চুয়াডাঙ্গায় উন্মুক্ত দরপত্র ছাড়াই ১৮ প্রকল্পের কার্যাদেশ, এডিপি বাস্তবায়ন নিয়ে বিতর্ক
ডেইলি সান রিপোর্ট, কুষ্টিয়া
প্রকাশ: ০৪ জুলাই ২০২৬, ১২:০৬ পিএম
ছবি: সংগৃহীত
চুয়াডাঙ্গার আলমডাঙ্গা উপজেলায় ২০২৫-২৬ অর্থবছরের উপজেলা বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) ১৮টি প্রকল্পের কার্যাদেশকে কেন্দ্র করে বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। প্রায় ৪৫ লাখ ৩৯ হাজার টাকার এসব প্রকল্প উন্মুক্ত দরপত্র আহ্বান না করে রিকোয়েস্ট ফর কোটেশন (আরএফকিউ) পদ্ধতিতে বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নেওয়ায় সরকারি ক্রয়প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও প্রতিযোগিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও রাজনৈতিক নেতারা।
উপজেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, এডিপির অতিরিক্ত চতুর্থ কিস্তিতে আলমডাঙ্গা উপজেলার জন্য ৪৫ লাখ ৩৯ হাজার টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। গত ১ জুন প্রকল্পগুলো প্রাথমিকভাবে ভাগ করা হয় এবং ১৪ জুন উপজেলা সমন্বয় কমিটির সভায় ১৮টি প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়। সভার কার্যবিবরণী অনুযায়ী, স্থানীয় সংসদ সদস্য মাসুদ পারভেজের পরামর্শক্রমে উপজেলা প্রকৌশলীকে প্রাক্কলন প্রস্তুত করে দ্রুত আরএফকিউ পদ্ধতিতে প্রকল্প বাস্তবায়নের নির্দেশ দেওয়া হয়।
তবে উপজেলা প্রকৌশল কার্যালয়ের নথিতে ভিন্ন তথ্য পাওয়া গেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, উপজেলা প্রকৌশলী তাওহীদ আহমেদ ৭ ও ১৪ জুন পৃথক দুটি চিঠিতে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে প্রকল্পগুলো উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে বাস্তবায়নের সুপারিশ করেছিলেন। পরে উপজেলা সমন্বয় কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সেই সুপারিশ থেকে সরে এসে আরএফকিউ পদ্ধতিতে কার্যাদেশ দেওয়া হয়।
প্রকল্পগুলোর মধ্যে রয়েছে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ক্রীড়া সামগ্রী, বই ও বাইসাইকেল বিতরণ, প্রতিবন্ধীদের জন্য হুইলচেয়ার সরবরাহ, বিভিন্ন ইউনিয়নে সৌরবাতি স্থাপন, রাস্তা উন্নয়ন, বৃক্ষরোপণ, স্বাস্থ্যসামগ্রী সরবরাহ এবং একটি সেতু সংস্কারের কাজ। এর মধ্যে পরিবহন ও যোগাযোগ খাতেই রয়েছে ১০টি প্রকল্প। এছাড়া শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বিদ্যুতায়ন, কৃষি, পশুসম্পদ, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও বাজারজাতকরণ খাতেও প্রকল্প অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
উপজেলা প্রকৌশল কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, প্রকল্পগুলোর কার্যাদেশ পেয়েছে কালিদাসপুরের মেসার্স নাসিমা এন্টারপ্রাইজ, হাউসপুরের শম্পা বিল্ডার্স, মেসার্স সাত্তার এন্টারপ্রাইজ এবং ঠিকাদার মো. হাফিজুর রহমান। এর মধ্যে মেসার্স সাত্তার এন্টারপ্রাইজ দুটি, মো. হাফিজুর রহমান দুটি এবং মেসার্স নাসিমা এন্টারপ্রাইজ একটি প্যাকেজের কার্যাদেশ পেয়েছে।
স্থানীয় একাধিক সূত্রের দাবি, ১৮টি প্রকল্পের উল্লেখযোগ্য অংশের কাজ মূলত ছয়জন ঠিকাদারের মধ্যে বণ্টন করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, মো. হাফিজুর রহমান নিজের নামে দুটি প্যাকেজ নেওয়ার পাশাপাশি তাঁর স্ত্রীর মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের নামেও একটি প্যাকেজ নিয়েছেন। এছাড়া অন্য কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের নামে বরাদ্দ পাওয়া কাজও তাঁর তত্ত্বাবধানে বাস্তবায়িত হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। তবে এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাঁর সঙ্গে কথা বলা সম্ভব হয়নি।
এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে স্থানীয় বিএনপির নেতারা অভিযোগ করেছেন, সরকারি ক্রয়বিধি অনুসরণ না করে রাজনৈতিক বিবেচনায় নির্দিষ্ট ব্যক্তিদের মধ্যে প্রকল্পগুলো বণ্টন করা হয়েছে। এর প্রতিবাদে গত সোমবার উপজেলা পরিষদ ও এলজিইডি কার্যালয়ের সামনে বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করেন বিএনপি ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা। পরে তারা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে লিখিত অভিযোগও জমা দেন।
আলমডাঙ্গা উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আমিনুল ইসলাম রোকন অভিযোগ করেন, উপজেলা প্রকৌশলী ও জামায়াতে ইসলামীর কয়েকজন নেতার যোগসাজশে গোপনে দল-সমর্থিত ঠিকাদারদের এসব কাজ দেওয়া হয়েছে। এতে উন্নয়নকাজের স্বচ্ছতা ও গুণগত মান নিয়ে জনমনে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
তবে অভিযোগ অস্বীকার করেছেন উপজেলা জামায়াতে ইসলামীর আমির প্রভাষক শফিউল আলম বকুল। তিনি বলেন, ঠিকাদারদের রাজনৈতিক পরিচয় নয়, কাজের মানই গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর দাবি, উপজেলা প্রকৌশলীর মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদাররা কাজ পেয়েছেন এবং উন্নয়নকাজের গুণগত মান নিশ্চিত করার দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের। তবে কোন পরিস্থিতিতে আরএফকিউ পদ্ধতি ব্যবহার করা যায়—এ বিষয়ে তিনি অবগত নন বলেও জানান।
উপজেলা প্রকৌশলী তাওহীদ আহমেদ বলেন, অর্থবছরের একেবারে শেষ সময়ে বরাদ্দ পাওয়ায় সময়ের সীমাবদ্ধতা ছিল। উপজেলা সমন্বয় কমিটির সিদ্ধান্ত এবং ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা অনুযায়ী আরএফকিউ পদ্ধতিতে কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়েছে। এটি তাঁর ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত ছিল না। তবে এটি সরকারি বিধি অনুযায়ী হয়েছে কি না—এ প্রশ্নের নির্দিষ্ট জবাব তিনি দেননি।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শাহীনুর আক্তার বলেন, প্রকল্প বাস্তবায়নে সরকারি বিধি-বিধান যথাযথভাবে অনুসরণ করা হবে। কোনো প্রকল্পে অনিয়ম বা নিম্নমানের কাজ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট বিল পরিশোধ করা হবে না এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।