EN ☀️
×

Follow Us

বাংলাদেশ

আঁকাবাঁকা নকশায় বাড়তি ১১০ কিলোমিটার রেলপথ, মূল্য দিচ্ছেন যাত্রীরা

এহসানুল হক জসীম

প্রকাশ: ০২ আগস্ট ২০২৬, ০৫:২১ পিএম

আঁকাবাঁকা নকশায় বাড়তি ১১০ কিলোমিটার রেলপথ, মূল্য দিচ্ছেন যাত্রীরা

ছবি: সংগৃহীত

অ অ

দেশভাগের প্রায় আট দশক পরও ঢাকা-সিলেট রেলপথ এখনো ব্রিটিশ আমলে নির্মিত আঁকাবাঁকা নকশার ওপর নির্ভরশীল। ফলে রাজধানী থেকে সিলেটে ট্রেনে যাতায়াতে যাত্রীদের প্রতিবারই অতিরিক্ত প্রায় ১১০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে হচ্ছে। এতে সময়ও বাড়ছে প্রায় চার ঘণ্টা। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভৈরব-সিলেট অংশটি আধুনিকায়ন ও সোজা করা গেলে যাত্রীসেবা, পণ্য পরিবহন এবং পরিবেশ—সব ক্ষেত্রেই উল্লেখযোগ্য সুফল মিলবে।

বর্তমানে ঢাকা ও সিলেটের মধ্যে সড়কপথের দূরত্ব প্রায় ২০৯ কিলোমিটার হলেও রেলপথে তা ৩১৯ কিলোমিটার। উনিশ শতকের শেষ দিকে নির্মিত এই রেললাইন মূলত তৎকালীন ব্রিটিশ শাসকদের চা-বাগান, নদীবন্দর এবং বর্তমান ভারতের আসাম ও ত্রিপুরার সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষার জন্য তৈরি হয়েছিল। ফলে ঢাকা ও সিলেটের মধ্যে সরাসরি যোগাযোগের পরিবর্তে রুটটি বিভিন্ন জেলা ঘুরে দীর্ঘ পথ অতিক্রম করে।

বাংলাদেশ রেলওয়ের সাবেক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা ও সরকারের অবসরপ্রাপ্ত সচিব মো. এহছানে এলাহী বলেন, ব্রিটিশ আমলে ঢাকা-সিলেটের মধ্যে সরাসরি যোগাযোগের কথা বিবেচনায় রেখে রেলপথ নির্মাণ করা হয়নি। বরং তৎকালীন আসাম ও ত্রিপুরার চা-বাগান, নদীবন্দর এবং লজিস্টিক করিডোরকে সংযুক্ত করতেই রেললাইনকে বড় বড় বাঁক দিয়ে নির্মাণ করা হয়েছিল।

বিশেষজ্ঞদের মতে, রেলপথের সবচেয়ে জটিল অংশ ভৈরব থেকে সিলেট পর্যন্ত। এ অংশে ব্রাহ্মণবাড়িয়া, হবিগঞ্জ ও মৌলভীবাজার হয়ে দীর্ঘ ঘুরপথে চলায় দূরত্ব ও ভ্রমণের সময় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এই অংশ সোজা করা গেলে বছরে অতিরিক্ত প্রায় ২০ লাখ যাত্রী পরিবহন সম্ভব হবে। একই সঙ্গে সিলেট অঞ্চলের পাথর, চা ও কৃষিপণ্য পরিবহনের ব্যয়ও কমবে। বর্তমানে ৮ থেকে ৯ ঘণ্টার যাত্রা প্রায় চার ঘণ্টায় নামিয়ে আনা সম্ভব হবে বলে মনে করছেন তারা।

পরিবেশবিদদের মতে, বর্তমান রেললাইনটি মৌলভীবাজারের লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানের মধ্য দিয়ে যাওয়ায় পরিবেশগত ক্ষতিও বাড়ছে। এতে বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি প্রায়ই প্রাণী মৃত্যুর ঘটনা ঘটছে।

পরিবেশবাদী সংগঠন ‘ধরিত্রী রক্ষায় আমরা (ধরা)’-এর সদস্য সচিব শরীফ জামিল বলেন, সংরক্ষিত বনাঞ্চল এড়িয়ে নতুনভাবে রেলপথ নির্মাণ করা সম্ভব। এতে একদিকে পরিবেশ রক্ষা হবে, অন্যদিকে উচ্চগতির ট্রেন নিরাপদে চলাচলের সুযোগ পাবে।

বিশেষজ্ঞরা আরও জানান, শত বছরের বেশি পুরোনো এই রেলপথ এখন নিরাপত্তার জন্যও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। জরাজীর্ণ ট্র্যাক ও পুরোনো নকশার কারণে অনেক স্থানে ট্রেনের গতি কমিয়ে চলতে হয়। এতে লাইনচ্যুত হওয়ার আশঙ্কাও বেড়েছে।

‘ঢাকা-সিলেট রেলপথে ৮ দফা দাবি বাস্তবায়ন আন্দোলন’-এর প্রধান সমন্বয়ক আজিজুল ইসলাম ডেইলি সানকে বলেন, ১৩০ বছর আগে নির্মিত এই রেলপথে দৃশ্যমান কোনো আধুনিকায়ন হয়নি। মাঝে মধ্যে সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। তিনি রুটটির পূর্ণাঙ্গ আধুনিকায়নের দাবি জানান।

নিয়মিত যাত্রী ও সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের মতে, সরকারের সদিচ্ছা থাকলে ভৈরব-সিলেট অংশ সোজা করা সম্ভব। পাশাপাশি রেলপথটি জকিগঞ্জ, জাফলং এবং সুনামগঞ্জ পর্যন্ত সম্প্রসারণেরও সুযোগ রয়েছে।

বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালকের কার্যালয়ের কর্মকর্তারাও রুটটির আধুনিকায়নের প্রয়োজনীয়তার কথা স্বীকার করেছেন। তাদের মতে, দেশের সামগ্রিক রেল নেটওয়ার্ক উন্নয়নের অংশ হিসেবে ভৈরব-সিলেট অংশ পুনর্গঠন সময়ের দাবি।

ঐতিহাসিক তথ্য অনুযায়ী, ১৮৯১ থেকে ১৮৯৬ সালের মধ্যে আসাম-বেঙ্গল রেলওয়ের অংশ হিসেবে এই রেলপথ নির্মিত হয়। পরে ১৯১৫ সালে কুলাউড়াকে জংশন হিসেবে যুক্ত করার ফলে রুটটি আরও দীর্ঘ হয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, ১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর সেই নকশার যৌক্তিকতা অনেকটাই শেষ হয়ে গেলেও স্বাধীনতার প্রায় পাঁচ দশক পরও একই ঘুরপথে চলাচল করছে ঢাকা-সিলেট রেলপথ। ফলে অতিরিক্ত দূরত্ব, সময় ও ব্যয়ের বোঝা এখনো বহন করতে হচ্ছে যাত্রীদের।

আরও পড়ুন