EN ☀️
×

Follow Us

বাংলাদেশ

নারী নেতৃত্বে সবুজ সমৃদ্ধি

আরইসিপি পদ্ধতিতে পিয়া বিশ্বাসের খামার এখন টেকসই উদ্যোক্তার রোল মডেল

ডেইলি সান রিপোর্ট, সাতক্ষীরা

প্রকাশ: ২১ জুলাই ২০২৬, ০৪:৫৬ এএম

আরইসিপি পদ্ধতিতে পিয়া বিশ্বাসের খামার এখন টেকসই উদ্যোক্তার রোল মডেল

ছবি: সংগৃহীত

অ অ

সাতক্ষীরার তালা উপজেলার লাউতারা গ্রামের এক প্রান্তিক গবাদিপশুর খামার এখন গ্রামীণ অর্থনীতিতে পরিবর্তনের নতুন উদাহরণ সৃষ্টি করেছে। উদ্যোক্তা পিয়া বিশ্বাসের এই খামারে প্রতিদিন বাঁচছে হাজার হাজার লিটার পানি, বিদ্যুৎ খরচ কমে এসেছে প্রায় অর্ধেকে। আর পরিবেশের ওপর চাপ সৃষ্টি করা পশুর বর্জ্যকে ফেলা দেওয়ার বদলে রূপান্তর করা হচ্ছে লাভজনক কেঁচো সারে (ভার্মিকম্পোস্ট)।

বাংলাদেশজুড়ে যেখানে গ্রামীণ উদ্যোগে নারীদের ভূমিকা দিন দিন জোরালো হচ্ছে, সেখানে পিয়ার এই সাফল্য জলবায়ু-সহনশীল ও টেকসই জীবিকার এক স্পষ্ট প্রতিফলন। তার এই অভিজ্ঞতা প্রমাণ করে যে 'রিসোর্স-এফিশিয়েন্ট অ্যান্ড ক্লিনার প্রোডাকশন' (আরইসিপি) বা 'সম্পদ-দক্ষ ও পরিচ্ছন্ন উৎপাদন' পদ্ধতি বাস্তবায়নের মাধ্যমে নারী উদ্যোক্তারা পরিবেশ রক্ষা করেই উৎপাদন খরচ কমাতে এবং ব্যবসাকে অধিক লাভজনক করতে পারেন—যা জাতিসংঘ ঘোষিত টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার এসডিজি ৫ (লিঙ্গ সমতা) এবং এসডিজি ১৩ (জলবায়ু সংক্রান্ত পদক্ষেপ) অর্জনে সরাসরি অবদান রাখছে।

পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশন (পিকেএসএফ) পরিচালিত  স্মার্ট প্রকল্পের সহায়তায় পিয়া বিশ্বাসের এই পরিবর্তন সম্ভব হয়েছে। বাংলাদেশ সরকার ও বিশ্বব্যাংকের যৌথ অর্থায়নে দেশব্যাপী বাস্তবায়িত এই প্রকল্পের আওতায় সাতক্ষীরা অঞ্চলে গবাদিপশু বিষয়ক কার্যক্রমটি পরিচালনা করছে পিকেএসএফ-এর সহযোগী সংস্থা 'উন্নয়ন প্রচেষ্টা'।

২০১৫ সাল থেকে গবাদিপশু পালনই ছিল পিয়া বিশ্বাসের আয়ের মূল উৎস। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে পশুখাদ্য ও বিদ্যুৎ-পানির ক্রমবর্ধমান খরচ এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জটিলতায় খামারের মুনাফা তলানিতে গিয়ে ঠেকে।

তার জীবনের বড় পরিবর্তনটি আসে ২০২৫ সালে, যখন তিনি ‘স্মার্ট’ প্রকল্পের একটি সচেতনতামূলক সভায় অংশ নেন। পরবর্তীতে তিনি পরিবেশবান্ধব ও জলবায়ু-সহনশীল খামার ব্যবস্থাপনার ওপর ব্যবহারিক প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। এই প্রশিক্ষণ তার চিন্তাধারায় আমূল পরিবর্তন আনে—তিনি বুঝতে পারেন, পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি খামারের অতিরিক্ত খরচ নয়, বরং এটি ব্যবসার স্থায়িত্ব ও দক্ষতার জন্য এক লাভজনক বিনিয়োগ।

প্রকল্পের কারিগরি সহায়তায় পিয়া তার ১০টি গরুর খামারে সৌরবিদ্যুৎ চালিত ফগার ও ভেন্টিলেশন সিস্টেম, প্রাকৃতিক আলোর জন্য স্বচ্ছ চালের শিট এবং কেঁচো সার উৎপাদনসহ মোট ৭টি পরিবেশবান্ধব (আরইসিপি) প্রযুক্তি যুক্ত করেন।

ফলে,  দৈনিক পানির ব্যবহার কমেছে প্রায় ৫,০০০ লিটার এবং কমেছে বিদ্যুৎ খরচও। পাশাপাশি, সোলার ফগার সিস্টেমের কারণে খামারের তাপমাত্রা সহনীয় থাকায় পশুগুলো থাকছে অধিক সুস্থ ও কর্মক্ষম।

উদ্যোক্তা পিয়া বিশ্বাস বলেন:

"সোলার প্যানেল বসানোর আগে প্রতি মাসে আমাদের বিদ্যুৎ বিল আসত প্রায় ৩,৫০০ টাকা। এখন তা কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ১,৬০০ টাকায়! দিনের বেলা সোলার শক্তিতে ফ্যান চলে এবং গরুকে হাত দিয়ে গোসল করানোর বদলে সোলার ফগার ব্যবহার করায় পানি ও বিদ্যুৎ দুটিই বাঁচছে। এছাড়া কেঁচো সার বিক্রি করে বাড়তি আয়ও হচ্ছে।"

গ্রামীণ অর্থনীতিতে পরিবর্তনের হাওয়া

পরিচ্ছন্ন উৎপাদন পদ্ধতির এই গ্রহণ কেবল পরিবেশ রক্ষাই করছে না, বরং নারী ক্ষমতায়নেও গতি এনেছে। খামার পরিচালনা খরচ কমে যাওয়া এবং আয়ের নতুন উৎস তৈরি হওয়ায় জলবায়ু পরিবর্তন বা বাজারসংক্রান্ত ধাক্কা মোকাবিলায় পিয়ার ব্যবসা এখন অনেক বেশি শক্তিশালী।

তার এই সাফল্য 'বাংলাদেশ ক্লাইমেট চেঞ্জ অ্যান্ড জেন্ডার অ্যাকশন প্ল্যান' (সিসিজিএপি)-এর উদ্দেশ্যকে বাস্তবে রূপ দিচ্ছে, যা প্রমাণ করে যে সবুজ প্রযুক্তি ও কারিগরি দক্ষতা অর্জনের সুযোগ পেলে নারীরা জলবায়ু-সহনশীল অর্থনৈতিক উন্নয়নে নেতৃত্ব দিতে সক্ষম।

বর্তমানে পিয়া বিশ্বাসের খামারটি এই অঞ্চলের খামারিদের জন্য এক প্রদর্শনী কেন্দ্র বা 'রোল মডেল'-এ পরিণত হয়েছে। আশেপাশের গ্রামের খামারিরা নিয়মিত তার খামার দেখতে আসছেন এবং অনেকে নিজেদের খামারেও এই প্রযুক্তি অনুসরণের আগ্রহ দেখাচ্ছেন। বাংলাদেশের সবুজ অর্থনীতির পথে পিয়ার এই যাত্রা কেবল গ্রামীণ জীবিকাকেই উন্নত করেনি, বরং বৈশ্বিক জলবায়ু প্রতিশ্রুতিকে স্থানীয় পর্যায়ে সফলভাবে বাস্তবায়ন করার পথ দেখায়।

আরও পড়ুন