EN ☀️
×

Follow Us

বাংলাদেশ

সাংবিধানিক যোগ্যতা নাকি জনআকাঙ্ক্ষা: কেমন হওয়া উচিত বাংলাদেশের পরবর্তী রাষ্ট্রপ্রধান?

সংবিধান অনুযায়ী সংসদ সদস্যদের গোপন ভোটেই নির্বাচিত হন রাষ্ট্রপতি। ফলে বিএনপির সংখ্যাগরিষ্ঠতার সংসদে কে হবেন দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি, তা নির্ভর করছে দলটির সিদ্ধান্তের ওপরই

ইমন ইসলাম

ইমন ইসলাম

প্রকাশ: ২৫ জুলাই ২০২৬, ০৬:৪৩ পিএম

সাংবিধানিক যোগ্যতা নাকি জনআকাঙ্ক্ষা: কেমন হওয়া উচিত বাংলাদেশের পরবর্তী রাষ্ট্রপ্রধান?

বাংলাদেশের পরবর্তী রাষ্ট্রপতি কে হবেন, তা নিয়ে চলছে জল্পনা। প্রতীকী ছবি

অ অ

দেশের ২২তম রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগের পর থেকেই রাজনৈতিক অঙ্গন থেকে শুরু করে সামাজিকমাধ্যম সবখানে এখন একটাই আলোচনা— কে হচ্ছেন পরবর্তী রাষ্ট্রপ্রধান? দেশের সংবিধানের ৪৮ অনুচ্ছেদে রাষ্ট্রপতি হওয়ার জন্য ৩৫ বছর বয়স, সংসদ সদস্য হওয়ার যোগ্যতা এবং অভিশংসিত না হওয়ার মতো কিছু আইনি শর্ত বেঁধে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু বদলে যাওয়া বর্তমান পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষ জানতে চাইছেন, কাগজে লেখা এই যোগ্যতাই কি শেষ কথা, নাকি একজন রাষ্ট্রপ্রধানের কাছ থেকে সংকটে পথ দেখানোর মতো আরও বড় কিছু প্রত্যাশা করে রাষ্ট্র?

আইনি যোগ্যতার বাইরেও যা চায় জনগণ

বিদ্যমান আইনে বয়স বা নাগরিকত্বের যে শর্ত রয়েছে, তা পূরণ করা লাখো নাগরিকের পক্ষেই সম্ভব। কিন্তু বর্তমান প্রেক্ষাপটে দেশের মানুষ এমন একজনকে রাষ্ট্রপতি হিসেবে দেখতে চান, যার থাকবে বিতর্কমুক্ত ভাবমূর্তি। কোনো নির্দিষ্ট দলের অন্ধ আনুগত্যের ঊর্ধ্বে উঠে যিনি হয়ে উঠবেন জাতীয় ঐক্যের প্রতীক। রাজনৈতিক বা সাংবিধানিক অচলাবস্থায় কঠোর ও নিরপেক্ষ সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতাও থাকা চাই তার। সর্বোপরি দরকার এমন সর্বজনীন গ্রহণযোগ্যতা, যাতে বিচার বিভাগ, সুশীল সমাজ ও সাধারণ জনগণ— সবার কাছেই তিনি সমান শ্রদ্ধেয় হয়ে উঠতে পারেন।

বাংলাদেশের শাসনব্যবস্থায় রাষ্ট্রপতি পদটি মূলত আনুষ্ঠানিক বা অলংকারিক, প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ ছাড়া যেখানে খুব কম কাজই করার সুযোগ থাকে। তবে সাম্প্রতিক নানা ঘটনাপ্রবাহ প্রমাণ করেছে, রাষ্ট্র যখন বড় কোনো সংকটে পড়ে, তখন রাষ্ট্রপতির কার্যালয়ই হয়ে ওঠে দেশের শেষ ভরসাস্থল।

তাহলে প্রশ্ন থেকে যায়— রাষ্ট্রপতি পদটি কি কেবলই অবসরপ্রাপ্ত রাজনীতিক বা আমলাদের পুনর্বাসনকেন্দ্র হয়ে থাকবে? নাকি এমন কাউকে বেছে নেওয়া হবে, যিনি রাষ্ট্র সংস্কার ও জাতীয় সমঝোতায় সক্রিয় ভূমিকা রাখতে পারবেন?

দেশের মোট জনসংখ্যার বড় অংশই তরুণ। তাদের কাছে রাষ্ট্রপতির যোগ্যতার সংজ্ঞা কেবল সংবিধানের কিছু ধারায় সীমাবদ্ধ নয়। তারা চান রাষ্ট্রপতির থাকুক আধুনিক দৃষ্টিভঙ্গি, আন্তর্জাতিক কূটনীতি ও বৈশ্বিক রাজনীতি বোঝার সক্ষমতা এবং সবার ওপরে দলনিরপেক্ষ অবস্থান। সংকীর্ণ দলীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে দেশের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়াই হওয়া উচিত একজন রাষ্ট্রপ্রধানের অন্যতম লক্ষ্য— এমনটাই মনে করে তরুণ প্রজন্ম।

আইনের চোখে রাষ্ট্রপতির যোগ্যতা বিচার করা সহজ। কিন্তু একটি উন্নয়নশীল ও রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল রাষ্ট্রে পরবর্তী রাষ্ট্রপ্রধানের যোগ্যতা কেবল সংবিধানে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। বর্তমান পরিস্থিতি দাবি করে এমন এক ব্যক্তিত্বের, যিনি কেবল বঙ্গভবনের বাসিন্দা নন, বরং হয়ে উঠবেন দেশের ১৮ কোটি মানুষের প্রকৃত অভিভাবক।

পেশাজীবী নাকি রাজনীতিক— কে হবেন উপযুক্ত?

দেশের ২২তম রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের পর পরবর্তী রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে কার নাম আসবে, তা নিয়ে জনমনে আগ্রহের কমতি নেই। চিরাচরিত রাজনৈতিক ঘরানার বাইরে গিয়ে দেশের নাগরিক সমাজ ও সাধারণ মানুষের মধ্যে এখন একটি নতুন দাবি জোরালো হচ্ছে— পরবর্তী রাষ্ট্রপতি হিসেবে কোনো দলীয় রাজনীতিকের বদলে সাবেক বিচারপতি, বিশিষ্ট শিক্ষক বা সর্বজনশ্রদ্ধেয় কোনো বুদ্ধিজীবীকে বেছে নেওয়া হোক। রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ অভিভাবক পদে কেন একজন অরাজনৈতিক পেশাজীবীকে প্রয়োজন, তা নিয়ে পক্ষে-বিপক্ষে নানা যুক্তিও উঠে আসছে।

দেশের সংকটকালে রাষ্ট্রপতিকে নানা আইনি ও সাংবিধানিক জটিলতার মুখোমুখি হতে হয়। অতীতে বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদের মতো ব্যক্তিত্বের রাষ্ট্রপ্রধান হওয়ার নজিরও বাংলাদেশে রয়েছে। এই যুক্তির সমর্থকদের মতে, সাবেক প্রধান বিচারপতি বা জ্যেষ্ঠ আইনজীবীকে এই পদে বসানো হলে তার দীর্ঘ বিচারিক অভিজ্ঞতা যেকোনো রাজনৈতিক সংকটে সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ ও আইনসম্মত সিদ্ধান্ত নিতে সহায়ক হবে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো প্রথিতযশা অধ্যাপক বা শিক্ষাবিদ রাষ্ট্রপতির আসনে বসলে তা দেশের সামগ্রিক রাজনৈতিক ও সামাজিক রুচিবোধে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারে বলেও মনে করেন অনেকে। একজন শিক্ষক বা বুদ্ধিজীবীর প্রতি সমাজের সর্বস্তরের মানুষের যে নৈতিক শ্রদ্ধা থাকে, তা বর্তমানের বিভক্ত রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে এক অভাবনীয় ভারসাম্য এনে দিতে পারে। যেহেতু একজন নির্দলীয় বুদ্ধিজীবী বা পেশাজীবী কোনো রাজনৈতিক দলের প্রতি অন্ধ আনুগত্য দেখাতে বাধ্য নন, তাই তিনি প্রকৃত অর্থেই ‘জাতীয় ঐক্যের প্রতীক’ হয়ে উঠতে পারেন— যা সাধারণ মানুষের প্রধান আকাঙ্ক্ষা।

রাজনৈতিক অঙ্গনের ভাবনা কী বলছে?

পেশাজীবীদের রাষ্ট্রপ্রধান করার এই প্রবল জনআকাঙ্ক্ষা থাকলেও দেশের রাজনৈতিক দলগুলোর একটি বড় অংশ মনে করে, রাষ্ট্রপতি পদটি মূলত রাজনৈতিক প্রজ্ঞারই জায়গা। তাদের যুক্তি, মাঠপর্যায়ের রাজনীতি ও রাজনৈতিক গতিপ্রকৃতি একজন ঝানু রাজনীতিক যেভাবে বোঝেন, একজন শিক্ষক বা বিচারপতির পক্ষে তা বোঝা সবসময় সম্ভব নাও হতে পারে।

বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় ক্ষমতাসীন দল— বর্তমান সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতায় থাকা বিএনপি— সাধারণত তাদের দলের প্রবীণ ও বিশ্বস্ত নেতাদেরই এই পদে অগ্রাধিকার দিয়ে থাকে, যাতে সরকার ও রাষ্ট্রপতির কার্যালয়ের মধ্যে কোনো দূরত্ব তৈরি না হয়।

তবে রাজনৈতিক দলগুলো নিজেদের সিনিয়র নেতাদেরই এই পদে দেখতে বেশি আগ্রহী হলেও বদলে যাওয়া বাংলাদেশের তরুণ সমাজ ও সুশীল সমাজ মনে করে, অন্তত একটি মেয়াদের জন্য হলেও একজন সাবেক বিচারপতি, শিক্ষক বা বুদ্ধিজীবীকে রাষ্ট্রপতি করা উচিত। এতে প্রমাণিত হবে, বাংলাদেশ শুধু ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনীতির চেনা ছকেই ঘুরপাক খাচ্ছে না, বরং মেধা ও নৈতিকতাকেও রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ স্তরে মূল্যায়ন করতে শিখেছে।

চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত কার হাতে?

সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন সংসদ সদস্যদের গোপন ব্যালটের ভোটে। যেহেতু ১৩তম জাতীয় সংসদে ক্ষমতাসীন দল বিএনপির একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা রয়েছে, তাই রাজনৈতিক বাস্তবতায় বিএনপি যাকে মনোনয়ন দেবে, তিনিই হতে যাচ্ছেন দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি।

আইনের চোখে বাংলাদেশের একজন নাগরিকের রাষ্ট্রপতি হওয়ার শর্তগুলো আপাতদৃষ্টিতে সহজ মনে হলেও, সংসদ সদস্যদের মনোনয়ন ও সমর্থনের বাধ্যবাধকতার কারণে এই পদের চাবিকাঠি শেষ পর্যন্ত থেকে যায় রাজনৈতিক দলগুলোর হাতেই। এখন দেখার বিষয়, জনআকাঙ্ক্ষা আর রাজনৈতিক বাস্তবতার এই টানাপোড়েনে শেষ পর্যন্ত কার পাল্লা ভারী হয়— আর বঙ্গভবনে পরবর্তী বাসিন্দা হিসেবে কে বসেন, দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতির আসনে।

আরও পড়ুন