EN ☀️
×

Follow Us

বাংলাদেশ

আজ বিশ্ব বাঘ দিবস

সুন্দরবনে বাড়ছে বাঘের সংখ্যা, কমছে লোকালয়ে প্রবেশ

বিষ্ণু প্রসাদ চক্রবর্তী, বাগেরহাট

প্রকাশ: ২৯ জুলাই ২০২৬, ১২:৫৫ পিএম

সুন্দরবনে বাড়ছে বাঘের সংখ্যা, কমছে লোকালয়ে প্রবেশ

ছবি: সংগৃহীত

অ অ

সুন্দরবনে রয়েল বেঙ্গল টাইগারের সংখ্যা বাড়ছে। বনে আগের চেয়ে বাঘের বিচরণও অনেক বেশি দেখা যাচ্ছে। গত কয়েক দফার বাঘ গণনার ফলাফল বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, গড়ে প্রায় ১০টি করে বাঘের সংখ্যা বেড়েছে। গত শুক্রবার (২৪ জুলাই) বিকেলে সুন্দরবনের আন্ধারমানিক ইকোট্যুরিজম কেন্দ্র এলাকায় একটি বাঘকে ঘুরে বেড়াতে দেখা গেছে। সম্প্রতি বনের ওই এলাকায় স্থাপন করা ২০টি ট্র্যাপ ক্যামেরায় এক সপ্তাহে ধারণ করা চিত্র বিশ্লেষণ করে পৃথক তিনটি বাঘ শনাক্ত করেছে বন বিভাগ।

বন ছেড়ে বাঘের লোকালয়ে আসার প্রবণতা যেমন কমেছে, তেমনি বাঘ ও মানুষের মধ্যে দ্বন্দ্বও কমেছে। বনকর্মী এবং ভ্রমণে যাওয়া পর্যটকেরাও সুন্দরবনে জোড়া জোড়া বাঘ দেখতে পাচ্ছেন। তবে এর পরও সুন্দরবনের বাঘ হুমকির মুখে রয়েছে। চোরাশিকারি চক্র, জলবায়ু পরিবর্তন এবং দস্যুদের তৎপরতা এখনো বাঘের জন্য বড় হুমকি। গত ২৫ বছরে সুন্দরবনে ৬১টি বাঘ প্রাণ হারিয়েছে।

বন বিভাগের দাবি, যে কোনো সময়ের তুলনায় বর্তমানে সুন্দরবনে বাঘ অনেক বেশি নিরাপদ। বন বিভাগের ধারাবাহিক অভিযানের কারণে চোরাশিকারিদের তৎপরতা কমেছে। এ কারণে আগামী বাঘ গণনায় সুন্দরবনে বাঘের সংখ্যা আরও বাড়বে বলে প্রত্যাশা তাদের। সর্বশেষ ক্যামেরা ট্র্যাপিংয়ের মাধ্যমে পরিচালিত গণনায় বর্তমানে সুন্দরবনের বাংলাদেশ অংশে বাঘের সংখ্যা ১২৫টি।

বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞদের মতে, সুন্দরবন না থাকলে বাঘও থাকবে না। তাই সুন্দরবন ও বাঘ সংরক্ষণে সরকারকে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে।

আজ বুধবার (২৯ জুলাই) বিশ্ব বাঘ দিবস। সুন্দরবন-সংলগ্ন জেলার মানুষকে সম্পৃক্ত করতে গত কয়েক বছর ধরে ঢাকার বাইরে জাতীয়ভাবে দিবসটি পালন করা হচ্ছে। এবারের প্রতিপাদ্য— ‘সবাই হই সচেতন, বাঘ করি সংরক্ষণ।’

বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, গত কয়েক বছর ধরে ক্যামেরা ট্র্যাপিং পদ্ধতিতে সুন্দরবনে বাঘ গণনা করা হচ্ছে। ২০১৫ সালে প্রথম ক্যামেরা ট্র্যাপিংয়ের মাধ্যমে পরিচালিত জরিপে সুন্দরবনে বাঘের সংখ্যা ছিল ১০৬টি। পরে ২০১৮ সালে একই পদ্ধতিতে গণনায় বাঘের সংখ্যা দাঁড়ায় ১১৪টি। সর্বশেষ ২০২৪ সালের অক্টোবর মাসের জরিপের ফলাফলে সুন্দরবনের বাংলাদেশ অংশে বাঘের সংখ্যা পাওয়া যায় ১২৫টি।

চলতি বছরের ৪ জানুয়ারি সুন্দরবনে চোরাশিকারিদের পেতে রাখা ফাঁদ থেকে একটি বাঘিনীকে উদ্ধার করে বন বিভাগ। কয়েক দিন ফাঁদে আটকে থাকায় প্রায় ১০ বছর বয়সী বাঘিনীটির জীবন সংকটাপন্ন হয়ে পড়েছিল। চিকিৎসার মাধ্যমে তাকে সুস্থ করে তোলা হয়। পরে উদ্ধার হওয়ার ছয় মাস পর, গত ১২ জুলাই বাঘিনীটিকে আবার সুন্দরবনে অবমুক্ত করা হয়।

সুন্দরবন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২০০১ সাল থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত ২৫ বছরে সুন্দরবনে ৬১টি বাঘের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে দুর্বৃত্তদের হাতে ২৬টি, লোকালয়ে জনতার হাতে ১৪টি, স্বাভাবিকভাবে ১৯টি এবং ঘূর্ণিঝড় সিডর ও অন্যান্য কারণে দুটি বাঘ মারা গেছে। এ সময়ে বাঘের চামড়া ও হাড়গোড়ও উদ্ধার করা হয়েছে। একই সময়ে বাঘের আক্রমণে সুন্দরবন পূর্ব বিভাগ এলাকায় ১৩ জন মানুষের মৃত্যু হয়েছে। নিহত ৬১টি বাঘের মধ্যে সুন্দরবন পূর্ব বিভাগে ৩০টি এবং পশ্চিম বিভাগে ৩১টি।

সুন্দরবন পূর্ব বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) মো. রেজাউল করিম চৌধুরী বলেন, বাঘ ও হরিণসহ বনজসম্পদ রক্ষায় বন বিভাগ নিয়মিত নানা ধরনের কার্যক্রম পরিচালনা করছে। নিয়মিত অভিযান পরিচালনার পাশাপাশি পায়ে হেঁটে বন তল্লাশি করা হচ্ছে এবং ড্রোনও ব্যবহার করা হচ্ছে। গত এক বছরে সুন্দরবন থেকে বাঘ ও হরিণ শিকারের জন্য পেতে রাখা বিপুল পরিমাণ ফাঁদ উদ্ধার করা হয়েছে। একই সময়ে ৭০ জন হরিণ শিকারিকে আটক করা হয়েছে। এছাড়া ১৫০ জন চোরাশিকারির তালিকা প্রস্তুত করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। বন বিভাগের ধারাবাহিক অভিযানের কারণে চোরাশিকারি চক্রের তৎপরতা আগের চেয়ে কমেছে। ফলে সুন্দরবনে বাঘের বিচরণও বেড়েছে।

ডিএফও মো. রেজাউল করিম চৌধুরী আরও বলেন, গত কয়েক বছরে সুন্দরবন থেকে লোকালয়ে গিয়ে কোনো বাঘ মারা যায়নি। বাউন্ডারি ফেন্সিং থাকায় বাঘ সীমান্ত এলাকায় গিয়ে আবার বনে ফিরে আসছে। বাঘের প্রধান খাদ্য হরিণের সংখ্যাও বেড়েছে। সমান্তরাল (প্যারালাল) পদ্ধতিতে তল্লাশি চালানোর কারণে বনে ফাঁদ থাকার সুযোগ কমে গেছে। বনের হাঁটার পথ, পুকুরপাড়, খালের পাশে এমনকি বন বিভাগের কার্যালয়ের আশপাশেও মাঝেমধ্যে বাঘ দেখা যাচ্ছে। পর্যটকেরাও সুন্দরবন ভ্রমণে গিয়ে বাঘ দেখতে পাচ্ছেন। একসঙ্গে তিনটি বাঘ ঘুরে বেড়ানোর ঘটনাও দেখা গেছে। সব মিলিয়ে আগের তুলনায় সুন্দরবনে বাঘ অনেক বেশি নিরাপদ। তাই আগামী বাঘ গণনায় বাঘের সংখ্যা আরও বাড়বে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

সুন্দরবন পশ্চিম বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) এ জেড এম হাছানুর রহমান বলেন, সুন্দরবনে বাঘসহ বনজসম্পদ রক্ষায় বন বিভাগ সব সময় সতর্ক রয়েছে। বাঘ সংরক্ষণে বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। বন বিভাগের এসব উদ্যোগের সুফল আগামী বাঘ গণনায় পাওয়া যাবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

সুন্দরবনের দুবলা ফিশারম্যান গ্রুপের সভাপতি কামাল উদ্দিন আহমেদ বলেন, দীর্ঘ ৫০ বছর ধরে তিনি সুন্দরবনে ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত। বনে আসা-যাওয়ার পথে ৫০ বারেরও বেশি বাঘ দেখেছেন। বাঘিনী যাতে নিরাপদে বাচ্চা প্রসব করতে পারে, সে জন্য সুন্দরবনের প্রজননস্থলগুলো সংরক্ষণ করা প্রয়োজন।

বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞ ও ওয়াইল্ডটিমের প্রধান নির্বাহী অধ্যাপক ড. আনোয়ারুল ইসলাম বলেন, জলবায়ু পরিবর্তন, চোরাশিকার, মাছ ধরতে বিষের ব্যবহার এবং দস্যুদের তৎপরতার কারণে সুন্দরবনের বাঘ এখনো হুমকির মুখে রয়েছে। পাশাপাশি সুন্দরবনের ওপরও নানা ধরনের চাপ রয়েছে। তবে এসবের পরও গত ১২ বছরে সুন্দরবনে বাঘের সংখ্যা কমেনি; বরং ধীরে হলেও বেড়েছে। এটিই বড় অর্জন। বাঘ রক্ষা করতে হলে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার মাধ্যমে বাঘের জন্য বিদ্যমান সব হুমকি মোকাবিলা করতে হবে।

তিনি আরও বলেন, সুন্দরবনের ভেতর দিয়ে প্রবাহিত অনেক নদী ও খাল পলি জমে ভরাট হয়ে গেছে। তাই দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ হিসেবে এসব নদী-খাল নিয়মিত খনন করা জরুরি। এতে সুন্দরবনের প্রতিবেশ ও বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল আরও সুরক্ষিত হবে।

আরও পড়ুন