ভূগর্ভস্থ পানির মজুদ কমছে, ঝুঁকিতে কৃষি ও খাদ্য নিরাপত্তা
ডেইলি সান রিপোর্ট
প্রকাশ: ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১:৩৫ এএম
ছবি: সংগৃহীত
দেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে দ্রুত নিচে নামছে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর, সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে বরেন্দ্র অঞ্চল। অতিরিক্ত পানি উত্তোলন ও প্রাকৃতিকভাবে পানি জমার সুযোগ কমে যাওয়ায় দেখা দিয়েছে সুপেয় পানি ও সেচের সংকট, যা ভবিষ্যতে কৃষি ও খাদ্য নিরাপত্তার ওপরও বড় প্রভাব ফেলতে পারে।
বছরের পর বছর অপরিকল্পিত ও অতিরিক্ত ভূগর্ভস্থ পানি তোলার পাশাপাশি বৃষ্টিপাতের ধরন পরিবর্তন, জলাধার ও খাল-বিল কমে যাওয়া এবং উপরিভাগের পানির ব্যবহার কমে যাওয়ায় ভূগর্ভে স্বাভাবিকভাবে পানি জমার প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। ফলে একদিকে বাড়ছে সুপেয় পানির সংকট, অন্যদিকে সেচনির্ভর কৃষি উৎপাদনও ঝুঁকির মধ্যে পড়ছে।
সাম্প্রতিক এক গবেষণায় উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের সাতটি জেলায় ভূগর্ভস্থ পানির মজুদে পানি জমার হার উদ্বেগজনকভাবে কমে যাওয়ার তথ্য উঠে এসেছে। স্বাভাবিকভাবে বছরে ১০০ থেকে ৫১৫ মিলিমিটার পানি ভূগর্ভে জমা হওয়ার কথা থাকলেও বর্তমানে তা কমে ১০০ থেকে ২১০ মিলিমিটারে নেমে এসেছে।
গবেষণায় ১৯৮৫ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, এ সময়ে ওই অঞ্চলে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর গড়ে ১৬ মিটার থেকে নেমে ৩৬ মিটারে পৌঁছেছে। শুষ্ক মৌসুমে নাচোল, তানোর, নিয়ামতপুর ও পোরশার কিছু এলাকায় পানির স্তর মাটির ৩৩ থেকে ৩৬ মিটার নিচে নেমে যায়।
বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে এখনই কার্যকর ও টেকসই ব্যবস্থা নেওয়া না গেলে ভবিষ্যতে কৃষি উৎপাদন ও খাদ্য নিরাপত্তা বড় ধরনের হুমকির মুখে পড়তে পারে।
পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের পানিসম্পদ পরিকল্পনা সংস্থার (ওয়ারপো) ভূগর্ভস্থ পানি বিভাগের ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মো. আরিফ আবেদীন গণমাধ্যমকে বলেন, রাজশাহীর কোথাও কোথাও ৮০০ ফুট গভীরেও পানির স্তর পাওয়া যাচ্ছে না।
তিনি বলেন, উচ্চ বরেন্দ্র, মধ্য বরেন্দ্র ও নিম্ন বরেন্দ্র—সব এলাকাতেই পানির স্তর নিচে নেমে গেছে। আগে খাওয়ার পানির বিষয়টিকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। এরপর প্রয়োজন সেচের পানি। কিন্তু অপরিকল্পিতভাবে সেচের পানি ব্যবহারের কারণে পানির স্তর নিচে নেমে যাচ্ছে।
বরেন্দ্র অঞ্চলে সংকট বেশি
রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নওগাঁ, নাটোর ও জয়পুরহাট জেলার বিস্তীর্ণ এলাকা দীর্ঘদিন ধরে ভূগর্ভস্থ পানিনির্ভর কৃষির ওপর নির্ভরশীল। গবেষণা অনুযায়ী, ১৯৮৫ থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত এ অঞ্চলে ভূগর্ভস্থ পানির গড় স্তর ছিল মাটির প্রায় ২৬ ফুট নিচে। নিয়মিত পানি তোলার কারণে ২০১০ সালে তা নেমে ৫০ ফুটে দাঁড়ায়। পরে কোথাও কোথাও তা ৬০ ফুটেও পৌঁছায়।
বিভিন্ন গবেষণা অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রতিবছর প্রায় ৩২ ঘনকিলোমিটার ভূগর্ভস্থ পানি তোলা হয়। এর প্রায় ৮০ থেকে ৯০ শতাংশই সেচের কাজে ব্যবহার করা হয়। বাকি প্রায় ১০ শতাংশ ব্যবহার হয় গৃহস্থালি ও শিল্পকারখানায়। ফলে কৃষিতে সেচের জন্য ভূগর্ভস্থ পানির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা পানির মজুদের ওপর বড় চাপ তৈরি করছে।
‘সংকটাপন্ন’ ঘোষণা
ভূগর্ভস্থ পানির সংকট মোকাবিলায় চলতি বছরের মে মাসে রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও নওগাঁ জেলার বিস্তীর্ণ এলাকাকে ‘পানি সংকটাপন্ন এলাকা’ ঘোষণা করেছে সরকার। ভূগর্ভস্থ পানির স্তর আশঙ্কাজনকভাবে নিচে নেমে যাওয়া এবং সেচ ও সুপেয় পানির সংকট তীব্র হওয়ায় এ বিষয়ে সরকারি প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়।
প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, খাওয়ার পানি ছাড়া অন্য কোনো কাজে এসব এলাকায় নতুন করে নলকূপ স্থাপন ও ভূগর্ভস্থ পানি তোলা বন্ধ থাকবে।
কৃষিতে সরাসরি প্রভাব
বাংলাদেশের কৃষি, বিশেষ করে শুষ্ক মৌসুমের বোরো ধান চাষ অনেকাংশেই ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরশীল। কৃষি মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, দেশে সেচ সুবিধাপ্রাপ্ত জমির প্রায় ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরশীল। আবার কোনো কোনো গবেষণায় বলা হচ্ছে, বোরো চাষে ব্যবহৃত সেচের পানির প্রায় ৯১ শতাংশই আসে ভূগর্ভ থেকে।
বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের কর্মকর্তারা বলছেন, বোরো মৌসুমে ধান চাষে কৃষকরা গড়ে প্রয়োজনের তুলনায় প্রায় ৩৪ শতাংশ বেশি পানি ব্যবহার করেন। অতিরিক্ত এই পানি ফসলের উৎপাদন বাড়াতে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখে না। ফলে সেচের পানির ব্যবহার কমানো ও দক্ষতা বাড়ানো এখন কৃষির অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ।
কেন নামছে পানির স্তর
বিশেষজ্ঞদের মতে, কম বৃষ্টিপাত, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব, বোরো চাষে অতিরিক্ত ভূগর্ভস্থ পানি তোলা, শিল্প ও নগরায়ণের কারণে পানির চাহিদা বৃদ্ধি এবং পুকুর-খাল ভরাট—সব মিলিয়েই পরিস্থিতির অবনতি হচ্ছে।
বরেন্দ্র অঞ্চলে দীর্ঘদিন ধরে সেচের জন্য গভীর ও অগভীর নলকূপের ব্যবহার বেড়েছে। একই সময়ে কমেছে প্রাকৃতিক জলাধার। ফলে বর্ষায় যে পরিমাণ পানি ভূগর্ভে জমা হওয়ার কথা, তার তুলনায় শুষ্ক মৌসুমে তোলা হচ্ছে অনেক বেশি পানি। এভাবে ভূগর্ভে পানি জমা হওয়া ও পানি তোলার মধ্যে ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে।
বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএডিসি) প্রধান প্রকৌশলী (ক্ষুদ্র সেচ) ড. ইঞ্জিনিয়ার খান ফয়সল আহমেদ বলেন, দেশের সব এলাকায় ভূগর্ভস্থ পানির স্তর এক রকম নয়।
পানিসাশ্রয়ী কৃষির বিকল্প নেই
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভূগর্ভস্থ পানির সংকট মোকাবিলায় শুধু নলকূপ আরও গভীরে বসালেই হবে না। সেচে পানির অপচয় কমাতে হবে এবং ফসল চাষের ধরনেও পরিবর্তন আনতে হবে।
পানিসাশ্রয়ী সেচ প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ, কৃত্রিমভাবে ভূগর্ভে পানি জমার ব্যবস্থা করা, পুকুর-খাল-বিল পুনরায় খনন এবং উপরিভাগের পানির ব্যবহার বাড়ানোর ওপর জোর দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।
একই সঙ্গে খরা সহ্য করতে পারে এবং কম পানিতে ভালো ফলন দেয়—এমন ফসলের জাতের ব্যবহার বাড়ানো এবং বোরো ধানের বিকল্প হিসেবে কম পানিনির্ভর ফসল চাষ বাড়ানোর পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
বিএডিসির প্রধান প্রকৌশলী (ক্ষুদ্র সেচ) মুহাম্মদ বদিউল আলম সরকার বলেন, উত্তরাঞ্চলের যেসব এলাকায় ভূগর্ভস্থ পানির সংকট রয়েছে, সেখানে সেচের জন্য গভীর নলকূপ বসানো হবে না। যেসব নলকূপ নষ্ট হয়ে যায়, শুধু সেগুলোই মেরামত করা হয়।
তিনি বলেন, সেচের জন্য নতুন প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে, যাতে কম পানি লাগে। আমরা ‘স্মার্ট সেচব্যবস্থার’ দিকে যাচ্ছি।