মানবতাবিরোধী অপরাধে কাদের-নাছিম-আরাফাত-সাদ্দামসহ ৭ আসামির মৃত্যুদণ্ড
ডেইলি সান রিপোর্ট, ঢাকা
প্রকাশ: ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:৩০ পিএম
ছবি: সংগৃহীত
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, সাবেক তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আরাফাত, ছাত্রলীগের সভাপতি সাদ্দাম সহ সাত আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২।
মঙ্গলবার (১৫ সেপ্টেম্বর) দুপুর সোয়া ১২টার দিকে ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেল এ রায় ঘোষণা করেন। প্যানেলের অন্য দুই সদস্য হলেন বিচারক মো. মঞ্জুরুল বাছিদ ও বিচারক নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীর।
মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত অন্য আসামিরা হলেন- যুবলীগের সভাপতি শেখ ফজলে শামস পরশ, সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হোসেন খান নিখিল, ছাত্রলীগের সভাপতি সাদ্দাম হোসেন এবং সাধারণ সম্পাদক শেখ ওয়ালী আসিফ ইনান। সাত আসামিই পলাতক থাকায় তাঁদের অনুপস্থিতিতে বিচার সম্পন্ন হয়।
ট্রাইব্যুনালের পর্যবেক্ষণ
রায়ের পর্যবেক্ষণে বলা হয়, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে ছাত্র-জনতার আন্দোলন দমনের উদ্দেশ্যে আসামিরা পারস্পরিক যোগসাজশে প্ররোচনা ও উসকানিমূলক বক্তব্য দেন এবং গণহত্যার নির্দেশ দেন। তাঁরা দলীয় নেতাকর্মীদের সশস্ত্র অবস্থায় রাজপথে নামিয়ে আন্দোলন প্রতিহত করার আহ্বান জানান এবং একাধিক রুদ্ধদ্বার বৈঠকে সহিংসতার পরিকল্পনা করেন।
এ ছাড়া আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে অপব্যবহার, কোথাও কোথাও প্রত্যক্ষ সশস্ত্র হামলা এবং ঘটনার সত্য গোপনে গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখার কথাও পর্যবেক্ষণে উল্লেখ করা হয়। এসব কর্মকাণ্ডের ফলে দেশজুড়ে হত্যা, হত্যাচেষ্টা ও ব্যাপক সহিংসতার ঘটনা ঘটে এবং তা আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনাল) আইন অনুযায়ী মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে বলে ট্রাইব্যুনাল উল্লেখ করেন।
যেভাবে শুরু হয় বিচার
মামলার তদন্ত শুরু হয় ২০২৫ সালের ১৮ জুন। তদন্ত শেষে একই বছরের ৭ ডিসেম্বর চিফ প্রসিকিউটর কার্যালয়ে চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়। যাচাই-বাছাই শেষে ১৮ ডিসেম্বর ট্রাইব্যুনালে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করা হলে সেদিনই তা আমলে নেওয়া হয়।
আসামিরা আত্মগোপনে থাকায় তাঁদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়। পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে হাজির হওয়ার নির্দেশও দেওয়া হয়। পাশাপাশি আসামিদের আইনগত অধিকার নিশ্চিত করতে রাষ্ট্রীয় খরচে স্টেট ডিফেন্স আইনজীবী নিয়োগ দেওয়া হয়।
চলতি বছরের ২২ জানুয়ারি সাত আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের মাধ্যমে বিচার শুরুর আদেশ দেন ট্রাইব্যুনাল। ১৭ ফেব্রুয়ারি প্রসিকিউশনের সূচনা বক্তব্য ও প্রথম সাক্ষীর জবানবন্দির মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিক বিচার শুরু হয়।
বিচার চলাকালে তদন্ত কর্মকর্তাসহ রাষ্ট্রপক্ষে মোট ২৯ জন সাক্ষ্য দেন। মামলায় আলামত ও প্রমাণের পক্ষে ১২৩ সিরিজের নথি ও ডিজিটাল প্রমাণ উপস্থাপন করা হয়। সাক্ষীদের মধ্যে শহীদ শরিফ ওসমান হাদির মৃত্যুর আগে দেওয়া লিখিত জবানবন্দিও ছিল।
২ আগস্ট সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ হওয়ার পর ৪ আগস্ট যুক্তিতর্ক শুরু হয়। টানা নয় কার্যদিবস শুনানি শেষে ১৭ আগস্ট মামলাটি রায়ের জন্য অপেক্ষমাণ রাখা হয়। পরে ১৫ সেপ্টেম্বর রায় ঘোষণার দিন নির্ধারণ করা হয়।
রাষ্ট্রপক্ষের অভিযোগ
রাষ্ট্রপক্ষের অভিযোগ, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলন দমনে আসামিরা রাষ্ট্রীয় ও রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ, সহিংসতায় উসকানি, অর্থের জোগান ও ষড়যন্ত্রে জড়িত ছিলেন। দলীয় নেতাকর্মীদের রাজপথে নামিয়ে আন্দোলন প্রতিহত করার আহ্বানের পাশাপাশি বিভিন্ন বৈঠকে সহিংসতার পরিকল্পনা ও সশস্ত্র হামলায় তাঁরা ভূমিকা রাখেন বলে অভিযোগ করা হয়।
প্রসিকিউটর গাজী এম এইচ তামিম যুক্তিতর্কের সময় বলেন, ওবায়দুল কাদের বিভিন্ন সমাবেশে দলীয় নেতাকর্মীদের আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার নির্দেশ দিয়েছিলেন।
আদালতে ছাত্রলীগ সভাপতি সাদ্দাম হোসেনের সঙ্গে ওবায়দুল কাদেরের কথোপকথনের অডিও এবং বিভিন্ন সংবাদপত্রের প্রতিবেদনও উপস্থাপন করা হয়। রাষ্ট্রপক্ষের দাবি, এসব তথ্য থেকে আন্দোলন মোকাবিলায় রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের বিষয়টি স্পষ্ট হয়।
গত ১২ আগস্ট রাষ্ট্রপক্ষে যুক্তিতর্ক শেষ করেন চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম। তিনি অভিযোগগুলো প্রমাণিত হয়েছে দাবি করে আসামিদের সর্বোচ্চ ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আবেদন জানান।
আসামিপক্ষের বক্তব্য
অন্যদিকে, রাষ্ট্রীয় খরচে নিয়োগ পাওয়া আসামিপক্ষের আইনজীবীরা তাঁদের খালাসের আবেদন করেন। ওবায়দুল কাদের, বাহাউদ্দিন নাছিম ও মোহাম্মদ আলী আরাফাতের পক্ষে আইনজীবী এম হাসান ইমাম বলেন, জনগণের জানমাল রক্ষায় ‘শুট অ্যাট সাইট’ নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। তাঁর মক্কেলরা কোনো কমান্ডিং পজিশনে ছিলেন না এবং কাউকে হত্যার নির্দেশ দেননি বলেও দাবি করেন তিনি।
ছাত্রলীগ ও যুবলীগের চার নেতার পক্ষে আইনজীবী ইশরাত জাহান অমি দাবি করেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্দোলন দমনের ঘটনায় তাঁর মক্কেলদের নাম আসেনি। তাঁদের বিরুদ্ধে অধীনস্ত নেতাকর্মীদের নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হওয়ার অভিযোগও প্রমাণিত হয়নি বলে দাবি করেন তিনি।
সব পক্ষের বক্তব্য, সাক্ষ্য ও উপস্থাপিত নথি-প্রমাণ পর্যালোচনা শেষে মঙ্গলবার সাত আসামির বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডের রায় ঘোষণা করেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২।