EN ☀️
×

Follow Us

বাংলাদেশ

ঢাকায় দুই বছর পরই হারিয়ে যায় প্রিয়জনের কবর

বনানী কবরস্থানে ১৫ বছরের জন্য কবর সংরক্ষণে ফি ১ কোটি এবং ২৫ বছরের জন্য দেড় কোটি টাকা

ডেইলি সান রিপোর্ট, ঢাকা

প্রকাশ: ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১:৫৬ এএম

ঢাকায় দুই বছর পরই হারিয়ে যায় প্রিয়জনের কবর

ছবি: সংগৃহীত

অ অ

পল্লীকবি জসীমউদ্দীনের ‘কবর’ কবিতায় দাদির কবরের পাশে দাঁড়িয়ে নাতিকে স্মৃতিচারণ করতে দেখা যায়। কিন্তু বাস্তবের ঢাকায় সেই সুযোগ সবার নেই। জায়গার সংকটে রাজধানীর সাধারণ কবরের চিহ্ন সাধারণত দুই বছর পরই মুছে যায়। এরপর একই জায়গায় দাফন করা হয় নতুন মরদেহ।

প্রায় তিন কোটি মানুষের এই শহরে সরকারি কবরস্থান রয়েছে মাত্র ১৩টি। এসব কবরস্থানের মোট আয়তন প্রায় ২৫৩ একর। বিপুল জনসংখ্যার তুলনায় কবরস্থানের জায়গা সীমিত হওয়ায় পুরোনো কবর পুনর্ব্যবহার এখন রাজধানীর কবরস্থান ব্যবস্থাপনার নিয়মিত বাস্তবতা।

স্বজনের কবরের চিহ্ন ধরে রাখতে তাই অনেক পরিবারকে বাড়তি অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে। কোথাও মাসে মাসে কবরের পরিচর্যার জন্য টাকা দিতে হচ্ছে, আবার কোথাও দীর্ঘ মেয়াদে কবর সংরক্ষণ করতে গুনতে হচ্ছে লাখ থেকে কোটি টাকা।

২০২৫ সালের এপ্রিলে পুরান ঢাকার সূত্রাপুরের বাসিন্দা রফিকুল ইসলাম মারা গেলে তাকে জুরাইন কবরস্থানে দাফন করা হয়। সিটি করপোরেশনের নির্ধারিত দাফন ফি ছিল ১ হাজার টাকা। তবে তার স্বজনদের দাবি, দাফন সম্পন্ন করতে তাদের অন্তত ১০ হাজার টাকা খরচ হয়।

এর বাইরে কাঠের নামফলকের জন্য ৩০০ টাকা এবং কবর সাজানো ও সাময়িক সংরক্ষণের জন্য আরও ১ হাজার টাকা নেওয়া হয়। কবরটি অক্ষত রাখতে মাসে ৫০০ টাকা দেওয়ার কথাও তাদের বলা হয় বলে পরিবারের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছে।

রফিকুল ইসলামের এক আত্মীয় আহাদুজ্জামান বলেন, মাসিক টাকা দেওয়া বন্ধ করলে কবরের মাটি সমান করে সেখানে অন্য মরদেহ দাফন করা হতে পারে—এমন কথাও তাদের জানানো হয়েছিল। স্বজন হারানোর শোকের মধ্যেই তাই পরিবারটির সামনে নতুন দুশ্চিন্তা দেখা দেয়—কত দিন থাকবে প্রিয়জনের কবরের চিহ্ন?

কবরস্থানে দাফন ও পরিচর্যার সঙ্গে যুক্ত অনানুষ্ঠানিক কর্মীদের নিয়েও অভিযোগ রয়েছে। তাদের সরকারি নিয়োগ না থাকলেও নিজেদের ‘সহায়ক কর্মী’ পরিচয়ে বিভিন্ন কাজে যুক্ত থাকার তথ্য পাওয়া গেছে। কবরের চারপাশে বাঁশের বেড়া দিতে ২ হাজার থেকে ৬ হাজার টাকা, কবর সাজানো বা ঘাস লাগাতে প্রায় ১ হাজার টাকা এবং পানি দেওয়া ও নিয়মিত পরিচর্যার জন্য মাসে ৩০০ থেকে ৫০০ টাকা নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

রায়েরবাজার কবরস্থানে দীর্ঘদিন কাজ করা একজন কর্মী স্বজনদের কাছ থেকে এসব অর্থ নেওয়ার কথা স্বীকার করেছেন। তার দাবি, এই আয়ের একটি অংশ সিটি করপোরেশনের কিছু অসাধু কর্মীর কাছেও যায়। 

সরকারি নীতিমালায় সাধারণ কবরের ওপর বাঁশ, ইট, লোহার গ্রিল বা অন্য কোনো উপায়ে স্থায়ী অবকাঠামো বা বেড়া দেওয়া নিষিদ্ধ। সাধারণ কবরের ক্ষেত্রে দুই বছর পর্যন্ত জায়গাটি ব্যবহারের বিধান থাকলেও স্বজনদের অভিযোগ, নিয়মিত কবর দেখতে না গেলে বা পরিচর্যার টাকা দেওয়া বন্ধ হলে কোনো কোনো ক্ষেত্রে এর আগেই কবরের চিহ্ন মুছে দেওয়া হয়।

অর্থ থাকলে অবশ্য কবর দীর্ঘ মেয়াদে সংরক্ষণ করার সুযোগ রয়েছে। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের কবরস্থানসমূহের নীতিমালা অনুযায়ী, বনানী কবরস্থানে ১৫ বছরের জন্য কবর সংরক্ষণে ফি ১ কোটি টাকা এবং ২৫ বছরের জন্য দেড় কোটি টাকা।

উত্তরা ৪ নম্বর সেক্টর কবরস্থানে ১৫ ও ২৫ বছরের জন্য যথাক্রমে ৭৫ লাখ ও ১ কোটি টাকা; উত্তরা ১২ নম্বর সেক্টরে ৫০ লাখ ও ৭৫ লাখ টাকা এবং উত্তরা ১৪ নম্বর সেক্টরে ৩০ লাখ ও ৫০ লাখ টাকা দিতে হয়।

মিরপুর শহীদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে ১৫ বছরের জন্য ২০ লাখ এবং ২৫ বছরের জন্য ৩০ লাখ টাকা। রায়েরবাজার বধ্যভূমিসংলগ্ন কবরস্থানে এই ফি যথাক্রমে ১০ লাখ ও ১৫ লাখ টাকা।

তবে বাস্তবে বনানী কবরস্থানে কবর সংরক্ষণে ব্যয় আরও বেশি হওয়ার অভিযোগ রয়েছে। এই কবরস্থানে একই কবরে পরিবারের অন্য সদস্যকে দাফনের জন্য ৫০ হাজার ৫০০ টাকা ফি নির্ধারিত রয়েছে।

সময় গড়ানোর সঙ্গে কবর সংরক্ষণের ব্যয়ও বেড়েছে। পুরোনো নথি অনুযায়ী, ১৯৯৬ সালে বনানী ও উত্তরা ৪ নম্বর সেক্টর কবরস্থানে স্থায়ীভাবে কবরের জায়গা কিনতে খরচ হতো ১ লাখ ২০ হাজার টাকা। মিরপুর শহীদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে জায়গা পাওয়া যেত ২৫ হাজার থেকে ৩৫ হাজার টাকায়।

২০০৫ থেকে ২০০৭ সাল পর্যন্ত স্থায়ীভাবে কবরের জায়গা কেনা বন্ধ ছিল। এরপর ২০০৮ সাল থেকে মেয়াদভিত্তিক কবর সংরক্ষণ ব্যবস্থা চালু হয়। ২০২৩ সালে ফি বাড়ানোর আগে বনানী কবরস্থানে ১৫ বছরের জন্য সর্বোচ্চ সংরক্ষণ ফি ছিল ২৪ লাখ টাকা এবং ২৫ বছরের জন্য ৪৫ লাখ টাকা।

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের অধীন সাতটি কবরস্থানে অগ্রিম কবর সংরক্ষণ বর্তমানে বন্ধ। কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ও জায়গা থাকা সাপেক্ষে ১৫ বা ২৫ বছরের জন্য কবর সংরক্ষণ করা যায়। মেয়াদ শেষে পুনরায় সংরক্ষণ করতে হলে নতুন করে অনুমোদন নিতে হয়।

বনানী কবরস্থানে নতুন দাফনের জায়গার সংকট সবচেয়ে বেশি। সেখানে ৯ হাজারের বেশি কবর রয়েছে। জায়গার সংকটের কারণে সাধারণ কবর দুই বছর পর পুনর্ব্যবহার করা হয়। সংরক্ষিত কোনো কোনো কবরে পরিবারের একাধিক সদস্যকে দাফনের নজিরও রয়েছে। কোনো কোনো কবরে সাতজন পর্যন্ত দাফন করা হয়েছে।

ডিএনসিসির প্রধান সমাজকল্যাণ ও বস্তি উন্নয়ন কর্মকর্তা মোহাম্মদ মামুন-উল-হাসান বলেন, সাধারণ কবর দেওয়ার খরচ বাড়ানো হয়নি। দীর্ঘ মেয়াদে কবর সংরক্ষণে ফি বাড়ানো হয়েছে। তার ভাষ্য, সবাই কবর সংরক্ষণ করতে চাইলে ঢাকায় কবরের জায়গা পাওয়া কঠিন হয়ে পড়বে।

কবরের জায়গা নিয়ে সংকট ও বিরোধ অবশ্য নতুন নয়। ২০০৬ সালে আজিমপুর কবরস্থানের শতাধিক স্থায়ী ও অস্থায়ী কবর ভেঙে সড়ক নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। পরে হাইকোর্টের হস্তক্ষেপে সেই উদ্যোগ বন্ধ হয়।

কবরস্থান ব্যবস্থাপনায় অনিয়মের অভিযোগও বিভিন্ন সময়ে উঠেছে। মাঠপর্যায়ে কবরস্থানকেন্দ্রিক অনানুষ্ঠানিক চক্রের সঙ্গে অসাধু কর্মচারীদের যোগসাজশের অভিযোগ রয়েছে।

উত্তরা ৪ নম্বর সেক্টরের বাসিন্দা আবু রায়হান জানান, তিন বছর আগে তার খালু আব্দুল আলী মারা গেলে ঢাকায় দাফনের চেষ্টা করা হয়েছিল। আত্মীয়দের বেশির ভাগ ঢাকায় থাকায় পরিবারের ইচ্ছা ছিল, স্বজনেরা যেন সহজে কবর জিয়ারত করতে পারেন। কিন্তু কবর সংরক্ষণের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ জোগাড় করতে না পারায় শেষ পর্যন্ত আব্দুল আলীর মরদেহ কুষ্টিয়ায় গ্রামের বাড়িতে নিয়ে দাফন করা হয়।

জসীমউদ্দীনের কবিতায় তিরিশ বছর পরও দাদির কবরের চিহ্ন অটুট থাকে। কিন্তু জায়গার সংকটে থাকা ঢাকায় অনেক পরিবারের কাছে প্রিয়জনের কবর দীর্ঘদিন ধরে রাখাটাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ। মৃত্যুর পরও শেষ ঠিকানাটুকু নিশ্চিত করতে যেখানে অর্থের সামর্থ্য বড় ভূমিকা রাখে, সেখানে সাধারণ মানুষের জন্য স্মৃতি ধরে রাখার সুযোগও ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে।

সূত্র: কালের কণ্ঠ।

আরও পড়ুন