গ্রিস যাওয়ার পথে আবারও সুনামগঞ্জের আট যুবক নিখোঁজ, পরিবারে আহাজারি
ডেইলি সান রিপোর্ট, সুনামগঞ্জ
প্রকাশ: ১৮ আগস্ট ২০২৬, ১২:২৬ এএম
ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে লিবিয়া থেকে নৌপথে গ্রিস যাওয়ার পথে আবারও বাংলাদেশিদের মৃত্যু ও নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা ঘটেছে। এবার সুনামগঞ্জের শান্তিগঞ্জ উপজেলার সাত যুবক নিখোঁজ রয়েছেন বলে জানা গেছে।
নিখোঁজদের স্বজনদের মধ্যে গভীর উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা বিরাজ করছে। গত ৩ আগস্টের পর থেকে পরিবারের সঙ্গে তাদের কোনো যোগাযোগ নেই বলে জানা গেছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, লিবিয়া থেকে গ্রিস যাওয়ার পথে একটি নৌযানের ইঞ্জিন বিকল হয়ে পড়ায় বিপাকে পড়েন বাংলাদেশি অভিবাসনপ্রত্যাশীরা। নৌযানে থাকা ৪২ জনের মধ্যে ৩৮ জনই ছিলেন বাংলাদেশি। পথে ঝড়ের কবলে পড়ে নৌকার খাবার ও পানির মজুত নষ্ট হয়ে যায়। পরে গ্রিসের কাছাকাছি পৌঁছানোর আগেই নৌকার ইঞ্জিন বিকল হয়ে পড়ে। এরপর প্রায় নয় দিন সাগরে ভেসে থাকার পর নৌকাটি মিশরের মারসা মাতরুহ উপকূলে পৌঁছায়, যেখানে মিশরের নিরাপত্তা বাহিনী তাদের উদ্ধার করে।
রবিবার (১৬ আগস্ট) বিকেলে শান্তিগঞ্জের আট যুবকের নিখোঁজের খবর এলাকায় পৌঁছালে তাদের পরিবারের সদস্যদের মধ্যে নেমে আসে শোকের ছায়া।
মিশরের মাতরুহ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন সুনামগঞ্জের শান্তিগঞ্জ উপজেলার পাথারিয়া গ্রামের আব্দুল হেকিমের ছেলে আব্দুল করিম তার মামা সাংবাদিক মান্না মিয়াকে ঘটনার বিবরণ দিয়ে বলেন, গ্রিসের উদ্দেশে ৪২ জন নৌযানে রওনা হওয়ার পর গ্রিসের কাছাকাছি পৌঁছাতেই নৌযানের ইঞ্জিন নষ্ট হয়ে যায়, ফলে তারা আর সামনে এগোতে পারেননি।
তিনি বলেন, আমাদের খাবার ও পানি ছিল না। খাবার ও পানির সংকটে চোখের সামনেই নয়জন বাংলাদেশি মারা যান। তাদের লাশ পচন ধরায় সাগরে ফেলে দেওয়া হয়। দীর্ঘ সময় লবণাক্ত পানিতে থাকার কারণে আমাদের শরীরেও পচন ধরেছে।
পরে আরও দুজনের মৃত্যু হয়। দীর্ঘ সময় নৌকায় পড়ে থাকায় লাশগুলোতে পচন ধরে দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়লে জীবিতরা বাধ্য হয়ে লাশগুলো সাগরে ফেলে দেন। এভাবে মোট ১১ জনের প্রাণহানি ঘটে বলে জানান তিনি।
আব্দুল করিম আরও জানান, তার সঙ্গে একই নৌযানে শান্তিগঞ্জ উপজেলার আরও তিনজন ছিলেন। তারা হলেন— ডুংরিয়া গ্রামের ইছন আলীর ছেলে সুহেল মিয়া, হরিপুর গ্রামের হোসাইন এবং পাগলা গ্রামের রান্টু চন্দ্র পালের ছেলে হৃদয় পাল।
চিকিৎসাধীন অবস্থায় আব্দুল করিম বলেন, আমি মাতরুহ হাসপাতালে ভর্তি আছি। এখানকার চিকিৎসকরা আমাদের চিকিৎসা দিচ্ছেন। তারা আমাদের ওষুধ ও ভালো খাবারের ব্যবস্থাও করছেন। আমাদের বাঁচান, আমরা দেশে ফিরে যেতে চাই।
এদিকে শান্তিগঞ্জ উপজেলার রনসী গ্রামের বাসিন্দা ও চিকারকান্দি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক মোরশেদ আলম জানান, তার চাচাতো ভাই রনসী গ্রামের একলাছ উদ্দিনের ছেলে মো. তালহা আলম গত ৩ আগস্টের পর থেকে পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগবিচ্ছিন্ন রয়েছেন।
অপরদিকে চিকারকান্দি গ্রামের বাসিন্দা আবুল কাশেম নাঈম জানান, পাগলা শত্রুমর্দন গ্রামের হৃদয় পাল এবং চিকারকান্দি গ্রামের এনামুল খান, মামুন খান ও রিপন মিয়া নামে তিন যুবক লিবিয়া থেকে গ্রিস যাওয়ার পথে গত ৩ আগস্টের পর থেকে নিখোঁজ রয়েছেন বলে তিনি পরিবারের কাছ থেকে জানতে পেরেছেন। এ ছাড়া আরেকজনের নাম-পরিচয় এখনো জানা যায়নি।
হৃদয় পালের চাচা কানন পাল জানান, গত ৩১ জুলাই সর্বশেষ হৃদয়ের সঙ্গে তাদের কথা হয়েছিল, এরপর থেকে তার আর কোনো খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না।
পরিবারের সদস্যদের দাবি, দালালরা তাদের স্বজনেরা জীবিত আছেন বলে আশ্বস্ত করলেও এখন পর্যন্ত তাদের অবস্থান সম্পর্কে নিশ্চিত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
এদিকে বাংলাদেশ দূতাবাস জানিয়েছে, আহত বাংলাদেশিদের চিকিৎসার বিষয়ে মিশরীয় চিকিৎসক ও পুলিশের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখা হচ্ছে। সুস্থ ব্যক্তিদের আইনি প্রক্রিয়া শেষে ট্রাভেল পারমিটের মাধ্যমে দেশে ফেরানোর উদ্যোগ নেওয়া হবে।
শান্তিগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা হিল্লোল চাকমা বলেন, ‘এখনও পর্যন্ত আমরা পাঁচজন নিখোঁজের তথ্য পেয়েছি। গত ৩ আগস্টের পর থেকে পরিবারের সঙ্গে তাদের কোনো যোগাযোগ নেই বলে পরিবারগুলো জানিয়েছে। বিষয়টি আমার ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের জানানো হয়েছে। এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।’