মোড়কজাত খাদ্যপণ্যের সতর্কবার্তা নীতি দুর্বল করতে লবিংয়ের অভিযোগ
এহসানুল হক জসীম
প্রকাশ: ০৯ আগস্ট ২০২৬, ০৪:৩৩ পিএম
ছবি সংগৃহীত
অতিরিক্ত চিনি, লবণ ও স্যাচুরেটেড ফ্যাটযুক্ত মোড়কজাত খাবারে বাধ্যতামূলক সতর্কতামূলক লেবেল যুক্ত করার উদ্যোগ চলছে। তবে এই উদ্যোগ দুর্বল করতে সংশ্লিষ্ট কিছু কোম্পানি ও বাণিজ্যিক সংগঠন পাঁচ বছরের জন্য লেবেলিং ব্যবস্থা ‘ঐচ্ছিক’ রাখার দাবি তুলেছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও অধিকারকর্মীরা বলছেন, অসংক্রামক রোগ যখন দেশের মোট মৃত্যুর প্রায় ৭০ শতাংশের জন্য দায়ী, তখন এমন দাবি মেনে নেওয়া জনস্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। তাঁদের মতে, এতে ‘নিরাপদ খাদ্য (মোড়কজাত খাদ্য লেবেলিং) প্রবিধানমালা, ২০২৬’-এর খসড়া দুর্বল হয়ে পড়বে।
তাঁরা করপোরেট চাপ উপেক্ষা করে বিজ্ঞানভিত্তিক ও বাধ্যতামূলক সামনের দিকের লেবেলিং বা ফ্রন্ট-অফ-প্যাক লেবেলিং (এফওপিএল) নীতি দ্রুত চূড়ান্ত করার আহ্বান জানিয়েছেন।
ইন্টারন্যাশনাল কাউন্সিল অব বেভারেজ অ্যাসোসিয়েশনস (আইসিবিএ)-সহ দেশি-বিদেশি কয়েকটি বাণিজ্যিক সংগঠন প্রস্তাবিত বিধিমালা শিথিল করার চেষ্টা করছে বলে দাবি সংশ্লিষ্টদের। শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রস্তুতির সুযোগ দিতে সতর্কতামূলক লেবেল অন্তত পাঁচ বছর ঐচ্ছিক রাখার দাবি জানানো হচ্ছে। এ নিয়ে লবিং ও তদবিরও চলছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও অধিকারকর্মীরা এই দাবিকে অযৌক্তিক বলে মনে করছেন।
সেন্টার ফর ল অ্যান্ড পলিসি অ্যাফেয়ার্সের (সিএলপিএ) সিনিয়র পলিসি অ্যানালিস্ট কামরুননিসা মুন্না বলেন, খাদ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান ও সংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলোর এই দাবি প্রস্তাবিত বিধিমালা দুর্বল করার চেষ্টা। এটি অসংগত এবং কৌশলগতভাবে বিলম্বের উদ্যোগ। একই সঙ্গে এটি জনস্বার্থবিরোধী।
লবিং ও তদবিরের বিষয়টি অস্বীকার করেননি বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের সদস্য (খাদ্য শিল্প ও উৎপাদন) অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ শোয়েব। ডেইলি সানকে তিনি বলেন, বিধিমালার খসড়া ইতিমধ্যে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। উৎপাদকদের কিছু তৎপরতা রয়েছে।
তিনি বলেন, গত ৩০ জুন খাদ্য মন্ত্রণালয়ে খসড়াটি পাঠানো হয়েছে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে আরেকটি বৈঠক করতে পারে। এরপর এটি চূড়ান্ত হবে।
২০১৭ সালের প্রবিধানমালা সংশোধনের মাধ্যমে এফওপিএল চালুর প্রক্রিয়া শুরু হয়। তবে এর অগ্রগতি বারবার থেমে গেছে। ২০২৩ সালে একটি খসড়া তৈরি হলেও তা বাস্তবায়িত হয়নি।
২০২৫ সালের শুরুতে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি পুনরায় পর্যালোচনার দায়িত্ব দেওয়া হয়। এরপরও দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়নি। ২০২৬ সালের শুরুতে কর্তৃপক্ষ সর্বশেষ খসড়া তৈরি করে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় প্রস্তাবিত লেবেলের নকশার অনুমোদনও দেয়। তবে অনুমোদন ও চূড়ান্ত করার প্রক্রিয়া এখনো ঝুলে আছে।
ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশনের অ্যাসিস্ট্যান্ট সায়েন্টিস্ট ড. আহমাদ খায়রুল আবরার বলেন, প্রস্তাবিত বিধিমালা দুর্বল করতে যে চাপ ও লবিং চলছে, তার কাছে সরকারি কর্তৃপক্ষের নতি স্বীকার করা উচিত নয়। অযৌক্তিক দাবি উপেক্ষা করে দ্রুত এফওপিএল নীতি চূড়ান্ত করা দরকার।
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার নিশাত মাহমুদও কোনো ছাড় দেওয়ার বিরোধিতা করেছেন। তাঁর ভাষ্য, জনগণের পুষ্টির মান ও জনস্বাস্থ্য উন্নয়নে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া সরকারের অন্যতম সাংবিধানিক দায়িত্ব।
তিনি আরও বলেন, মোড়কজাত খাদ্যপণ্যের লেবেলিং নিয়ে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ যে বিধিমালা করছে, তা দ্রুত এবং কালক্ষেপণ ছাড়াই প্রণয়ন করা উচিত।
নিশাত মাহমুদ আরও বলেন, নীতিনির্ধারকদের পাঁচ বছরের ঐচ্ছিক সময়সীমার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করতে হবে। জনস্বাস্থ্য রক্ষায় বাধ্যতামূলক সতর্কতামূলক লেবেল অপরিহার্য। এতে ভোক্তারা সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন এবং তথ্য জানার মৌলিক অধিকার নিশ্চিত হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, খাদ্যের উপাদান ও স্বাস্থ্যঝুঁকি সম্পর্কে যথেষ্ট ধারণা না থাকায় অনেক মানুষ নিয়মিত প্রক্রিয়াজাত খাবার কিনছেন। অতিরিক্ত চিনি, লবণ ও চর্বিযুক্ত খাবার স্থূলতা, উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস ও হৃদ্রোগের ঝুঁকি বাড়ায়। এসব খাবারের বড় ভোক্তা শিশু হওয়ায় তারাই সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে।
জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশ নীতি বিশেষজ্ঞ অ্যাডভোকেট সৈয়দ মাহবুবুল আলম বলেন, স্পষ্ট সতর্কতামূলক লেবেল তরুণদের স্বাস্থ্যকর খাবার বেছে নিতে সহায়তা করবে। বৈশ্বিক মানদণ্ড অনুসরণ করে বাংলাদেশেরও দ্রুত এটি বাধ্যতামূলক করা উচিত।
খসড়ায় যা আছে
প্রস্তাবিত বিধিমালায় খাদ্যের তথ্য স্পষ্টভাবে উপস্থাপনের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। লেবেল স্পষ্ট, দৃশ্যমান, স্থায়ী এবং বাংলায় হওয়ার কথা বলা হয়েছে।
খাদ্যের উপাদান ঘোষণার ক্ষেত্রেও বিস্তারিত তথ্য দেওয়ার কথা রয়েছে। কৃত্রিম সুবাস, রং, প্রাণিজ উৎস ও অ্যালার্জেন স্পষ্টভাবে উল্লেখ করতে হবে। ‘বিশুদ্ধ’ বা ‘পবিত্র’-এর মতো বিভ্রান্তিকর দাবিও নিষিদ্ধ করার প্রস্তাব রয়েছে।
পুষ্টিমান প্রদর্শনের ক্ষেত্রেও নির্দিষ্ট তথ্য বাধ্যতামূলক করার কথা বলা হয়েছে। এতে শক্তি বা ক্যালোরি, প্রোটিন, ফ্যাট, কার্বোহাইড্রেট, চিনি এবং সোডিয়াম বা লবণের পরিমাণ উল্লেখ করতে হবে।
তবে এসব প্রস্তাবের বিরোধিতা করে শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর পক্ষ থেকে বিভিন্ন যুক্তি দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে প্যাকেজিং নতুন করে তৈরি করা এবং সরবরাহব্যবস্থায় সমন্বয়ের জন্য পাঁচ বছর সময় চাওয়ার বিষয়টি রয়েছে।
পুষ্টিবিদ ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাণিজ্যিক প্রচারণার প্রয়োজনে প্রতিষ্ঠানগুলো কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই নতুন প্যাকেজিং বাজারে আনতে পারে। বৈশাখ, ঈদ, পূজা বা খেলাধুলার মতো বিভিন্ন উপলক্ষে এর উদাহরণও রয়েছে।
কামরুননিসা মুন্না বলেন, বাণিজ্যিক লাভের জন্য যেখানে দ্রুত পরিবর্তন করা সম্ভব, সেখানে একটি স্বাস্থ্য সতর্কবার্তা ছাপাতে পাঁচ বছর সময় চাওয়া মূলত বিলম্বের কৌশল।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন, সতর্কবার্তা পাঁচ বছর ঐচ্ছিক রাখা হলে অনেক ক্ষতিকর খাবার লেবেল ছাড়াই বাজারে বিক্রি হতে থাকবে। এতে প্রস্তাবিত বিধিমালার মূল উদ্দেশ্যই ব্যাহত হবে।