EN ☀️
×

Follow Us

বাংলাদেশ

বঙ্গভবনে নতুন মুখ, প্রশ্ন পুরোনো: রাষ্ট্রপতির হাতে আসলে কতটা ক্ষমতা থাকা উচিত?

শুক্রবার রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগের পর ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নিয়েছেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ

ইমন ইসলাম

ইমন ইসলাম

প্রকাশ: ২৫ জুলাই ২০২৬, ১০:৫৮ এএম

বঙ্গভবনে নতুন মুখ, প্রশ্ন পুরোনো: রাষ্ট্রপতির হাতে আসলে কতটা ক্ষমতা থাকা উচিত?

বঙ্গভবন। ইনসেটে সদ্য পদত্যাগ করা দেশের ২২তম রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন। ছবি: সংগৃহীত

অ অ

শুক্রবার দেশের ২২তম রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটল। সংবিধানের ৫০(৩) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী তিনি জাতীয় সংসদের স্পিকারের কাছে পদত্যাগপত্র জমা দেন, আর সাংবিধানিক নিয়ম মেনে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নিয়েছেন। নতুন রাষ্ট্রপতি দায়িত্ব না নেওয়া পর্যন্ত তিনিই এই পদে থাকবেন।

টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া, সাধারণ রিকশাচালক থেকে শুরু করে উচ্চপদস্থ চাকরিজীবী— দেশের প্রতিটি মানুষের মুখেই এখন আলোচনার কেন্দ্রে শুধু ‘পরবর্তী রাষ্ট্রপতি কে হবেন’ প্রশ্নটি নয়। তার চেয়েও বড় প্রশ্ন উঠেছে— নতুন রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা কি আগের মতোই কেবল আনুষ্ঠানিক থাকবে, নাকি সেটি এবার সত্যিই বাড়বে?

রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা এখন আসলে কতটুকু?

বাংলাদেশের সংবিধানে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে ক্ষমতার প্রকৃত ভারসাম্য নেই বললেই চলে। সংসদীয় শাসনব্যবস্থায় প্রধানমন্ত্রীই নির্বাহী বিভাগের প্রকৃত প্রধান, আর রাষ্ট্রপতির পদটি মূলত আনুষ্ঠানিক।

এর মূল কারণ সংবিধানের ৪৮(৩) অনুচ্ছেদ। এই অনুচ্ছেদ অনুযায়ী কেবল দুটি কাজ— সংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতাকে প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ এবং প্রধান বিচারপতি নিয়োগ—ছাড়া বাকি প্রায় সব সিদ্ধান্তে রাষ্ট্রপতিকে প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ মেনে চলতে হয়। মন্ত্রী, আমলা, রাষ্ট্রদূত বা বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কমিশনের প্রধান নিয়োগ, সংসদে বিল পাস, সামরিক বাহিনীর মূল নিয়ন্ত্রণ— সবকিছুর নিয়ন্ত্রণ প্রধানমন্ত্রীর হাতে।

রাষ্ট্রপতি সংবিধানের ৪৯ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী দণ্ডিত ব্যক্তির সাজা মওকুফ করতে পারেন, আবার জরুরি অবস্থাও জারি করতে পারেন। কিন্তু এই দুটি কাজের জন্যও প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ বা প্রতিস্বাক্ষর লাগে। এই কারণেই রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে প্রায়ই ‘নির্বাচিত একনায়ক’ বলে অভিহিত করেন— কারণ তিনি একসঙ্গে নির্বাহী বিভাগ ও সংসদ, দুটোরই নিয়ন্ত্রক।

জুলাই বিপ্লবের পর কেন উঠছে এই দাবি?

দেশের বিগত দেড়-দুই দশকের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, একজনের হাতে সব ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত থাকলে তা কীভাবে ধীরে ধীরে একচ্ছত্র শাসনের দিকে যেতে পারে। জুলাই বিপ্লবের পর তাই তরুণ প্রজন্ম ও বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতির ক্ষমতার ভারসাম্য আনার দাবি জোরালো হয়েছে।

চলমান সংবিধান সংস্কার প্রক্রিয়ায় আলোচনা হচ্ছে, নির্বাচন কমিশন, দুর্নীতি দমন কমিশন বা পাবলিক সার্ভিস কমিশনের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের প্রধান নিয়োগের ক্ষমতা রাষ্ট্রপতির স্বাধীন এখতিয়ারে দেওয়ার। রাজনৈতিক মহলে গুঞ্জন রয়েছে, নতুন স্থায়ী রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের আগেই সংসদে একটি বড় সংবিধান সংশোধনী (সম্ভাব্য ১৮তম সংশোধনী) আসতে পারে, যার মূল লক্ষ্য হতে পারে প্রধানমন্ত্রীর একক ক্ষমতা কমিয়ে রাষ্ট্রপতি ও সংসদের ক্ষমতা বাড়ানো।

তবে সংবিধান সংস্কার কমিশন ক্ষমতা সম্পূর্ণ ‘সমান’ করার পক্ষে নয়। বরং তারা প্রস্তাব করছে একটি ‘যুক্তিযুক্ত ভারসাম্য’— যেমন গুরুত্বপূর্ণ নিয়োগে স্বাধীনতা এবং রাষ্ট্রপতির সিদ্ধান্তে সহায়তার জন্য সর্বদলীয় জাতীয় কাউন্সিল গঠনের প্রস্তাব।

ক্ষমতা বাড়লে লাভ কী, ঝুঁকিই বা কোথায়?

ক্ষমতা বাড়ানোর পক্ষে যুক্তি দুটি। প্রথমত, রাষ্ট্রপতির হাতে জরুরি অবস্থা জারি বা সামরিক বাহিনীর শীর্ষ নিয়োগের মতো বিষয়ে স্বাধীন সিদ্ধান্ত বা ভেটো দেওয়ার ক্ষমতা থাকলে কোনো প্রধানমন্ত্রীর পক্ষে এককভাবে স্বৈরাচারী হয়ে ওঠা কঠিন হবে। দ্বিতীয়ত, রাজনৈতিক অচলাবস্থায় রাষ্ট্রপতি দলমতের ঊর্ধ্বে থেকে দেশের প্রকৃত অভিভাবকের ভূমিকা পালন করতে পারবেন।

তবে ঝুঁকিও কম নয়। রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা একদম সমান করে দিলে রাষ্ট্রে দুটি ক্ষমতাকেন্দ্র তৈরি হতে পারে। দুজনের মধ্যে মতবিরোধ দেখা দিলে প্রশাসনে স্থবিরতা নামার আশঙ্কা থাকে। এ কারণেই বেশিরভাগ বিশ্লেষক পুরোপুরি ‘সমান’ ক্ষমতার বদলে পারস্পরিক জবাবদিহির একটি কাঠামোর কথা বলছেন।

এখানে একটি বাস্তব বাধাও আছে। সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী কোনো সংসদ সদস্য নিজের দলের বিরুদ্ধে ভোট দিতে পারেন না। ফলে সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের প্রধান (যিনি প্রধানমন্ত্রী হন) নিজে না চাইলে তার দলের এমপিরা রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বাড়ানোর পক্ষে ভোট দেবেন না বলেই ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়।

প্রতিবেশী দেশগুলোর অভিজ্ঞতা কী বলে?

ভারতের রাষ্ট্রপতি বাংলাদেশের তুলনায় কিছুটা বেশি স্বাধীনতা ভোগ করেন— বিশেষ করে কোনো দল একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পেলে সরকার গঠনের প্রশ্নে তার ব্যক্তিগত বিবেচনার সুযোগ থাকে। পাকিস্তানেও একসময় রাষ্ট্রপতির হাতে সরকার ভেঙে দেওয়ার ক্ষমতা ছিল, কিন্তু ২০১০ সালের ১৮তম সংশোধনীর পর তা প্রধানমন্ত্রীর হাতে চলে যায়—ফলে আইনি কাঠামোয় এখন পাকিস্তানের রাষ্ট্রপতিও অনেকটা আনুষ্ঠানিক। অন্যদিকে শ্রীলঙ্কার ব্যবস্থা সম্পূর্ণ আলাদা—সেখানে রাষ্ট্রপতি সরাসরি জনগণের ভোটে নির্বাচিত হন এবং প্রকৃত ক্ষমতার অধিকারী থাকেন।

বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি জনগণের সরাসরি ভোটে নয়, নির্বাচিত হন সংসদ সদস্যদের ভোটে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানীদের একটি অংশ মনে করেন, পরোক্ষভাবে নির্বাচিত একজন রাষ্ট্রপ্রধানকে সরাসরি নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রীর সমান বা তার চেয়ে বেশি ক্ষমতা দেওয়া গণতান্ত্রিক রীতির সঙ্গে কিছুটা সাংঘর্ষিক হতে পারে। তাই রাষ্ট্রপতিকে শক্তিশালী করতে হলে তার নির্বাচন পদ্ধতি নিয়েও আলোচনা প্রয়োজন হতে পারে।

এখন কী হবে?

স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ আপাতত ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করছেন। নতুন স্থায়ী রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের প্রক্রিয়া শুরু হবে সামনে। কিন্তু আসল প্রশ্নটা রয়ে যাচ্ছে অমীমাংসিত— নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের আগে সংবিধানে কোনো পরিবর্তন আসবে কি না, আর এলে ক্ষমতার এই দীর্ঘদিনের অসম বণ্টনে কতটা বদল আসবে।

জুলাই বিপ্লব-পরবর্তী তরুণ প্রজন্মের প্রত্যাশা স্পষ্ট— তারা বঙ্গভবনে শুধু একজন নতুন মুখ নয়, এমন একটি ব্যবস্থা দেখতে চায় যেখানে ক্ষমতা একজনের হাতে কেন্দ্রীভূত না থেকে যথাযথভাবে বিভক্ত থাকে। নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের আগেই সেই পরিবর্তন আসবে কি না— সেটাই এখন দেখার বিষয়।

আরও পড়ুন