ঈদুল আজহায় ৩৯৪ সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ৪০২, আহত ১,২৯৪: যাত্রী কল্যাণ সমিতি
গত বছরের তুলনায় দুর্ঘটনা বেড়েছে ৩.৯৫ শতাংশ, প্রাণহানি ৩.০৭ শতাংশ
ডেইলি সান রিপোর্ট, ঢাকা
প্রকাশ: ০৭ জুন ২০২৬, ০২:১৬ পিএম
পবিত্র ঈদুল আজহাকে কেন্দ্র করে গত ১৫ দিনে সারাদেশে ৩৯৪টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৪০২ জন নিহত এবং ১,২৯৪ জন আহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি। একই সময়ে রেলপথে ৩১টি দুর্ঘটনায় ২৩ জন নিহত ও ৩০ জন আহত এবং নৌপথে ১৭টি দুর্ঘটনায় ১৩ জন নিহত ও ১৬ জন আহত হয়েছেন। সব মিলিয়ে সড়ক, রেল ও নৌপথে ৪৪২টি দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ৪৩৮ জন, আহত হয়েছেন ১,৩৪০ জন।
রবিবার (৭ জুন) সকালে রাজধানীর ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য তুলে ধরেন বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী।
তিনি বলেন, ঈদকে ঘিরে কয়েক দিনের তৎপরতা নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার মাধ্যমে দেশের গণপরিবহন ব্যবস্থা আধুনিকায়ন করা জরুরি। উন্নত বিশ্বের আদলে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বে আধুনিক বাস নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা, প্রযুক্তিনির্ভর সড়ক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা চালু, অদক্ষ চালক ও ফিটনেসবিহীন যানবাহন অপসারণ এবং মহাসড়কে নিরাপত্তা করিডোর প্রতিষ্ঠার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা সবচেয়ে বেশি
সমিতির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ঈদযাত্রা শুরুর দিন ২১ মে থেকে ৪ জুন পর্যন্ত মোট ১৫ দিনে সংঘটিত দুর্ঘটনার মধ্যে ১৫৩টি ছিল মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা। এসব ঘটনায় নিহত হয়েছেন ১৫৯ জন এবং আহত হয়েছেন ১৮০ জন। মোট সড়ক দুর্ঘটনার প্রায় ৩৮.৮৩ শতাংশই মোটরসাইকেলকেন্দ্রিক।
দুর্ঘটনায় নিহতদের মধ্যে ৮০ জন চালক, ৮৯ জন পরিবহন শ্রমিক, ৫৯ জন পথচারী, ৬৪ জন নারী, ৪৫ জন শিশু, ৬৬ জন শিক্ষার্থী, পাঁচজন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য, তিনজন শিক্ষক, একজন চিকিৎসক, তিনজন সাংবাদিক, একজন প্রকৌশলী এবং চারজন রাজনৈতিক কর্মীর পরিচয় শনাক্ত করা হয়েছে।
জাতীয় মহাসড়কেই বেশি দুর্ঘটনা
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, মোট দুর্ঘটনার ৫০.৫০ শতাংশ ঘটেছে জাতীয় মহাসড়কে, ৩০.৭১ শতাংশ আঞ্চলিক মহাসড়কে এবং ১৪.৪৬ শতাংশ ফিডার সড়কে। এছাড়া ২.৫৩ শতাংশ দুর্ঘটনা ঘটেছে ঢাকা মহানগরীতে, ০.২৫ শতাংশ চট্টগ্রাম মহানগরীতে এবং ১.৫২ শতাংশ রেলক্রসিং এলাকায়।
দুর্ঘটনার ধরন বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ৪৬.৪৪ শতাংশ ছিল মুখোমুখি সংঘর্ষ, ২৯.১৮ শতাংশ গাড়িচাপা বা ধাক্কা, ১৭.২৫ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে খাদে পড়ে যাওয়া, ১.৫২ শতাংশ ট্রেন-যানবাহন সংঘর্ষ এবং ৫.৫৮ শতাংশ অন্যান্য কারণে সংঘটিত হয়েছে।
দুর্ঘটনার পেছনে যেসব কারণ
যাত্রী কল্যাণ সমিতির পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, মহাসড়কে মোটরসাইকেল, ব্যাটারিচালিত রিকশা ও অটোরিকশার অবাধ চলাচল, রোড সাইন ও সড়কবাতির অভাব, মিডিয়ান না থাকা, নির্মাণ ত্রুটি, উল্টোপথে যান চলাচল, চাঁদাবাজি, অদক্ষ চালক, ফিটনেসবিহীন যানবাহন এবং বিরামহীনভাবে গাড়ি চালানো দুর্ঘটনার প্রধান কারণ।
এ ছাড়া বর্ষার কারণে মহাসড়কে সৃষ্টি হওয়া গর্ত ও ভাঙাচোরা সড়ক পরিস্থিতিকে আরও ঝুঁকিপূর্ণ করেছে বলে উল্লেখ করা হয়।
১১ দফা সুপারিশ
দুর্ঘটনা কমাতে যাত্রী কল্যাণ সমিতি ১১ দফা সুপারিশ দিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে—
- ঈদযাত্রার জন্য স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রণয়ন।
- আধুনিক বাস নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা।
- প্রযুক্তিনির্ভর সড়ক ব্যবস্থাপনা চালু।
- চালকদের উন্নত প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করা।
- জাতীয় মহাসড়কে সার্ভিস লেন ও ফুটপাত নির্মাণ।
- সড়কে চাঁদাবাজি বন্ধ এবং চালকদের কর্মঘণ্টা নির্ধারণ।
- রোড সাইন ও রোড মার্কিং স্থাপন।
- মানসম্মত সড়ক নির্মাণ ও নিয়মিত নিরাপত্তা নিরীক্ষা।
- ফিটনেস ব্যবস্থা আধুনিকায়ন ও মেয়াদোত্তীর্ণ যানবাহন অপসারণ।
- বিআরটিএর সক্ষমতা বৃদ্ধি।
- পরিবহন খাতে একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ বন্ধ করা।
সংবাদ সম্মেলনে সরকারের সাবেক সচিব ড. এ ওয়াই এম একরামুল হক, সংগঠনের সহসভাপতি মো. মহসিন, যুগ্ম মহাসচিব অর্পনা রায় দাশসহ সংগঠনের অন্যান্য নেতারা উপস্থিত ছিলেন।