সৌরবিদ্যুতে চলছে কারখানা, উদ্বৃত্ত বিদ্যুৎ যাচ্ছে জাতীয় গ্রিডে
পরিবেশবান্ধব উদ্যোগের স্বীকৃতিতে পেয়েছে জাতীয় পরিবেশ পদক-২০২৬
ডেইলি সান রিপোর্ট, নীলফামারী
প্রকাশ: ১২ আগস্ট ২০২৬, ০৬:০৬ পিএম
নীলফামারীর হাজীগঞ্জে ‘ক্লাসিক্যাল হ্যান্ডমেইড প্রোডাক্টস বিডি লিমিটেড’ কারখানার ছাদজুড়ে বসানো সৌর প্যানেল, যা দিয়ে চলছে কারখানার পুরো উৎপাদন কার্যক্রম।
সম্পূর্ণ সৌরবিদ্যুতে চলছে কারখানার চাকা, নিজেদের চাহিদা মিটিয়ে অতিরিক্ত বিদ্যুৎ যুক্ত হচ্ছে জাতীয় গ্রিডে। ঐতিহ্যবাহী হস্তশিল্পের সঙ্গে নবায়নযোগ্য প্রযুক্তির এমন পরিবেশবান্ধব মেলবন্ধন ঘটিয়েছে নীলফামারীর ‘ক্লাসিক্যাল হ্যান্ডমেইড প্রোডাক্টস বিডি লিমিটেড’। নিজস্ব বিদ্যুৎ খরচ কমানোর পাশাপাশি জাতীয় পর্যায়ে বিদ্যুৎ সাশ্রয়ে ভূমিকা রেখে সম্প্রতি প্রতিষ্ঠানটি অর্জন করেছে ‘জাতীয় পরিবেশ পদক-২০২৬’।
নীলফামারী সদর উপজেলার হাজীগঞ্জ এলাকায় অবস্থিত কারখানাটি সরেজমিনে ঘুরে দেখা যায়, সারিবদ্ধভাবে নারী শ্রমিকেরা দক্ষ হাতে তৈরি করছেন নানা ধরনের হস্তশিল্পপণ্য। অন্যদিকে উৎপাদিত পণ্য রপ্তানির জন্য কনটেইনারে তোলা হচ্ছে।
কারখানায় কর্মরত নারী কর্মী শেফালী রানী বলেন, ‘এই কারখানায় ভারী কোনো কাজ নেই। নারীদের মাথার চুলের বেণি গাঁথতে যেমন কয়েকটি আঙুলের প্রয়োজন হয়, এ কাজেও তেমনি দুই হাতের সহযোগিতাই যথেষ্ট। গৃহস্থালির কাজ শেষে অবসর সময় কাজে লাগিয়ে এ এলাকার অনেক গ্রামীণ নারী আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী হচ্ছেন।’
প্রতিষ্ঠানটির দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, নীলফামারী সদর উপজেলার কারখানাসহ তিনটি ইউনিটে প্রায় আড়াই হাজার নারী ও পুরুষ শ্রমিক সরাসরি হস্তশিল্পপণ্য উৎপাদনে কাজ করছেন। কারখানায় তৈরি হচ্ছে টেবিল ম্যাট, হোম ডেকোরেশন সামগ্রী, বাস্কেট, ম্যাটসহ বিভিন্ন ধরনের নান্দনিক ও ব্যবহারিক হস্তশিল্পপণ্য।
এসব পণ্য তৈরিতে কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে পাট, হোগলাপাতা, কাশিয়া, কচুরিপানা, গার্মেন্টস বর্জ্য (ঝুট), বেতসহ বিভিন্ন পরিবেশবান্ধব উপকরণ। উৎপাদিত পণ্য সরবরাহকারীদের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা, চীন, জাপান, জার্মানি ও অস্ট্রেলিয়াসহ বিশ্বের প্রায় ৫০টি দেশে রপ্তানি করা হচ্ছে।
কারখানার আলো, ফ্যান ও মেশিনারিসহ উৎপাদন কার্যক্রমের জন্য প্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ সৌরবিদ্যুৎ থেকেই সরবরাহ করা হচ্ছে। পরিবেশবান্ধব এই উদ্যোগের ফলে প্রতিষ্ঠানটির নিজস্ব বিদ্যুৎ ব্যয় কমার পাশাপাশি জাতীয় পর্যায়েও বিদ্যুৎ সাশ্রয়ে অবদান রাখছে।
নীলফামারী ইউনিটের সহকারী মহাব্যবস্থাপক (এজিএম) আসাদুজ জামান ডেইলি সানকে জানান, ‘২০১৩ সালে মাত্র ২০০ জন শ্রমিক নিয়ে এ কারখানার যাত্রা শুরু হয়। বর্তমানে এটি নীলফামারী সদর উপজেলার আরও তিনটি ইউনিটে সম্প্রসারিত হয়েছে। সরবরাহ শৃঙ্খল ও হোমভিত্তিক কর্মীসহ উপকরণ ও পণ্য উৎপাদনের সঙ্গে প্রায় ১০ হাজার নারী শ্রমিক যুক্ত রয়েছেন। শুধু হাজীগঞ্জ কারখানাতেই প্রায় ২ হাজার শ্রমিক একসঙ্গে কাজ করছেন।’
তিনি বলেন, ‘পুরো কারখানাটি পরিবেশবান্ধব সৌরবিদ্যুতের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে। এতে একদিকে আমাদের বিদ্যুৎ ব্যয় কমছে, অন্যদিকে জাতীয় গ্রিডের বিদ্যুৎ ব্যবহারের ওপর চাপ কমছে। ফলে দেশের বিদ্যুৎ সাশ্রয়েও আমরা ভূমিকা রাখতে পারছি।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের উৎপাদিত পণ্য এবং পণ্য তৈরির সরঞ্জাম পরিবেশবান্ধব। পরিবেশদূষণ নিয়ন্ত্রণ ও পরিবেশ সংরক্ষণে বিশেষ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ সম্প্রতি বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে আমাদের প্রতিষ্ঠান জাতীয় পরিবেশ পদক ছাড়াও এসডিজি ও গ্রিন ফেমিনিস্ট পদক অর্জন করেছে। এ ছাড়া প্রতিষ্ঠানের ঝুড়িতে রয়েছে আরও অনেক জাতীয় পদক। পাশাপাশি স্থানীয় জনপদের কর্মসংস্থানের মাধ্যমে গ্রামীণ অর্থনীতিতেও প্রতিষ্ঠানটির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।’
স্থানীয়দের মতে, রংপুর বিভাগের নীলফামারীর গ্রামীণ এলাকায় এ ধরনের পরিবেশবান্ধব কারখানার কার্যক্রম স্থানীয় অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করছে। ঐতিহ্যবাহী কারুশিল্পের সঙ্গে নবায়নযোগ্য প্রযুক্তির সমন্বয়ে সৃষ্টি হচ্ছে কর্মসংস্থান ও আয়ের সুযোগ। বিশেষ করে নারীদের ঘরে বসে কিংবা নিকটবর্তী উৎপাদন ইউনিটে কাজের সুযোগ তৈরি হওয়ায় গ্রামীণ অর্থনীতিতে এর ইতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
প্রাকৃতিক ও পুনর্ব্যবহারযোগ্য কাঁচামাল ব্যবহার, নবায়নযোগ্য জ্বালানির ওপর নির্ভরতা এবং গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থান—এই তিন উদ্যোগকে কেন্দ্র করে নীলফামারীতে পরিবেশবান্ধব উৎপাদনের যে ধারা তৈরি হয়েছে, তা ভবিষ্যতে দেশের টেকসই শিল্পায়নের একটি কার্যকর উদাহরণ হতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।