কাল সন্ধ্যা থেকে দেড় মাস আগের অবস্থায় ফিরবে গ্যাস সরবরাহ: প্রধানমন্ত্রী
ডেইলি সান রিপোর্ট, ঢাকা
প্রকাশ: ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৬:১০ পিএম
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের পরিকল্পনা বাস্তবায়নে ব্যবসায়ী ও গণমাধ্যমের সহযোগিতা চেয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি আশা প্রকাশ করেছেন, শিল্পকারখানায় গ্যাস সরবরাহ আগামীকাল সন্ধ্যা থেকে দেড় মাস আগের অবস্থায় ফিরবে।
সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর) বাংলাদেশ সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে ব্যবসায়ী নেতা ও গণমাধ্যমের প্রতিনিধিদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন। প্রায় তিন ঘণ্টার এই আলোচনায় তারা বিভিন্ন বিষয়ে মতামত দেন।
সভায় ‘বাংলাদেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের চ্যালেঞ্জ ও ভবিষ্যৎ পথরেখা’ শীর্ষক একটি উপস্থাপনা দেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত।
প্রধানমন্ত্রী দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের বর্তমান সংকটকে ‘উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া সমস্যা’ হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, এই সংকট ছয় মাস বা এক বছরের মধ্যে পুরোপুরি সমাধান করা সম্ভব নয়। তবে সরকার সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে পরিকল্পনা করেছে। এখন সেগুলো বাস্তবায়নের কাজ চলছে।
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক করতে সরকার নির্দিষ্ট সময়সীমা ধরে কাজ করছে বলে জানান প্রধানমন্ত্রী। পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে ব্যবসা-বাণিজ্যের পাশাপাশি সামগ্রিক অর্থনীতিও উপকৃত হবে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
আগামীকাল থেকে গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিকের আশা
বর্তমান গ্যাস সংকটের কারণ ব্যাখ্যা করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের একটিতে দুর্ঘটনার কারণে সরবরাহ ব্যাহত হয়েছে। এর প্রভাব পড়েছে শিল্পকারখানাসহ বিভিন্ন খাতে। তবে দুর্ঘটনার কারণে তৈরি সমস্যা ইতিমধ্যে সমাধান করা হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা আশা করছি, ইনশাআল্লাহ, আগামীকাল সন্ধ্যা থেকে গ্যাসের সরবরাহ এক-দেড় মাস আগে যে অবস্থায় ছিল, সে রকম একটা অবস্থায় ফিরে আসবে।’
গ্যাসের ঘাটতি মোকাবিলায় তৃতীয় একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের উদ্যোগের কথাও জানান তিনি। জিটুজি ভিত্তিতে গত এক মাসে নতুন টার্মিনাল স্থাপনের প্রস্তুতি মোটামুটি সম্পন্ন হয়েছে। দ্রুত এর কাজ শুরু হবে বলে জানান প্রধানমন্ত্রী।
২০২৭ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে তৃতীয় টার্মিনালকে সরবরাহ ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করা সম্ভব হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
বিদ্যুৎ খাতের সমস্যাও দীর্ঘদিনের বলে মন্তব্য করেন প্রধানমন্ত্রী। সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর বিষয়টি পর্যালোচনা করেছে এবং সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা করেছে। এরপর সমস্যা সমাধানে পরিকল্পনা তৈরি করা হয়েছে। এখন সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের কাজ চলছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘যেকোনো কিছু পরিকল্পনা করা এবং সেটি বাস্তবায়ন করতে সময় লাগে। জ্বালানি ও বিদ্যুতের এই সমস্যা উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া। চাইলেই ছয় মাস বা এক বছরের মধ্যে এর সমাধান করা সম্ভব নয়।’
সভায় সরকার কোন কাজ কখন শেষ করতে চায়, তার একটি সম্ভাব্য সময়সীমাও ব্যবসায়ী নেতাদের সামনে তুলে ধরা হয়। এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাস্তবায়নের সময় কিছুটা এদিক-সেদিক হতে পারে। তবে সরকারের সামনে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা ও সময়সীমা রয়েছে।
‘ব্যবসা ক্ষতিগ্রস্ত হলে প্রভাব পড়ে পুরো দেশের ওপর’
ব্যবসায়ী সম্প্রদায়ের সহযোগিতা চেয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ব্যবসা ও শিল্প খাত ক্ষতিগ্রস্ত হলে এর প্রভাব পুরো দেশের অর্থনীতিতে পড়ে। তাই জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সমস্যার সমাধান শুধু ব্যবসায়ীদের স্বার্থের বিষয় নয়। এটি দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক অগ্রগতির সঙ্গেও যুক্ত।
তিনি বলেন, ২০৩৪ সালের মধ্যে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে পৌঁছানোর লক্ষ্য অর্জন করতে হলে নিরবচ্ছিন্ন ও পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ-জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। এ লক্ষ্য সামনে রেখেই সরকার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়েছে।
‘হতাশ হওয়ার কারণ নেই’
তারেক রহমান বলেন, বর্তমান সমস্যার ব্যাপ্তি ও জটিলতা সম্পর্কে ব্যবসায়ী সম্প্রদায় আগে থেকেই অবগত। সরকার সমস্যাগুলো আড়াল না করে খোলামেলাভাবে তুলে ধরেছে। কীভাবে এসব সমস্যার সমাধান করা হবে, সেটিও জানানো হয়েছে।
তিনি বলেন, ‘এতটুকু আমরা আপনাদের জানাতে চেয়েছি যে আমরা এটা নিয়ে কাজ করছি। সে জন্য হতাশ হওয়ার মতো কারণ নেই।’
সরকারের পরিকল্পনা যৌক্তিক মনে হলে তা বাস্তবায়নে সহযোগিতা করার আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী। পরিকল্পনাগুলো বাস্তবায়িত হলে ব্যবসায়ী সম্প্রদায়ের পাশাপাশি পুরো দেশ উপকৃত হবে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
দেশে অস্থিতিশীলতা তৈরি হলে ব্যবসা-বাণিজ্য ও অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কার কথাও বলেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, জনগণই সময়মতো ঠিক করবে কাকে সরকার পরিচালনার দায়িত্ব দেবে। তবে যে সময় যে সরকার দায়িত্বে থাকে, তাকে তার পরিকল্পিত কাজগুলো শেষ করার সুযোগ দেওয়া উচিত।
গণমাধ্যমের সহযোগিতা চান প্রধানমন্ত্রী
আলোচনায় গণমাধ্যমের প্রতিনিধিদের আমন্ত্রণ জানানোর কারণও ব্যাখ্যা করেন সরকারপ্রধান। তিনি বলেন, সরকারের উদ্দেশ্য ও পরিকল্পনা গণমাধ্যমের কাছে পরিষ্কারভাবে তুলে ধরা প্রয়োজন। তা না হলে বিচ্ছিন্ন তথ্য থেকে নানা ধরনের বিভ্রান্তি তৈরি হতে পারে।
গণমাধ্যম সরকারের পরিকল্পনা সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা পেলে তা দেশবাসীর কাছেও সঠিকভাবে তুলে ধরতে পারবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বড় কোনো কাজ সফলভাবে করতে হলে একটি কার্যকর দল প্রয়োজন। সরকারের সংশ্লিষ্ট সবাই একসঙ্গে কাজ করছেন। পরিকল্পনাগুলো বাস্তবায়নের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের জীবনযাত্রায় ইতিবাচক পরিবর্তন আনার লক্ষ্য রয়েছে।
ব্যবসায়ী ও গণমাধ্যমের প্রতিনিধিদের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমাদের সহযোগিতা করবেন, যাতে আমরা আপনাদের জন্য আরও ভালো কিছু করতে পারি।’
সভায় আরও উপস্থিত ছিলেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির, প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর, প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা, প্রবাসী কল্যাণ এবং শ্রম ও কর্মসংস্থান উপদেষ্টা মাহদী আমিন, ইনভেস্ট বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব এ বি এম আব্দুস সাত্তার, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মোস্তাকুর রহমান, বিদ্যুৎ সচিব মিরানা মাহরুখ ও জ্বালানি সচিব মো. জিয়াউল হক।
ব্যবসায়ী নেতাদের মধ্যে ছিলেন এফবিসিসিআইয়ের প্রশাসক ফজলুল হক, বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খান, ইন্টারন্যাশনাল চেম্বার অব কমার্সের সভাপতি মাহবুবুর রহমান, বিকেএমইএ সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম, বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজের সভাপতি আনোয়ার-উল আলম চৌধুরী পারভেজ, বাংলাদেশ জুট মিলস অ্যাসোসিয়েশনের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি আবুল কামাল, চিটাগাং চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের সভাপতি আমিরুল হক ও বাংলাদেশ এগ্রো প্রসেসরস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মাহবুব আনাম প্রমুখ।
এ ছাড়া দৈনিক মানবজমিনের প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী, বিএনপি মিডিয়া সেলের আহ্বায়ক ড. মওদুদ হোসেন আলমগীর পাভেল, ইংরেজি দৈনিক ওয়াদার সম্পাদক শফিকুল আলম, সাংবাদিক আশরাফ কায়সার, মোস্তাফা ফিরোজ, আব্দুন নূর তুষার, আকবর হোসেন, শাহেদ আলম, রেজাউল করিম রনি, আজিজুর রহমান রিপন, তরিকুল ইসলাম সৌরভ এবং জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. নাহরিন ইসলাম খান উপস্থিত ছিলেন।