EN ☀️
×

Follow Us

বাংলাদেশ

ফিরে দেখা জুলাই বিপ্লব

৫ আগস্ট স্বৈরাচার হাসিনা থেকে যেভাবে মুক্তি পেল জাতি

রক্ত দিয়ে কেনা এই স্বাধীনতা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, বুলেট দিয়ে কোনোদিন কোনো বীর জাতিকে চিরতরে চেপে রাখা যায় না

আল-আমিন বিন আলী

আল-আমিন বিন আলী

প্রকাশ: ০৫ আগস্ট ২০২৬, ১১:১৩ এএম

৫ আগস্ট স্বৈরাচার হাসিনা থেকে যেভাবে মুক্তি পেল জাতি

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণভবনে ছাত্র-জনতার প্রবেশ ও উল্লাস। আজ সেই ঐতিহাসিক অভ্যুত্থানের দুই বছর পূর্তি। ছবি: সংগৃহীত

অ অ

অগ্নিগর্ভ জুলাই। বাংলার আকাশজুড়ে তখন এক দমবন্ধ করা নীরবতা। শুরুটা কিন্তু বিপ্লব ছিল না। ছিল কেবল একটি ন্যায্য অধিকারের দাবি। আমাদের ছাত্রসমাজ রাজপথে নেমেছিল বৈষম্যমুক্ত এক বাংলাদেশের আশায়। সাধারণ একটি দাবি—চাকরিতে কোটা পদ্ধতির যুক্তিসঙ্গত সংস্কার। কিন্তু তারা কী জানত? এই সরল দাবির পেছনে লুকিয়ে থাকা আগুন পুরো দেশের তক্ত-তাউস নাড়িয়ে দেবে?

শান্তিপূর্ণ মিছিলে নামল আঘাত। রাজপথ রঞ্জিত হলো তরুণ তাজা রক্তে। আবু সাঈদ নিজের বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়েছিল অন্যায়ের সামনে। বুলেটের সামনে সে হাত দুটো ছড়িয়ে দিয়েছিল অবলীলায়। আর সেই বিদ্ধ বুক থেকে গড়িয়ে পড়া প্রতিটি ফোঁটা রক্ত জ্বালিয়ে দিল কোটি মানুষের বুকের ক্ষোভের দাবানল।

শহরের রাজপথ থেকে গ্রামের অলিগলি—প্রতিটি কোণ এক মুহূর্তে জ্বলে উঠল। সাউন্ড গ্রেনেডের বিকট শব্দ, কাঁদানে গ্যাসের ধোঁয়া, আর স্বজনহারার করুণ কান্নায় ভারী হয়ে উঠল বাতাস। প্রতিদিন একটার পর একটা তাজা প্রাণ ঝরে পড়ছিল। কিন্তু তারা বুঝতে ভুল করেছিল। রাজপথে রক্ত ঝরিয়ে কোনদিন আন্দোলন দাবিয়ে রাখা যায় না। রক্ত দিলে আন্দোলন মরে না, রক্ত দিলে বিপ্লব জন্ম নেয়।

স্মৃতির পাতায় জুলাই: গণমনস্তত্ত্বের পরিবর্তনের সেই সূচনা লগ্ন, যা পরবর্তীতে ইতিহাস বদলে দিয়েছিল। ছবি: রয়টার্স

ধীরে ধীরে বদলাতে লাগল হাওয়ার গতি। সাধারণ মানুষের চোখ থেকে ভয়ের পর্দাটা ছিঁড়ে পড়ে গেল। ঘরে বসে থাকা মায়েরা আর স্থির থাকতে পারলেন না। রিকশাচালক, শ্রমিক, শিক্ষক, ডাক্তার, রিকশার প্যাডেল ছেড়ে দেওয়া খেটে খাওয়া মানুষ—সবাই নেমে এলেন পথে। বৈষম্যের আন্দোলন আর শুধু কোটার মধ্যে আটকে রইল না। সেটি রূপ নিল দাবির আগুনে—একদফা! হ্যাঁ, একদফা দাবি! আর কোনো সমঝোতা নয়, আর কোনো অজুহাত নয়। এবার একটাই দাবি—স্বৈরাচারের পতন! ‘দাবি এক, দফা এক! স্বৈরাচারের পদত্যাগ!’ এই একটিমাত্র শ্লোগানে কেঁপে উঠল সারাদেশ। 

জুলাইয়ের উত্তাল দিনগুলো পার হয়ে রক্তঝরা আগস্টের সূচনা হলো। ৪ আগস্ট সারাদেশ পরিণত হলো এক রণক্ষেত্রে। কিন্তু ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে। শাসকের বন্দুকের নল আর জনগণকে ভয় দেখাতে পারছিল না। বুলেটকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে কোটি মানুষ তখন মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়াতে প্রস্তুত। আর তারপর এলো সেই ঐতিহাসিক দিন। পাঁচই আগস্ট।

সকাল থেকেই ঢাকার বাতাস ছিল অন্যরকম। চারিদিকে গুঞ্জন, চারিদিকে অনিশ্চয়তা। কিন্তু সাধারণ মানুষের মনে ছিল না কোনো সংশয়। লাখ লাখ মানুষ, দিকবিদিক থেকে ছুটে আসছে ঢাকার দিকে। তারা বাঁশের লাঠি হাতে, বুকের ভেতর ক্ষোভের আগুন নিয়ে পায়ে হেঁটে পার হয়ে যাচ্ছে সব বাধা।

সব ব্যারিকেড ভেঙে গুঁড়িয়ে গেল। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সাঁজোয়া যান, কাঁটাতারের বেড়া—কোনো কিছুই ধরে রাখতে পারল না জনতার এই জোয়ার। গাজিপুর থেকে, যাত্রাবাড়ী থেকে, উত্তরা থেকে, ধানমন্ডি থেকে— চারিদিক থেকে ঢাকার প্রাণকেন্দ্রে আছড়ে পড়ল এক বিশাল মানব-সমুদ্র। পতনের ঘণ্টা বেজে উঠল। ক্ষমতার দীর্ঘ ষোলো বছরের অহংকার মুহূর্তের মধ্যে বালির প্রাসাদের মতো ভেঙে পড়তে শুরু করল।

প্ল্যাকার্ড ও স্লোগানে মুখর ২০২৪-এর ছাত্র-জনতার আন্দোলন, যা পরবর্তীতে রূপ নেয় গণ-অভ্যুত্থানে। ছবি: রয়টার্স

গণভবনের সেই সুউচ্চ প্রাচীর, যা এতদিন সাধারণ মানুষের জন্য ছিল এক ধরাছোঁয়ার বাইরের দুর্গ— সেটি তখন অবরুদ্ধ। শাসনদল বুঝতে পারল, সময় শেষ। সময় আর এক মুহূর্তও বাড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই।

ইতিহাসের সবচেয়ে নাটকীয় মুহূর্তটি ঘটল ঠিক তখনই। যিনি নিজেকে অপরিবর্তনীয় ভেবেছিলেন, যিনি বলতেন তিনি কখনো পালাবেন না— জনতার এই বাঁধভাঙ্গা প্লাবনের মুখে তাকে সিদ্ধান্ত নিতে হলো কয়েক মিনিটের মধ্যে। কোনো মহোৎসব নয়, কোনো বিদায় সংবর্ধনা নয়— সামরিক হেলিকপ্টারে চড়ে, একপ্রকার নিঃশব্দে, পেছনের দরজা দিয়ে তাকে ছেড়ে যেতে হলো নিজ দেশ। তিনি পালিয়ে গেলেন। স্বৈরাচারী ক্ষমতার তাসের ঘর হুড়মুড় করে ভেঙে পড়ল। হেলিকপ্টারের পাখার শব্দে মিলিয়ে গেল ষোলো বছরের একচ্ছত্র শাসনের দাম্ভিকতা। খবরটা ছড়িয়ে পড়ল দাবানলের মতো।

‘পালিয়েছে! স্বৈরাচার পালিয়েছে!’ মুহূর্তের মধ্যে ঢাকার রাজপথ পরিণত হলো এক মহা-উৎসবের ময়দানে।

যে গণভবন ছিল ক্ষমতার হিংস্র প্রতীক, সেখানে ঢুকে পড়ল কোটি সাধারণ মানুষ। কেউ বিজয়ের পতাকা ওড়াচ্ছে, কেউ কান্নায় ভেঙে পড়ছে, কেউ আবার একে অপরকে জড়িয়ে ধরছে পরম মমতায়। এ কান্না পরাজয়ের নয়, এ কান্না দীর্ঘদিনের শৃঙ্খলমুক্তির।

শিশুরা রাজপথে দৌড়াচ্ছে, বৃদ্ধরা আকাশে হাত তুলে দোয়া করছেন, আর আমাদের সেই তরুণ সমাজ— যাদের বীরত্বে এই নতুন ভোর এলো— তারা একে অপরের গায়ে বিজয়ের আবীর মাখিয়ে দিচ্ছে। এটি শুধু একটি সরকারের পতন ছিল না, এটি ছিল গণ-অভ্যুত্থানের এক মহাকাব্যিক জয়।

৫ আগস্টের এই রক্তাক্ত সূর্যোদয় প্রমাণ করে দিল— জনতাই সব ক্ষমতার উৎস। রক্ত দিয়ে কেনা এই স্বাধীনতা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, বুলেট দিয়ে কোনোদিন কোনো বীর জাতিকে চিরতরে চেপে রাখা যায় না।

আরও পড়ুন