EN ☀️
×

Follow Us

বাংলাদেশ

ইনানীতে বিপন্ন মেঘলা চিতাসহ আরও যেসব প্রাণীর দেখা মিলল

বিবিসি বাংলা

প্রকাশ: ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৪:৪৩ পিএম

ইনানীতে বিপন্ন মেঘলা চিতাসহ আরও যেসব প্রাণীর দেখা মিলল

কক্সবাজারের ইনানী জাতীয় উদ্যানে গবেষণায় প্রথমবার ধরা পড়ল মহাবিপন্ন মেঘলা চিতা।

অ অ

কক্সবাজারের ইনানী জাতীয় উদ্যানে সম্প্রতি এক গবেষণায় ২৩ প্রজাতির স্তন্যপায়ী প্রাণীর সন্ধান পাওয়া গেছে। এর মধ্যে রয়েছে মেঘলা চিতা ও উল্লুকের মতো চরম সংকটাপন্ন প্রাণীও।

বাংলাদেশ বন অধিদপ্তরের ওয়াইল্ডলাইফ সেন্টারের পরিচালক বিপুল কৃষ্ণ দাস এই গবেষণা করেছেন। গবেষণায় ক্যামেরা ট্র্যাপ, লাইন ট্রানসেক্ট এবং পরোক্ষ চিহ্ন শনাক্তের পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়েছে।

কক্সবাজার শহর থেকে একটু দূরে অবস্থিত ইনানী জাতীয় উদ্যান উপকূলীয় ও পাহাড়ি বনাঞ্চলের মিলনে গড়ে ওঠা একটি বন। ২০১৯ সালে সরকার একে আনুষ্ঠানিকভাবে জাতীয় উদ্যান ঘোষণা করে। সাত হাজার ৮৫ হেক্টরের এই উদ্যান দেশের জীববৈচিত্র্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হয়, তবে সংরক্ষিত ঘোষণার পরও এই বনাঞ্চলের জীববৈচিত্র্য নিয়ে বড় কোনো গবেষণা এর আগে হয়নি।

গবেষণায় পুরো উদ্যানকে ১১টি জোনে ভাগ করা হয়। বনের ৩২টি স্থানে ক্যামেরা বসিয়ে এবং সরাসরি দেখা, আওয়াজ, বিষ্ঠা ও পায়ের ছাপ বিশ্লেষণ করে প্রাণী শনাক্ত করা হয়েছে। উদ্যানের বৃক্ষ নিয়ে গবেষণার পাশাপাশি আশপাশে বসবাসরত প্রায় ৩০০ মানুষের সঙ্গে কথা বলে বাস্তুতন্ত্রের অবস্থাও বোঝার চেষ্টা করা হয়। গবেষক বিপুল কৃষ্ণ দাস জানান, গবেষণার একটি অংশ ছিল প্রাণীর বৈচিত্র্য বোঝা, অন্যটি ছিল এলাকার বাসযোগ্যতা যাচাই করা।

গবেষণায় এশিয়ান হাতি, মায়া হরিণ, বনশূকর, পশ্চিমের উল্লুক গিবন, লাল বানর, শহরমুখী বানর, মুখপোড়া হনুমান ও বড় বাঘডাশের মতো প্রাণী পাওয়া গেছে। এ ছাড়া মেছো বিড়াল, লেপার্ড ক্যাট, কাঁকড়াভুক বেজি, গন্ধগোকুল, সোনালি শিয়াল, মালয় শজারু, ইরাবতী কাঠবিড়ালি ও গেছো ছুঁচোসহ আরও কয়েকটি প্রজাতির উপস্থিতিও মিলেছে।

সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য আবিষ্কার মেঘলা চিতা বা ক্লাউডেড লেপার্ড। বিড়াল গোত্রের এই বিরল প্রাণী আগে পার্বত্য অঞ্চলে দেখা গেলেও কোনো গবেষণায় এই প্রথম এর নাম এলো। আইইউসিএনের লাল তালিকা অনুযায়ী প্রাণীটি বিশ্বব্যাপী সংকটাপন্ন এবং বাংলাদেশে মহাবিপন্ন হিসেবে চিহ্নিত। গবেষক বিপুল কৃষ্ণ দাস জানান, ইনানীতে পাঁচটি ক্যামেরা ট্র্যাপিং এবং পায়ের ছাপ ও মলের নমুনা মিলিয়ে মোট ১৩টি ঘটনায় মেঘলা চিতার উপস্থিতি শনাক্ত হয়েছে।

গবেষণায় বৃক্ষ ও বন ব্যবস্থাপনা নিয়েও কাজ হয়েছে। বিপুল কৃষ্ণ দাস জানান, ইনানীতে ৬৬ প্রজাতির গাছ শনাক্ত করা হয়েছে। প্রাকৃতিক বন যেখানে বেশি, সেখানে প্রাণীর বৈচিত্র্যও বেশি, আর বাগান বা ধ্বংস হওয়া এলাকায় প্রাণী কম। তার মতে, কোন প্রাণী কোন ধরনের গাছ পছন্দ করে তা জানলে বন ব্যবস্থাপনায় সেই তথ্য কাজে লাগানো সম্ভব, যা প্রাণীদের বাসস্থান উন্নয়নে সহায়ক হবে।

তিনি জানান, ইনানী থেকে উখিয়ার শিলখালি পর্যন্ত বিস্তৃত এই বনাঞ্চল শুধু কক্সবাজার নয়, দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। এটি ভারত ও মিয়ানমারের বনের সঙ্গে সংযোগকারী একটি করিডোরও। তবে এই অঞ্চলে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর উপস্থিতি ও স্থানীয় জনসংখ্যা বৃদ্ধি জীববৈচিত্র্যের ওপর বড় চাপ তৈরি করছে বলে জানান তিনি। এ ছাড়া বনের ভেতর দিয়ে রাস্তা নির্মাণ, পাহাড় কেটে ঘর তোলা, গাছ কেটে ফসল আবাদ, অবৈধ শিকার-পাচার এবং প্রভাবশালীদের অবৈধ দখলকেও বড় হুমকি হিসেবে চিহ্নিত করেছেন তিনি।

বাংলাদেশে বণ্যপ্রাণীর সুরক্ষা

আইইউসিএন এর তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে ৩৯০টি বন্য প্রাণী বিলুপ্তির হুমকিতে রয়েছে, যার মধ্যে ৫৬টি প্রজাতি মহাবিপন্ন, ১৮১টি বিপন্ন এবং ১৫৩টি প্রজাতি ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ ফিরোজ জামান বলেন, দেশে কোন এলাকায় কোন প্রাণী কী অবস্থায় আছে বা তাদের প্রজাতি টিকিয়ে রাখতে করণীয় কী, এমন নানা বিষয় নিয়ে গবেষণা হয়েছে।

কিন্তু প্রাণী বা বাস্তুতন্ত্র ঠিকভাবে রক্ষণাবেক্ষণ করা হচ্ছে কিনা এই প্রশ্ন এখনও রয়েছে।

মোহাম্মদ ফিরোজ জামান আরও বলেন, ‘আমাদের অনেক জায়গায় সীমাবদ্ধতা রয়েছে। যারা এগুলো নিয়ে কাজ করি তারা যখন বলতে যাচ্ছি তখন এই ধরনের উত্তর আসে যে আমাদের জনবল সংকট, পর্যাপ্ত অর্থসম্পদ নাই। যেভাবে আসলে ব্যবস্থাপনা করা উচিত সেটা অনেক জায়গায়ই হয় না।’

সুন্দরবনের মতো দেশে আরও যে-সব সংরক্ষিত বনাঞ্চল রয়েছে, সেসব জায়গায় গুরুত্বের সঙ্গে নজর দেওয়ার কথা বলছেন এই বিশেষজ্ঞ।

তিনি বলেন, ‘সব সংরক্ষিত এলাকায় সমানভাবে যদি নজর দেওয়া যেত তাহলে ভালো হতো। বিপন্নের হুমকিতে থাকা অনেক প্রাণী কিন্তু ঝুঁকিমুক্ত জায়গায় চলে আসতো।’

বনাঞ্চল দখল হচ্ছে, গাছ ও পাহাড় কেটে ফেলা হচ্ছে, বন্যপ্রাণী পাচারের মতো ঘটনা ঘটছে- বন বিভাগ চেষ্টা করছে বলে দাবি করছে, কিন্তু স্থানীয় পর্যায়ে প্রভাবশালী ব্যক্তি কিংবা দলবদ্ধ ব্যক্তিদের অন্যায় অবস্থান রয়েছে।

বাংলাদেশে যেসব বিপন্নপ্রায় প্রজাতি রয়েছে, সেগুলো সংরক্ষণে আরও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলছেন এই বিশেষজ্ঞ।

তিনি বলেন, প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্যের ভারসাম্য ধরে রাখতে প্রতিটি প্রাণী গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, প্রাকৃতিকভাবে যে খাদ্যচক্র সেখানে সব প্রাণিই অংশ নেয়।

এছাড়া প্রকৃতির ভারসাম্য ধরে রাখতে জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ করার কোনো বিকল্প নেই।

‘প্রতিদিন বিলিয়ন বিলয়ন ইনসেক্ট (পোকা) পাখিরা খাচ্ছে, কিন্তু এই পাখি যদি বিলুপ্ত হয় তাহলে বিলিয়ন বিলিয়ন পোকা আবার তৈরি হতো। অর্থাৎ ইনভাইরনমেন্টাল ব্যালান্স ধরে রাখতে প্রাণীদের সংরক্ষণও জরুরি,’ বলেন তিনি।

৭ হাজার ৮৫ হেক্টরের ইনানি প্রমাণ করেছে, মানুষের চাপের মধ্যেও প্রকৃতি লড়াই করে টিকে থাকতে পারে। এখন প্রশ্ন হলো, আমরা কি সেই লড়াইয়ে প্রকৃতির পাশে দাঁড়াবো?

গবেষক বিপুল কৃষ্ণ দাস বলেন, ‘যে প্রাণীগুলো বিলুপ্ত প্রায় সেগুলো টিকিয়ে রাখতে বা তাদের বংশবৃদ্ধি বাড়াতে, বন টিকিয়ে রাখতে হবে।’

আরও পড়ুন