ইতিহাসের সাক্ষী জামালপুরের মুক্তি সংগ্রাম জাদুঘর ও গান্ধী আশ্রম
ডেইলি সান রিপোর্ট, জামালপুর
প্রকাশ: ০১ অক্টোবর ২০২৬, ০৪:১৫ পিএম
ছবি: জামালপুরের গান্ধী আশ্রম ও মুক্তি সংগ্রাম জাদুঘর। সংগৃহীত
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ও ব্রিটিশ বিরোধী সংগ্রাম দেশ তথা উপমহাদেশের ইতিহাসে বিশাল স্থান দখল করে আছে। ৯ মাস রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর ৩০ লাখ মানুষের প্রাণের বিনিময়ে পাওয়া স্বাধীনতা। তবে এই স্বাধীনতার সংগ্রামের শুরু বহু আগে থেকেই। বাংলার এসব ইতিহাস ধারণ করে আছে দেশের নানান জাদুঘর, প্রতিষ্ঠান ও ঐতিহাসিক স্থান। তেমনই এক স্মৃতিবিজড়িত এবং কালের সাক্ষী জামালপুরের মেলান্দহের গান্ধী আশ্রম ও মুক্তি সংগ্রাম জাদুঘর।
প্রায় ৮০ বছর আগে জামালপুর জেলার মেলান্দহ উপজেলার ঝাউগড়া ইউনিয়নের কাপাশহাটিয়া গ্রামে প্রতিষ্ঠিত হয় গান্ধী আশ্রম। বৃটিশ শাসিত ভারতবর্ষে পরাধীনতার শৃঙ্খল থেকে মুক্তির লক্ষ্যে বিভিন্ন সময়ে লড়াই, সংগ্রাম সংঘটিত হয়। তারই ধারাবাহিকতায় স্বদেশের ব্রতে সে সময়ে জামালপুরে মানুষের কল্যাণে গড়ে উঠেছিল গান্ধী আশ্রমটি।
মহাত্মা মোহন দাস করম চাঁদ গান্ধীর সংক্ষেপে মহাত্মা গান্ধীর নেতৃত্বে অহিংস আন্দোলনের পথরেখা ধরে ১৯৩৪ সালে এক একর জায়গার উপর এই গান্ধী আশ্রমটি প্রতিষ্ঠত হয়। এই আশ্রমটির প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন তৎকালীন বৃটিশ আন্দোলনের কিংবদন্তী ও কৃষক নেতা জামালপুরের কৃতি সন্তান নাসির উদ্দিন সরকার। আর প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক ছিলেন তাঁরই জ্যৈষ্ঠ কন্যা রাজিয়া খাতুন। সে সময় আশ্রমের কার্যক্রমের মধ্যে খাদি কাপড় বোনা থেকে শুরু করে শিক্ষা কার্যক্রম, পাঠাগার, স্বাবলম্বন, হস্তশিল্প, কারুশিল্প তৈরী, শরীরচর্চা, স্বাস্থ্য সেবাসহ স্বদেশের কল্যাণে নানা কর্মসূচি স্থান পেয়েছিল।
স্বদেশ চেতনা ও প্রেমে তরুণ সমাজকে উদ্বুদ্ধ করাই ছিল গান্ধী আশ্রমের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। পরবর্তী সময়ে পাকিস্তানের শাসকচক্র বেশ কয়েকবার হামলা চালিয়ে আশ্রমটির বহু মূল্যবান স্থাপনা গুঁড়িয়ে দিয়েছিল। সে সময়ে তাদের হামলায় আশ্রমের অফিস ঘরটি ছাড়া প্রায় সব কিছুই ধ্বংস হয়েছিল। বাঙ্গালীর মুক্তির পথ খুঁজতে প্রকাশ্যে ও গোপন অসংখ্য সভা অনুষ্ঠিত হয়েছিল গান্ধী আশ্রমের ওই ঐতিহাসিক ঘরটিতে।
বিভিন্ন সময়ে অনুষ্ঠিত ঐতিহাসিক সেসব সভায় যোগ দিয়েছিলেন শেরে বাংলা এ কে এম ফজলুল হক, মজলুম জননেতা মওলানা ভাসানী, সাম্যবাদী আন্দোলনের পথিকৃৎ মণি সিংহ, সব্যসাচী লেখক রনেশ দাশ, বিপ্লবী কথা সাহিত্যিক সত্যেন সেন, বারানী দত্ত, খোকা রায়, অনিল মুখার্জি, সুরেন্দ্র মোহন ঘোষ, জ্ঞান চক্রবর্তী, মুক্তিযুদ্ধকালীন ইন্ধিরা গান্ধীর মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক উপদেষ্টা অধ্যাপক শান্তিময় রায়, রবি নিয়োগী, বিধুভূষণ সেন, নগেন মোদক, ইসমাইল হোসেন সিরাজী, আশু দত্ত, কৃষক নেতা হাতেম আলী খান ও আব্দুস সাত্তার, হেমন্ত ভট্টাচার্য্য, সম্মথ দে, খন্দকার বাকীসহ বহু বিশিষ্টজন।
১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় ওই অফিস ঘরটি মুক্তিযোদ্ধাদের আশ্রয়স্থল এবং অস্ত্র ও রসদ রাখাসহ নানা কাজে ব্যবহৃত হয়েছিলো। স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে স্বদেশের কল্যাণে মানবতা, শান্তি, সহিঞ্চুতা, সম্প্রীতি ও সৌহার্দ্যের বাণী নিয়ে এখনও নিরন্তর কাজ করে চলেছে ঐতিহাসিক এই গান্ধী আশ্রমটি।
এ অঞ্চলের জনগোষ্ঠীর উদ্যোগে ২০০৭ সালের ২রা অক্টোবর মহাত্মা গান্ধীর জন্মদিন উপলক্ষ্যে জাতিসংঘ ঘোষিত আন্তর্জাতিক অহিংস দিবস উদযাপনের মধ্য দিয়ে পুনরায় শুরু হয় মানব কল্যাণে জামালপুরের গান্ধী আশ্রমের নানা কার্যক্রম।
এই গান্ধী আশ্রমের পাশেই ২০০৯ সালের ২৩শে ডিসেম্বর মুক্তি সংগ্রাম জাদুঘরের ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন করা হয়। জেলা পরিষদের বাস্তবায়নে বিশাল আকৃতির জাদুঘরটির নির্মাণ শেষ। বাহারী ফুল আর বিভিন্ন গাছপালা ঘেরা প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের দৃষ্টিনন্দন এই গান্ধী আশ্রম ও মুক্তি সংগ্রাম জাদুঘরটি যে কোন পর্যটকের মনকে আকৃষ্ট করবে।
বিভিন্ন সময়ে এখানে ঘুরতে আসা দেশী-বিদেশী অতিথিরা নানা প্রজাতির বৃক্ষ যেমন- বকুল, হরিতকী, জারুল, মে-ফ্লাওয়ার, কৃষ্ণচূড়া ইত্যাদির চারা রোপন করে গেছেন। এসব অতিথিদের মধ্যে রয়েছেন সাবেক ভারতীয় রাষ্ট্রদূত শ্রী পিনাক রঞ্জন চক্রবর্তী, দিল্লী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর রাবী চক্রবর্তী, ডা.দীপক মিত্তালী, সঞ্চয় ভট্টাচার্য, ড. খন্দকার শওকত হোসেনসহ আরো অনেকেই।
স্থানীয় ঝাউগড়া ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান ও গান্ধী আশ্রমের প্রতিষ্ঠাতা নাসির উদ্দিন সরকারের দৌহিত্র হিল্লোল সরকার বলেন, জাদুঘরটি চালুর পর থেকে এলাকটি একটি পর্যটন কেন্দ্রে পরিনত হয়েছে। তিনি বলেন, গান্ধী আশ্রমটিকে ঘিরে ব্যাপক কার্যক্রম হাতে নেওয়া হয়েছে। ইতোমধ্যেই গান্ধী ট্রাষ্টের উদ্যোগে এলাকার হত দরিদ্র ছেলে মেয়েদের আত্মকর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে সেলাই প্রশিক্ষণ ও কম্পিউটার প্রশিক্ষণ কর্মসূচি চালু করা হয়েছে।
যেভাবে যাবেন:
গান্ধী আশ্রমে যাওয়ার জন্য ঢাকা থেকে সরাসরি বাসে জামালপুর সদর উপজেলায় আসতে হবে। এছাড়াও ঢাকা থেকে ট্রেনেও জামালপুর আসা যায়। জামালপুর সদর উপজেলার গেট পার থেকে অটোরিকশা দিয়ে যেতে হবে হাজীপুর বাজার অথবা সরাসরি জাদুঘরেও যেতে পারবেন। জামালপুর সদর উপজেলা থেকে কাপাসহাটিয়া যেতে খরচ পড়বে জনপ্রতি ৫০-৬০ টাকা। রাস্তা সরু হওয়ায় মাইক্রোবাস নিয়ে যাওয়ার সুযোগ থাকলেও বড় বাস নিয়ে যাওয়া যাবে না।
কোথায় থাকবেন :
গান্ধী আশ্রম এলাকায় থাকার সুব্যবস্থা রয়েছে। এছাড়াও জামালপুর শহরে অনেক সুন্দর সুন্দর আবাসিক হোটেল রয়েছে। আবাসিক হোটেলগুলোতে স্বল্প খরচে রাত্রি যাপনের সুযোগ রয়েছে। গান্ধী আশ্রম এলাকায় ছোট ছোট রেস্তোরা পাবেন, সেখানে খুব কমমূল্যে খাবার খেতে পারবেন। এছাড়াও জামালপুর শহরে হোটেল, সম্রাট, তাজ হোটেল নামক কয়েকটি রেস্তোরা সহ অনেক ফাস্টফুডের দোকান আছে। সেখানে আপনি জামালপুরের ঐতিহ্যবাহী খাবার পাবেন।