EN ☀️
×

Follow Us

বাংলাদেশ

বিশেষ লেখা

সংকট গভীর, সরকার আন্তরিক

বিশেষ প্রতিনিধি

প্রকাশ: ১৬ আগস্ট ২০২৬, ০৯:২০ এএম

সংকট গভীর, সরকার আন্তরিক
অ অ

বিএনপি যখন দেশ পরিচালনার ছয় মাস পার করছে, তখন গ্যাসসংকটে জনজীবন বিপর্যস্ত। তীব্র লোডশেডিং জনগণকে চরম ভোগান্তিতে ফেলেছে।

অর্থনৈতিক সংকট দগদগে হয়ে উঠছে। চারদিকে হাহাকার। এই পরিস্থিতি বর্তমান সরকারের সৃষ্ট নয়। বিগত ১৭ বছর ঋণনির্ভর উন্নয়ন আর দেড় বছর অন্তর্বর্তী সরকারের ভুল নীতির মাশুল দিচ্ছে বাংলাদেশ।

তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি সরকার দেশ পরিচালনার দায়িত্ব নিয়েছে এক ধ্বংসস্তূপের মধ্যে। এ অবস্থায় যেকোনো নতুন সরকারের দিশাহারা হওয়ার কথা। কিন্তু তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি সরকার দিশাহারা নয়, বরং সংকটের গভীরতা অনুভব করেছে শুরু থেকেই। শান্ত, ধীরস্থিরভাবে পরিস্থিতি মোকাবেলা করার চেষ্টা করছে।

রাষ্ট্র পরিচালনার অন্যতম মূলনীতি হলো, সরকার যদি আন্তরিক হয়, তাহলে জনগণকে সঙ্গে নিয়ে যেকোনো দুর্যোগ মোকাবেলা করা সম্ভব। সরকার সেই পথেই হাঁটছে। গত ছয় মাসে তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি সরকারের সবচেয়ে ইতিবাচক দিক হলো, তারা বাস্তবতাকে অস্বীকার করছে না। জনগণের কাছে লুকোচুরি করছে না। মিথ্যা আশ্বাস  দিচ্ছে না।

প্রকৃত সত্য জনগণের সামনে তুলে ধরছে, তাই প্রচণ্ড কষ্টও মানুষ মেনে নিচ্ছে। জনগণ ধৈর্যধারণ করছে। বর্তমান সরকারের আরেকটি ভালো দিক হলো, সংকট নিরসনে তারা চটজলদি তাড়াহুড়া করে ভুল সিদ্ধান্ত নিচ্ছে না। ধীরেসুস্থে সঠিক সমাধানের পথ খুঁজছে।

একটি দেশের উন্নয়নের জন্য তিনটি ইস্যু গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমত, অর্থনৈতিক উন্নয়ন, দ্বিতীয়ত, আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং তৃতীয়ত, বিশ্বায়নের যুগে বন্ধুত্বপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি। এই তিনটি বিষয় আবার একে অন্যের পরিপূরক। আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি না হলে যেমন অর্থনীতিতে গতি আসে না, তেমনি অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ব্যাহত হলে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটে। বর্তমান বিশ্বে কোনো দেশই একা টিকে থাকতে পারে না। প্রতিবেশীসহ অন্যান্য দেশের সঙ্গে সম্পর্ক ভালো থাকলে জরুরি প্রয়োজনে সহযোগিতা পাওয়া সম্ভব। আবার অর্থনীতি ও আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি খারাপ হলে বন্ধুও কমে যায়। আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি বা পররাষ্ট্রনীতি সঠিক পথে পরিচালিত করতে অর্থনীতির চাকা সচল রাখা জরুরি। তিনটি ক্ষেত্রেই সমান গুরুত্ব দিয়ে সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়ার মাধ্যমেই একটি দেশ এগিয়ে যেতে পারে। দেশের অগ্রগতির এই সূত্রকে অনেকটা জ্যামিতির ত্রিভুজের সঙ্গে তুলনা করা হয়। ত্রিভুজের তিন বাহু সমান না হলে যেমন সমবাহু ত্রিভুজ হয় না, ঠিক তেমনি অর্থনীতি, আইন-শৃঙ্খলা ও পররাষ্ট্রনীতি সমানভাবে কাজ না করলে রাষ্ট্র সঠিকভাবে পরিচালিত হয় না। আর এই ত্রিভুজ সমান্তরাল করার দায়িত্ব হলো রাজনীতির। সুশাসন, জবাবদিহি ও রাজনৈতিক সমঝোতা ছাড়া ত্রিভুজতত্ত্ব অচল। রাজনীতি সঠিক না হলে কিছুই ঠিক হয় না।

বাংলাদেশকে চরম খারাপ অবস্থানে নিয়ে গেছে ইউনূস সরকার। ২০২৪ সালের ৮ আগস্ট ইউনূস সরকার যেখানে বাংলাদেশকে পেয়েছিল, দেড় বছরে তিনি এবং তার সরকার দেশকে আরো অন্তত কুড়ি বছর পেছনে ঠেলে দিয়েছেন। ইউনূস সরকারের দেশ পরিচালনার নীতিই সঠিক ছিল না, আর সে কারণেই অর্থনীতি, আইন-শৃঙ্খলা ও পররাষ্ট্রনীতি ভুল পথে চালিত হয়। ইউনূস সরকারের কোনো রাজনৈতিক দর্শন ছিল না, ছিল না কোনো জবাবদিহি; ছিল শুধু ব্যক্তিবন্দনা।

ড. ইউনূস আন্তর্জাতিক খেলোয়াড়। তিনি যা বলবেন, যা করবেন, সেটাই সঠিক। দেশ পরিচালনায় ড. ইউনূসের কোনো নীতি, কৌশল বা দর্শন ছিল না। তিনি চেয়েছিলেন, রাজনৈতিক বিভাজন সৃষ্টি করে যত দিন পারা যায় তত দিন ক্ষমতায় থাকা। ক্ষমতায় থেকে নিজের স্বার্থ হাসিল করা। বেশির ভাগ উপদেষ্টারও লক্ষ্য ছিল তা-ই। রাজনীতি হলো দেশ পরিচালনার ড্রাইভিং সিট। চালক যদি অদক্ষ হয় এবং ভুল পথে গাড়ি চালায়, তাহলে যেমন দুর্ঘটনা ঘটে, তেমনি সরকারপ্রধান যদি দেশের চেয়ে নিজের স্বার্থ চরিতার্থ করতে চান, তাহলে দেশের সর্বনাশ হয়। ড. ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে দেশে সেটাই হয়েছে। ইউনূস সরকার যেমন বেসরকারি খাতের বিরুদ্ধে নানা রকম প্রতিহিংসার মাধ্যমে অর্থনীতি ধ্বংস করেছে, তেমনি পররাষ্ট্রনীতিতে বাংলাদেশকে করেছে বন্ধুহীন। প্রতিবেশীর সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি ঘটিয়ে অর্থনৈতিক উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত করা হয়েছে। ইউনূস সরকারের আমলে সবচেয়ে খারাপ অবস্থা হয়েছিল আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির। মব সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, লুটপাটের অবাধ চারণভূমি হয়েছিল বাংলাদেশ। কলকারখানায় অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে, মবের শিকার হয়েছে বিভিন্ন বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান। চাঁদাবাজি ছিল নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার। ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা করে তাঁদের হয়রানি করা হয়েছে। ফলে হাজার হাজার কলকারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। কয়েক লাখ শ্রমিক বেকার হয়েছে।

এ রকম একটি পরিস্থিতিতে দেশের দায়িত্ব নিয়ে গত ছয় মাসে বিএনপি বেশ কিছু দৃশ্যমান সাফল্য অর্জন করেছে। যেমন—

আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি: দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই বিএনপি সরকার আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করছে। মব সন্ত্রাস পুরোপুরি বন্ধ না হলেও অনেক কমেছে। এমনকি বিএনপির নেতাকর্মীদের মধ্যে যাঁদের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি এবং মব সন্ত্রাসের অভিযোগ উঠেছে, তাঁদের বিরুদ্ধেও আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। পুলিশ বাহিনীর মনোবল বাড়ানোর চেষ্টা চলছে। সবকিছু মিলিয়ে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির কিছুটা হলেও উন্নতি হয়েছে।

অর্থনৈতিক উন্নয়নে প্রধানমন্ত্রীর উদ্যোগ: দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান অর্থনৈতিক সংকট কাটিয়ে ওঠার লক্ষ্যে কাজ করছেন। তিনি বন্ধ কলকারখানা চালু করার নির্দেশনা দিয়েছেন। ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছেন। বেসরকারি উদ্যোক্তাদের সঙ্গে নিয়মিত বৈঠক করছেন। তাদের সমস্যার কথা শুনছেন। সমাধানের উদ্যোগ নিচ্ছেন।

বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট সমাধানের চেষ্টা: বিএনপি সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই ইরান যুদ্ধ শুরু হলে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি তেলের সরবরাহ কমে যায়। সরকার আন্তরিকভাবে সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করেছে। বিদ্যুৎ উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র চালু করার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। অথচ কোনো কারণ ছাড়াই ইউনূস সরকার এই প্রকল্প বাস্তবায়ন বন্ধ করে রেখেছিল। গ্যাস সরবরাহ বৃদ্ধি করার জন্য সরকার পার্শ্ববর্তী দেশের সহায়তা চেয়েছে। এ ছাড়া সরকার একদিকে যেমন জরুরি ভিত্তিতে এলএনজি আমদানির উদ্যোগ নিচ্ছে, অন্যদিকে দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের জন্য উদ্ভূত পরিস্থিতি বিবেচনায় বিকল্প চিন্তা-ভাবনা শুরু করেছে। এরই ধারাবাহিকতায় সম্প্রতি বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু জানান, জ্বালানি তেল আমদানিতে বেসরকারি খাতকে সুযোগ দেওয়ার পরিকল্পনা করছে সরকার। এর উদ্দেশ্য হিসেবে তিনি জ্বালানি খাতের ভর্তুকির চাপ কমানো এবং বাজারে বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ানোর কথা বলেন। এটা করতে পারলে তা হবে সরকারের একটি যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত।

দরিদ্র মানুষের পাশে সরকার: অর্থনৈতিক সংকট, উচ্চ মুদ্রাস্ফীতির চাপে সবচেয়ে বেশি কষ্টে আছে দরিদ্র জনগোষ্ঠী। আর এ কারণেই সরকার ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ডের মতো সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি হাতে নিয়েছে। এর ফলে অর্থনৈতিক মন্দায় গরিব জনগোষ্ঠী সুরক্ষা পাবে।

বৈদেশিক নীতিতে বাংলাদেশ প্রথম: বিএনপির রাষ্ট্র পরিচালনার প্রধান কৌশল হলো, সবার আগে বাংলাদেশ। আর এই নীতি দেখা যাচ্ছে পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রেও। ইউনূস সরকারের আমলে বাংলাদেশ বিশ্ব থেকে প্রায় বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছিল। সেখান থেকে বাংলাদেশের স্বার্থে সবার সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক স্থাপনের উদ্যোগ গত ছয় মাসে দৃশ্যমান। বিশেষ করে প্রতিবেশীর সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের ক্ষেত্রে বিএনপি সরকার কূটনৈতিক প্রজ্ঞা ও বিচক্ষণতার পরিচয় দিয়েছে। বাংলাদেশের জনগণের ন্যায়সংগত দাবি যেমন প্রতিবেশী দেশগুলোর কাছে তুলে ধরা হচ্ছে, তেমনি প্রতিবেশীর সঙ্গে মর্যাদাপূর্ণ সম্পর্ক স্থাপনের জন্য কাজ করছেন তারেক রহমান। চলতি মাসে প্রধানমন্ত্রী ভারত সফরে যেতে পারেন। এটা দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে ঐতিহাসিক মাইলফলক হতে পারে।

সুশাসন ও জবাবদিহি: একটি রাষ্ট্রকে এগিয়ে নেওয়ার অন্যতম শর্ত হলো সুশাসন ও জবাবদিহি। প্রথম দিন থেকেই বিএনপি সরকার সংসদকে জবাবদিহির কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছে। সব বিষয়ে সংসদে আলোচনা করার সুযোগ ও পরিবেশ সৃষ্টি করা হয়েছে। সংসদীয় গণতন্ত্রে কার্যকর সংসদ মানেই জবাবদিহি।

প্রথম ছয় মাসে জনগণের কল্যাণে কাজ করার জন্য সরকারের আন্তরিকতা ও আগ্রহ প্রশ্নাতীত। প্রধানমন্ত্রী একটি জনবান্ধব সরকার হিসেবে কাজ করছেন। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী যেভাবে দেশের মানুষের জন্য কাজ করছেন, সেভাবে এখনো সাফল্য আসেনি। এর প্রধান কারণ দুটি।

প্রথমত, প্রধানমন্ত্রী যে অবস্থায় দেশ পেয়েছেন, সেখান থেকে রাতারাতি দেশের সব সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। এ জন্য সময় দরকার। প্রধানমন্ত্রী ও সরকার আন্তরিক। এ জন্য দেশ পুনর্গঠনে দরকার জাতীয় ঐক্য। রাজনৈতিক বিভাজন ভুলে দেশ বাঁচাতে সবাইকে একযোগে কাজ করতে হবে। রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকবে, কিন্তু দেশের প্রশ্নে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে।

দ্বিতীয়ত, প্রধানমন্ত্রী ও সরকারের কাজে বাধা সৃষ্টি করছে আমলাতন্ত্র এবং সরকারের বিভিন্ন স্তরে লুকিয়ে থাকা গুপ্তরা। যারা বিএনপিকে সফল হতে দিতে চায় না, যারা বাংলাদেশের অস্তিত্ব অস্বীকার করেছিল, তারা সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ে লুকিয়ে আছে। তারা এরই মধ্যে সরকারকে অসহযোগিতা করছে। সরকারের অভিপ্রায় মাঠে অনেক ক্ষেত্রেই কার্যকর হচ্ছে না। এ জন্য প্রশাসনের সকল স্তরে শুদ্ধি অভিযান জরুরি।

বাংলাদেশ এখন এক ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে। এই সময়ে সরকারের সকল পর্যায়ে অর্কেস্ট্রার মতো একই সুর তুলতে হবে। তাহলেই বাংলাদেশ ঘুরে দাঁড়াবে।

আরও পড়ুন