ফিরে দেখা ১৯ জুলাই
একদিনেই গুলিতে ঝরেছিল ১৪৮ প্রাণ, রক্তাক্ত হয়েছিল পুরো দেশ
মাহবুব আলম, ঢাকা
প্রকাশ: ১৯ জুলাই ২০২৬, ০৯:০১ পিএম
২০২৪ সালের ১৯ জুলাই, শুক্রবার। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ডাকা ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ কর্মসূচির দ্বিতীয় দিন। সেদিন সারা দেশে নজিরবিহীন সংঘর্ষ, ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও নির্বিচার গুলিবর্ষণের ঘটনায় এক রক্তাক্ত ও বিভীষিকাময় পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল। আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের ওপর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশাপাশি তৎকালীন ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরাও হামলা চালান। বিক্ষোভকারীদের লক্ষ্য করে চালানো হয় নির্বিচার গুলি।
হাসপাতালগুলোতে সেদিন আহত মানুষের ঢল নেমেছিল। রোগীর চাপ সামলাতে হিমশিম খেয়েছিলেন চিকিৎসক ও নার্সরা। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে ওই রাতেই সারা দেশে কারফিউ জারি এবং সেনা মোতায়েন করা হয়।

ইন্টারন্যাশনাল ট্রুথ অ্যান্ড জাস্টিস প্রজেক্ট এবং টেক গ্লোবাল ইনস্টিটিউটের একটি যৌথ গবেষণা প্রতিবেদন অনুযায়ী, শুধু ১৯ জুলাই সারা দেশে অন্তত ১৪৮ জন নিহত হন। এর মধ্যে রাজধানীতেই প্রাণ হারান ১২৪ জন। এ ছাড়া নরসিংদীতে ৭ জন, নারায়ণগঞ্জে ৭ জন, রংপুরে ৪ জন, মাদারীপুরে ২ জন এবং ময়মনসিংহ, বগুড়া, সিলেট ও ঢাকার সাভারে ১ জন করে নিহত হন।
মোহাম্মদপুরে ১৩ হত্যা: নিভে গেল সৈকতের স্বপ্ন
শুধু মোহাম্মদপুর এলাকাতেই সেদিন ১৩ জনের মৃত্যু হয়। তাদেরই একজন তরুণ মাহমুদুর রহমান সৈকত।
মোহাম্মদপুরের নূরজাহান রোডে একটি দোকান চালাতেন সৈকতের বাবা মাহবুবুর রহমান। জরুরি প্রয়োজনে তিনি চট্টগ্রামে থাকায় দোকানের দায়িত্ব ছিল ছেলের হাতে। সৈকতের বড় বোন সাবরিনা আফরোজ জানান, ১৯ জুলাই জুমার নামাজ শেষে দুপুরের খাবার খেয়ে দোকানে গিয়েছিলেন সৈকত। কিছুক্ষণ পরই খবর আসে, তার এক বন্ধু গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। এরপর দোকান বন্ধ করার কথা বলে বাসা থেকে বের হয় সৈকত। সেটিই ছিল পরিবারের সঙ্গে তার শেষ কথা।
মাহমুদুর রহমান সৈকত: ছবি সংগৃহীতসাবরিনা বলেন, ‘কিছুক্ষণ পরই খবর আসে, পুলিশের গুলিতে আমার একমাত্র ভাই আহত হয়েছে। সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসকেরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন।’
তিনি আরও বলেন, ‘একেবারে কাছ থেকে মাথায় গুলি করা হয়েছিল। কোনো অপরাধীর সঙ্গেও এমন করা হয় না।’
সৈকতের পরিবারের অভিযোগ, হাসপাতাল থেকে মরদেহ এলাকায় আনার পর পুলিশ তা নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। উদ্ভূত পরিস্থিতি এড়াতে মরদেহ আল-মারকাজুল ইসলামীতে লুকিয়ে রাখা হয় এবং পরদিন তাজমহল রোড জামে মসজিদ কবরস্থানে দাফন করা হয়।
সাবরিনা প্রশ্ন তোলেন, ‘আমার ভাই এমন কী অপরাধ করেছিল যে তাকে মাথায় গুলি খেতে হলো?’ তিনি বলেন, এই মৃত্যু শুধু একটি তরুণ প্রাণের বিদায় নয়, বরং একটি পরিবারের স্বপ্ন, আনন্দ ও ভালোবাসার সমাপ্তি।
ঘটনার পরিকল্পনাকারী ও হত্যাকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেন তিনি।
এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় মোহাম্মদপুর থানায় মামলা করেন সৈকতের বাবা মাহবুবুর রহমান। মামলাটি পরবর্তীতে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে (আইসিটি) স্থানান্তরিত হয় এবং বর্তমানে রায়ের অপেক্ষায় রয়েছে।
বাড্ডায় রণক্ষেত্র: নিহত মারুফের বাবার কান্না ও গোয়েন্দা ভয়ভীতি
রাজধানীর বাড্ডা এলাকায় সেদিন নিহত হন ১২ জন, যাদের একজন মারুফ হাসান। ১৯ জুলাই বিকেলে মেরুল বাড্ডা এলাকা রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছে শত শত বিক্ষোভকারীর ওপর গুলি, সাউন্ড গ্রেনেড, টিয়ারশেল ও লাঠিচার্জ করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। সন্ধ্যা ছয়টার দিকে মারুফ গুলিবিদ্ধ হন।
পূর্ব বাড্ডার বাসিন্দা মারুফের বাবা মোহাম্মদ ইদ্রিস ডেইলি সানকে জানান, ঘটনার দুই দিন পর ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে ছেলের মরদেহ পান তারা। ২১ জুলাই জানাজা শেষে পূর্ব বাড্ডার একটি কবরস্থানে মারুফকে দাফন করা হয়।
মারুফ হাসান: ছবি সংগৃহীততিনি আরও জানান, ছেলের মৃত্যুর পর পুলিশ, এনএসআই ও ডিজিএফআই সদস্যরা বারবার তার বাড়িতে গিয়ে গণমাধ্যমের কাছে মুখ না খোলার জন্য সতর্ক করেন।
এই চাপে তখন গোয়েন্দা সংস্থার নির্দেশমতোই গণমাধ্যমকে বক্তব্য দিতে বাধ্য হয়েছিলেন বলে জানান তিনি।
শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পরই কেবল প্রকৃত ঘটনা প্রকাশ করতে পেরেছেন বলে উল্লেখ করেন ইদ্রিস।
মারুফের হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল ইতোমধ্যে রায় দিয়েছে জানিয়ে ইদ্রিস বলেন, তিনি চান সেই রায়ের বাস্তবায়ন দেখতে।
শহীদের পরিসংখ্যান
বাংলাদেশ সরকারের গেজেট অনুযায়ী, জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানে সারা দেশে ৮৪৩ জন শহীদ এবং ১৪ হাজার ৩৭০ জন আহত হন। তবে জাতিসংঘের একটি বিশেষ প্রতিবেদনে এই আন্দোলনের ঘটনায় নিহতের সংখ্যা প্রায় ১ হাজার ৪০০ বলে উল্লেখ করা হয়েছে।