল ও কার্যালয়ের ক্ষেত্রেও শুধু নির্মাণ ব্যয় নয়, জীবনচক্র ব্যয় বিবেচনায় সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন।

এসব প্রকল্পের নির্মাণ ব্যয় এবং ব্যবহারকালীন সাশ্রয়ের তথ্য প্রকাশ করা গেলে অন্যরাও অনুসরণ করার বাস্তব ভিত্তি পাবেন। একই সঙ্গে ব্যাংক ও তহবিলদাতাদের উপযোগী ঋণ ও দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়ন নিয়ে এগিয়ে আসতে হবে। বাংলাদেশ ব্যাংক নীতিগত সহায়তার মাধ্যমে এ ক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে পারে।

দীর্ঘমেয়াদি কিস্তির সুবিধা থাকলেও সীমিত আয়ের পরিবারের পক্ষে বাড়তি প্রাথমিক ব্যয় বহন করা সব সময় সম্ভব নাও হতে পারে। উপযোগী অর্থায়ন সেই ব্যবধান কমাতে পারে। নতুন আবাসনের পাশাপাশি পুরোনো ভবনের জ্বালানি ও সম্পদ ব্যবহারের দক্ষতা বাড়াতে সংস্কারকাজেও অর্থায়ন প্রয়োজন।

কার্বন কনশাস নগর নকশায় তরুণদের ভাবনা

সবুজ ও সাশ্রয়ী নগরের ভবিষ্যৎ নিয়ে তরুণদের ভাবনাও আশাব্যঞ্জক। গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়ে রাজউক, ইউএনওপিএস ও ইউএনইপির যৌথ ‘কার্বন কনশাস আরবান ডিজাইন আইডিয়া কম্পিটিশন’ শিক্ষার্থীদের টেকসই জনপরিসর নিয়ে ভাবার সুযোগ দিয়েছে।

স্থানীয় ও পুনর্ব্যবহৃত উপকরণ, সবুজায়ন, পানি ব্যবস্থাপনা এবং সবার ব্যবহারযোগ্য স্থান নিয়ে তাঁদের ধারণাগুলো ভবিষ্যতের সম্ভাবনার ইঙ্গিত দেয়।

রাজউক ও ইউএনওপিএসের এ সহযোগিতা প্রশংসনীয়। শিক্ষার্থীদের ভাবনায় উঠে এসেছে, পরিবেশবান্ধব জনপরিসর তৈরিতে সব সময় ব্যয়বহুল প্রযুক্তির প্রয়োজন হয় না। স্থানীয় পরিবেশের উপযোগী, দীর্ঘস্থায়ী ও সহজে রক্ষণাবেক্ষণযোগ্য নকশা সীমিত সম্পদেও ভালো নগরপরিসর তৈরি করতে পারে। এসব ধারণার ব্যয় ও নির্মাণযোগ্যতা যাচাই করে বাস্তব প্রয়োগের দিকে এগিয়ে নেওয়া প্রয়োজন।

আগামী দিনের ভবন নিয়ে সিদ্ধান্ত আজই

‘গ্লোবাল স্ট্যাটাস রিপোর্ট ফর বিল্ডিংস অ্যান্ড কনস্ট্রাকশন ২০২৫-২০২৬’ অনুযায়ী, ২০৫০ সালে বিশ্বে যে ভবনসমষ্টি থাকবে, তার প্রায় অর্ধেক এখনো নির্মিত হয়নি। দ্রুত নগরায়ণের পথে থাকা বাংলাদেশের জন্য এই বৈশ্বিক চিত্র একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগের ইঙ্গিত দেয়। আজকের নকশা ও নির্মাণের সিদ্ধান্ত আগামী কয়েক দশকের সম্পদ ব্যবহার, পরিবেশগত প্রভাব এবং মানুষের আবাসন ব্যয় নির্ধারণ করবে।

সেই সুযোগ কাজে লাগাতে এখনই সচেতনতা বাড়ানো, দেশীয় কাঠামোর প্রয়োগ, প্রণোদনার ব্যবহার এবং বাস্তব উদাহরণ তৈরিতে পদক্ষেপ নিতে হবে। সঠিক নকশা, মানসম্মত নির্মাণ ও কার্যকর পরিচালনার মাধ্যমে পরিবেশের সুরক্ষা এবং মানুষের দীর্ঘমেয়াদি সাশ্রয়—দুটিই একসঙ্গে অর্জন করা সম্ভব। সবুজই হতে পারে সাশ্রয়ী আবাসনের ভবিষ্যৎ।

সূত্র: বাংলাদেশ প্রতিদিন

আরও পড়ুন