ঘুষ চাওয়া হয়েছে ৫৫৭ কোটি টাকা! ২৪ দিনে ‘ঘুষ.সাইটে’ জমা ১৯ হাজার অভিযোগ
ডেইলি সান রিপোর্ট, ঢাকা
প্রকাশ: ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১:১০ এএম
ছবি: সংগৃহীত
সরকারি সেবা নিতে গিয়ে ঘুষ ও অনিয়মের অভিযোগ জানাতে চালু হওয়া অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ‘ঘুষ.সাইটে’ মাত্র ২৪ দিনে প্রায় ১৯ হাজার অভিযোগ জমা পড়েছে। এসব অভিযোগে নাগরিকদের কাছে ঘুষ হিসেবে দাবি করা অর্থের পরিমাণ প্রায় ৫৫৭ কোটি ৩১ লাখ টাকা।
সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর) ‘ঘুষ.সাইট’ তৈরি করে আলোচনায় আসা ১৭ বছর বয়সী শাহেদ শরীফ আহমেদ গণমাধ্যমকে এ তথ্য জানান।
শাহেদ জানান, গত ২১ আগস্ট ওয়েবসাইটটি চালুর পর ১৩ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত মোট ১৮ হাজার ৮৯৯টি অভিযোগ জমা পড়েছে। এসব অভিযোগে ঘুষ হিসেবে দাবি করা অর্থের পরিমাণ ৫৫৭ কোটি ৩১ লাখ টাকা।
এর মধ্যে ময়মনসিংহ জেলার বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের বিরুদ্ধে ঘুষ দাবির অভিযোগ রয়েছে ১ হাজার ১৯৬টি। জেলায় সবচেয়ে বেশি অভিযোগ এসেছে ভূমি অফিসগুলোর বিরুদ্ধে।
‘ঘুষ.সাইট’ তৈরির পেছনে শাহেদের নিজের পরিবারেরও ঘুষের অভিজ্ঞতা রয়েছে। তার মা আমিনা খাতুন ময়মনসিংহ সদর উপজেলার আজমতপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক ছিলেন। ২০২২ সালের ১৬ ডিসেম্বর অসুস্থতাজনিত কারণে তিনি মারা যান। মৃত্যুর সময় তার চাকরির মেয়াদ ছিল আরও ১৩ বছর।
পরিবারের ভাষ্য, আমিনা খাতুনের প্রভিডেন্ট ফান্ডে প্রায় ৭ লাখ টাকা জমা ছিল। সেই টাকা তুলতে ট্রেজারি অফিসে ১০ হাজার, জেলা শিক্ষা অফিসে ২০ হাজার এবং উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসে ৮ হাজার টাকা দিতে হয়েছে। পরিবারের হিসাবে, ৭ লাখ টাকা পেতে তাদের মোট ৩৮ হাজার টাকা ঘুষ দিতে হয়েছে।
পরিবারের দাবি, আমিনা খাতুনের কল্যাণ তহবিলের ২ লাখ টাকা এবং চাকরিরত অবস্থায় মৃত্যুর কারণে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে আরও ৮ লাখ টাকা পাওয়ার কথা ছিল। মোট ১০ লাখ টাকা পেতে সংশ্লিষ্ট শিক্ষা কার্যালয়ের ব্যক্তিরা আবারও ১ লাখ টাকা দাবি করেন। টাকা না দিলে ফাইল এগোবে না বলেও জানানো হয় বলে পরিবারের দাবি।
মায়ের সরকারি পাওনা টাকা তুলতে ঘুষ দেওয়ার অভিজ্ঞতায় ক্ষুব্ধ হন শাহেদ। নিজের পাসপোর্ট তৈরির সময়ও ঘুষ দাবির অভিজ্ঞতা হয় তার। সরকারি সেবা পেতে ঘুষ কেন দিতে হবে—এই প্রশ্ন থেকেই নাগরিকদের অভিযোগ জানানোর জন্য ‘ঘুষ.সাইট’ তৈরি করেন তিনি।
এরপর ময়মনসিংহ সদর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কার্যালয়ে ৮ হাজার টাকা ঘুষ দিতে হয়েছে বলে অভিযোগ করেন শরীফুল ইসলাম শামীম। অভিযোগটি ‘ঘুষ.সাইটে’ প্রকাশের পর বিষয়টি ব্যাপক আলোচনায় আসে।
অভিযোগের পর গত ৩১ আগস্ট ময়মনসিংহ সদর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কার্যালয়ের হিসাব সহকারী এ এইচ এম নাদিরুল হাসান সবুজ এবং অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার অপারেটর মুহাম্মদ মজিবুর রহমানকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেন সদর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মনিকা পারভীন। তিন কার্যদিবসের মধ্যে তাদের জবাব দিতে বলা হয়।
এরপর ৯ সেপ্টেম্বর প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের এক অফিস আদেশে মনিকা পারভীনকে ময়মনসিংহের নান্দাইল উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা হিসেবে বদলি করা হয়। একই আদেশে নান্দাইল উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা ফজিলাতুন নেছাকে ময়মনসিংহ সদর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা হিসেবে বদলি করা হয়।
শাহেদের বাবা শরীফুল ইসলাম শামীম আগে সৌদি আরবের একটি ব্যাংকে চাকরি করতেন। বর্তমানে ময়মনসিংহ ক্যান্টনমেন্ট এলাকার একটি ভাড়া বাসায় বাবার সঙ্গে থাকে শাহেদ। ব্রিটিশ কাউন্সিলের অধীনে ক্যামব্রিজ ইন্টারন্যাশনালের এ-লেভেলে পড়াশোনা করছে সে।
পড়াশোনার পাশাপাশি ওয়েবসাইট তৈরির কাজ শিখেছে শাহেদ। সেই দক্ষতাকে কাজে লাগিয়েই ১৭ বছর বয়সে ‘ঘুষ.সাইট’ তৈরি করেছে সে।