EN ☀️
×

Follow Us

বাংলাদেশ

অদৃশ্য চক্রের নিয়ন্ত্রণে পেনশনভোগীদের সার্ভার

ডেইলি সান রিপোর্ট, ঢাকা

প্রকাশ: ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১:২৮ এএম

অদৃশ্য চক্রের নিয়ন্ত্রণে পেনশনভোগীদের সার্ভার

ছবি: সংগৃহীত

অ অ

সরকারি অর্থ ব্যবস্থাপনার অনলাইন প্ল্যাটফর্ম আইবাস++ ও ইআরপি সিস্টেমের নিরাপত্তাব্যবস্থা পাশ কাটিয়ে নওগাঁর ধামইরহাট উপজেলা হিসাবরক্ষণ কার্যালয়ে অভিনব আর্থিক জালিয়াতির ঘটনা ঘটেছে। অভ্যন্তরীণ তদন্তে উঠে এসেছে, সরকারি অফিসের কম্পিউটারে ‘কালি লিনাক্স’ ও ‘রিভিলার কি-লগার’ ইনস্টল করে কর্মকর্তাদের পাসওয়ার্ড হাতিয়ে নেওয়া হয়েছিল।

চুরি করা ইউজার আইডি ও পাসওয়ার্ড ব্যবহার করে আইবাস++ ও ইআরপি সিস্টেমে প্রবেশের পর ভুয়া এনআইডি, অস্তিত্বহীন পেনশনভোগী ও ভুয়া ব্যাংক হিসাব তৈরি করা হতো। পরে এসব হিসাবের মাধ্যমে সরকারি অর্থ স্থানান্তর করা হয়েছে।

২০০৬ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত প্রায় ১৭ বছর ধরে চলা এই জালিয়াতিতে সারা দেশে প্রায় আড়াই হাজার কোটি টাকা আত্মসাতের ঘটনা ঘটেছে বলে সংশ্লিষ্ট নথিতে উঠে এসেছে। তবে অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্য বলছে, বিষয়টি শুধু কয়েকজন কর্মকর্তার ইউজার আইডি অপব্যবহারের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। প্রযুক্তিগত প্রমাণে কর্মকর্তাদের অগোচরে তাঁদের পরিচয় ব্যবহার করে একটি চক্র সার্ভারে প্রবেশ ও আর্থিক লেনদেন নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করেছে বলে তথ্য পাওয়া গেছে।

হিসাবরক্ষণ কার্যালয়ের কর্মকর্তারা জানান, পেনশনভোগীদের ভাতার টাকা সাধারণত এক বছরের জন্য বরাদ্দ দেওয়া হয়। পরে নিয়ম অনুযায়ী পেনশনভোগীদের মধ্যে তা বিতরণ করা হয়। কারণ নিয়মিত নতুন পেনশনভোগী যুক্ত হন এবং অনেকে তালিকা থেকে বাদ পড়েন। তদন্তসংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এই ব্যবস্থার সুযোগই জালিয়াতির কাজে ব্যবহার করা হয়েছে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, ভুক্তভোগীদের মাসিক পেনশন সাধারণত ১১ হাজার থেকে ২৬ হাজার টাকার মধ্যে। তবে পাওনা টাকার বাইরে প্রায় প্রতি মাসেই একাধিকবার তাঁদের হিসাবে অর্থ পাঠানো হয়েছে। পরে এসব অর্থের একটি অংশ নির্দিষ্ট কিছু প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাবে স্থানান্তর করা হয়।

একটি ফরেনসিক তদন্ত নথিতে বলা হয়েছে, কম্পিউটারে ‘ভার্চুয়াল বক্স’ সফটওয়্যারের মাধ্যমে ‘কালি লিনাক্স’ ব্যবহার করা হয়েছিল। একই কম্পিউটারে ‘রিভিলার কি-লগার’ সফটওয়্যারও সক্রিয় পাওয়া যায়। এই ধরনের সফটওয়্যার কম্পিউটারে টাইপ করা তথ্য গোপনে সংরক্ষণ করতে পারে। তদন্তসংশ্লিষ্টদের ধারণা, এর মাধ্যমে সরকারি হিসাবরক্ষণ ব্যবস্থায় ব্যবহৃত পাসওয়ার্ড সংগ্রহ করা হয়েছিল।

দুদকের অনুসন্ধানসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভাষ্য, প্রযুক্তিগত অনুপ্রবেশের মাধ্যমে চক্রটি সরকারি কর্মকর্তাদের পরিচয় ব্যবহার করে বিল তৈরি, অনুমোদন ও অর্থ ছাড়ের কাজ চালিয়ে থাকতে পারে। কিন্তু নথিতে এসব কার্যক্রম সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ইউজার আইডি থেকে হয়েছে বলে দেখা যায়।

তদন্তে জানা গেছে, কিছু ক্ষেত্রে পেনশনভোগীদের হিসাবে টাকা পাঠানোর পর সেখান থেকে কমিশন রেখে বাকি অর্থ নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানের নামে খোলা ব্যাংক হিসাবে ফেরত নেওয়া হতো। এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে আদনান এন্টারপ্রাইজ, তামান্না এন্টারপ্রাইজ ও আদর্শ স্টেশনারির নাম এসেছে।

সাধারণত দুই ধাপে প্রায় চার লাখ টাকা পাঠানো হতো। এর মধ্যে ৮০ হাজার থেকে এক লাখ টাকা পর্যন্ত কমিশন হিসেবে রেখে দেওয়া হতো বলে তদন্তসংশ্লিষ্ট নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে। দুদকের একটি অনুসন্ধানে দেখা যায়, একটি ব্যাংকের দুটি শাখা থেকে কয়েক মাসের ব্যবধানে আদর্শ স্টেশনারির হিসাবে নয় লাখের বেশি টাকা জমা হয়েছে। ওই হিসাবের মালিক নিজেও একজন পেনশনভোগী হিসেবে চিহ্নিত।

একইভাবে আদনান ও তামান্না এন্টারপ্রাইজের হিসাবেও লাখ লাখ টাকা জমা পড়ার তথ্য পাওয়া গেছে। এসব লেনদেনে একই ব্যক্তির নাম বারবার জমাদানকারী হিসেবে এসেছে।

তদন্তে আরও জানা গেছে, ধামইরহাটের ঘটনার মতো একই ধরনের কারসাজির অভিযোগ অন্য জেলাতেও পাওয়া গেছে। চুয়াডাঙ্গার ইউসিবিএল শাখায় একটি হিসাব থেকে ওটিপি ব্যবহার করে অস্বাভাবিক লেনদেনের অভিযোগে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ থানায় সাধারণ ডায়েরি করে। ঝালকাঠি জেলা হিসাবরক্ষণ কার্যালয় থেকেও আইবাস++-সংশ্লিষ্ট অস্বাভাবিক লেনদেনের বিষয়ে পুলিশ ও ব্যাংকের কাছে অভিযোগ পাঠানো হয়।

মহাহিসাবরক্ষণ কার্যালয়ের তদন্ত কমিটির প্রাথমিক প্রতিবেদনে দুজনকে সরাসরি দায়ী করা হয়। তাঁরা হলেন সিসিডিএফ কার্যালয়ের সাবেক অডিট সুপার শাহীনুর রহমান খান এবং উপসহকারী ফাইন্যান্স কন্ট্রোলার ইশরাত জাহান। তাঁদের ইউজার আইডি ব্যবহার করে পেনশন ও ভাতার বকেয়া বিলের সার্টিফিকেট অনুমোদন, বিল অনুমোদন এবং ইলেকট্রনিক ফান্ড ট্রান্সফারের প্রমাণ পাওয়ার কথা বরখাস্তের আদেশে উল্লেখ করা হয়েছে। সরকারি চাকরি আইন, ২০১৮-এর ৩৯(১) ধারা অনুযায়ী ২ সেপ্টেম্বর তাঁদের সাময়িক বরখাস্ত করা হয়।

দুদকের সহকারী পরিচালক হোসাইন শরীফ বলেন, ‘এটি অনেক বড় চক্র। এর কিছু অংশ পাওয়া গেছে। এদের গভীরে যেতে অনুসন্ধান কার্যক্রম চলছে।’

রাজবাড়ীর সাবেক হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা ও বর্তমানে মেহেরপুরে কর্মরত রাশেদুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, ‘যারা যে সিস্টেমে জালিয়াতিটা করেছে তা শিখিয়ে দেওয়া। আর তারা কম্পিউটারের মাধ্যমে তা করেছে।’

তদন্তে আরও উঠে এসেছে, আইবাস++ ব্যবস্থায় প্রবেশের পর ওটিপি ব্যবহার করেও সরকারি অর্থ স্থানান্তর করা হয়েছে। তৎকালীন ক্যাশিয়ার মো. আশরাফুল আলমের ইউজার আইডি ব্যবহার করে কয়েকটি লেনদেনের তথ্য পাওয়া গেছে। এসবের কিছু লেনদেন গভীর রাতে হয়েছে। একটি ঘটনায় রাত পেরিয়ে ভোর ৩টা ৯ মিনিট ও ৩টা ৫৬ মিনিটে ওটিপি ব্যবহার করে সরকারি অর্থ স্থানান্তরের তথ্য রয়েছে।

আরেকটি ঘটনায় একক হস্তক্ষেপের মাধ্যমে ৯৬ লাখ ৭০ হাজার ১৫ টাকা সহকারী কোষাধ্যক্ষ ও ভুয়া গ্রাহকদের হিসাবে স্থানান্তরের প্রমাণ পাওয়া গেছে।

জালিয়াতির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো একই এনআইডি ব্যবহার করে একাধিক ব্যক্তির পরিচয় তৈরি করা। আইবাস++ ও ইআরপি সার্ভারের তথ্য বিশ্লেষণে এমন কয়েকটি এনআইডির সন্ধান পাওয়া গেছে, যেগুলোর ক্ষেত্রে মূল সার্ভারের নামের সঙ্গে আইবাসে থাকা নামের মিল নেই।

উদাহরণ হিসেবে, একটি এনআইডিতে মূল সার্ভারে নাম রয়েছে ‘জাহানারা বেগম’; কিন্তু আইবাসে একই এনআইডি ‘মোছা. জাহানারা খাতুন’ নামে ব্যবহার করা হয়েছে। অন্য কয়েকটি এনআইডিতে মূল সার্ভারে ভিন্ন ব্যক্তির নাম থাকলেও আইবাসে সেগুলো একই নামে দেখানো হয়েছে। এতে সরকারি অর্থ ছাড়ের আগে ব্যক্তির পরিচয় যাচাইয়ের ব্যবস্থায় কীভাবে কারসাজি করা হয়েছিল, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

তদন্তে একই এনআইডি ব্যবহার করে দুই পরিচয়ে পেনশনসংক্রান্ত লেনদেনের তথ্যও পাওয়া গেছে। একটি এনআইডি দিয়ে ‘মোছা. জাহেদা পারভীন’ ও ‘মোছা. জাহানারা খাতুন-২’ নামে লেনদেন দেখানো হয়েছে। এসব লেনদেনে পারিবারিক পেনশন, জিপিএফ ও ইএফটির মাধ্যমে সরকারি অর্থ তোলার তথ্য পাওয়া গেছে।

জালিয়াতির অর্থ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের স্বজন ও সহযোগীদের ব্যাংক হিসাবেও স্থানান্তরের তথ্য পাওয়া গেছে। ক্যাশিয়ার আশরাফুল আলমের বোন মোছা. নাদিরা সুলতানার রূপালী ব্যাংকের নওগাঁ শাখার হিসাবে ইএফটির মাধ্যমে অর্থ পাঠানো হয়। এ ছাড়া মোছা. ফজিলা ইয়াছমিন ও মোছা. শাহানারা খাতুনের বিভিন্ন ব্যাংক হিসাবেও টাকা যাওয়ার তথ্য রয়েছে। এসব হিসাবে ধাপে ধাপে মোট ৪৯ লাখ ২৩ হাজার ২৩৯ টাকা স্থানান্তরের তথ্য পাওয়া গেছে।

ব্যাংকিং ব্যবস্থার মাধ্যমে সরকারি অর্থ সরানোর আরেকটি ঘটনাও তদন্তে উঠে এসেছে। ধামইরহাটের ইউসিবিএল শাখার একটি পে-অর্ডার ব্যবহার করে চুয়াডাঙ্গা শাখার জুনিয়র অফিসার মো. শাহরিয়ার আলমের হিসাবে ৫০ লাখ ৬ হাজার ৪৬৫ টাকা স্থানান্তরের তথ্য পাওয়া গেছে।

ঘটনার সূত্র ধরে নওগাঁর ধামইরহাট উপজেলা হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা (অতিরিক্ত দায়িত্ব) মোছা. জাহানারা খাতুন ২০২৩ সালের ১৪ আগস্ট ধামইরহাট থানায় মামলা করেন। মামলায় চারজনকে প্রধান আসামি করা হয়। তাঁরা হলেন সাবেক ক্যাশিয়ার মো. আশরাফুল ইসলাম (৩৮), মোছা. জাহানারা খাতুন (৪৬), মোছা. মাজেদা পারভীন (৪৮) ও মোছা. শাহিদা খাতুন সীমা (৩৮)।

এজাহার অনুযায়ী, ২০০৬ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত ১৭ বছরে ব্যাংক কর্মকর্তা-কর্মচারীদের যোগসাজশে এবং ভুয়া এনআইডি ব্যবহার করে সরকারি কোষাগার থেকে কয়েক কোটি টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে।

শীর্ষস্থানীয় তথ্যপ্রযুক্তি সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান মাইসফট হ্যাভেন (বিডি) লিমিটেডের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা প্রকৌশলী মো. মোফাখখারুল ইসলাম পল্লব বলেন, ‘দীর্ঘ ১৬ বছর দেশের ই-গভর্ন্যান্স ও এন্টারপ্রাইজ সফটওয়্যার সেক্টরে কাজ করার অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি, আইবাসে যা ঘটেছে তা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। বরং এটি সিস্টেম গভর্ন্যান্সের একটি ক্লাসিক ব্যর্থতা।’

তিনি আশা করেন, তদন্ত শুধু জড়িত ব্যক্তিদের চিহ্নিত করার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা ঠেকাতে জাতীয় পর্যায়ে একটি সুস্পষ্ট সাইবার গভর্ন্যান্স নীতিমালা তৈরিতেও এ তদন্ত ভূমিকা রাখবে।

সূত্র: নিউজ২৪

আরও পড়ুন