প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান
আনসার বাহিনী প্রযুক্তি ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে ভূমিকা রাখছে
ডেইলি সান রিপোর্ট, গাজীপুর
প্রকাশ: ২০ মে ২০২৬, ১১:১৬ এএম
আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর ৪৬তম জাতীয় সমাবেশে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ছবি: সংগৃহীত
বাংলাদেশ আনসার বাহিনী দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি বিভিন্ন প্রযুক্তি এবং দেশে-বিদেশে কর্মসংস্থান তৈরিতে বিশেষ ভূমিকা রাখছে। ভবিষ্যতেও বিশ্বের বিভিন্ন দেশে তারা কর্মসংস্থানের পাশাপাশি দক্ষ জনশক্তি তৈরিতে বিশেষ ভূমিকা রাখবে বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
বুধবার (২০ মে) সকাল ১০টায় গাজীপুরের সফিপুরে অবস্থিত বাংলাদেশ আনসার ও ভিডিপি একাডেমির মিলনায়তনে আয়োজিত আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর ৪৬তম জাতীয় সমাবেশ-২০২৬-এর ব্যুত্থান মহড়া প্রদর্শনী অনুষ্ঠানে যোগ দিয়ে তিনি এসব কথা বলেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, সগৌরবে উদযাপিত হচ্ছে বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর জাতীয় সমাবেশ। একটি সুশৃঙ্খল বাহিনীর জন্য অবশ্যই এটি গৌরবজনক উপলক্ষ।
এ সময় তিনি বাহিনীর সকল পর্যায়ের কর্মকর্তা, সদস্য এবং তৃণমূলের আনসার-ভিডিপি সদস্য-সদস্যাদের অভিনন্দন ও শুভেচ্ছা জানান।
তিনি মহান মুক্তিযুদ্ধে আনসার বাহিনীর অবদানের কথা স্মরণ করে বলেন, প্রায় ৪০ হাজার রাইফেল নিয়ে আনসার সদস্যরা স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন এবং ৬৭০ জন সদস্য শহীদ হন। তিনি তাঁদের আত্মত্যাগের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে মাগফিরাত কামনা করেন।
তারেক রহমান বলেন, স্বাধীনতাত্তোর বাংলাদেশে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির প্রেক্ষাপটে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান গ্রাম ও নগরপর্যায়ে শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষা এবং সামাজিক নিরাপত্তা জোরদারে আনসার ও ভিডিপি বাহিনীকে আরও শক্তিশালী ও কার্যকর করার উদ্যোগ নেন। তাঁর দূরদর্শী পদক্ষেপই আনসার ও ভিডিপিকে বর্তমান বহুমাত্রিক ও জনসম্পৃক্ত বাহিনীতে রূপ দিয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
তিনি আরও বলেন, ১৯৯৫ সালে খালেদা জিয়া সরকারের সময় আনসার-ভিডিপি আইন প্রণয়নের মাধ্যমে এই বাহিনীকে একটি স্বতন্ত্র শৃঙ্খলা বাহিনীর মর্যাদা দেওয়া হয়, যা বাহিনীর প্রাতিষ্ঠানিক বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী সংকটময় পরিস্থিতিতে থানা পাহারা, ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা এবং গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় নিরাপত্তা নিশ্চিতে আনসার ও ভিডিপি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। পাশাপাশি সামাজিক সচেতনতা সৃষ্টি, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা এবং প্রযুক্তিনির্ভর সেবায়ও বাহিনীটি সক্রিয় রয়েছে।
তিনি বলেন, দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা রক্ষায় আনসার-ভিডিপির দীর্ঘ অভিজ্ঞতা রয়েছে। বাহিনীর ভবিষ্যৎ কার্যক্রমকে আরও গতিশীল করতে সুস্পষ্ট ভিশন ও কর্মপরিকল্পনার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
সুশৃঙ্খল বাহিনীর জন্য ‘চেইন অব কমান্ড’ ও ‘ডিসিপ্লিন’ অনুসরণের গুরুত্ব তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, শৃঙ্খলার সামান্য ঘাটতিও জনমনে আস্থার সংকট তৈরি করতে পারে। তাই এ বিষয়ে সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে।
তিনি বলেন, ব্যাটালিয়ন আনসার, অঙ্গীভূত আনসার, থানা বা উপজেলা আনসার এবং ভিডিপি-টিডিপি—এই চারটি স্তম্ভ সমন্বিতভাবে দেশের নিরাপত্তা ও তৃণমূলের আর্থসামাজিক উন্নয়নে কাজ করছে। বর্তমানে ৪৭টি আনসার ব্যাটালিয়নের মধ্যে ১৬টি পার্বত্য চট্টগ্রামে নিয়োজিত রয়েছে।
তারেক রহমান জানান, ৫২ হাজার অঙ্গীভূত আনসার সদস্য দেশের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা, সরকারি দপ্তর, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, শিল্পকারখানা ও বিদ্যুৎকেন্দ্রে নিরাপত্তা নিশ্চিত করছেন। এছাড়া ১৩ হাজারের বেশি হিল আনসার ও হিল ভিডিপি সদস্য বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে সম্প্রীতি ও আস্থা বৃদ্ধিতে কাজ করছেন।
তিনি বলেন, ইউনিয়ন পর্যায়ে পুরুষ ও মহিলা ভিডিপি প্লাটুন বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ, নারী নির্যাতন মোকাবিলা ও মাদকবিরোধী কার্যক্রমে অংশ নিচ্ছে। নগর এলাকায় টিডিপি সদস্যরাও নিরাপত্তা জোরদারে ভূমিকা রাখছেন। ফলে বাহিনীটি কেবল নিরাপত্তা নয়, সামাজিক পরিবর্তনের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, প্রযুক্তিগত দক্ষতা বৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে আনসার-ভিডিপির বিভিন্ন উদ্যোগ ইতিবাচক ফল দিচ্ছে। ‘সঞ্জীবন প্রকল্প’, আনসার-ভিডিপি উন্নয়ন ব্যাংক, ওয়েলফেয়ার ট্রাস্ট, কারিগরি ও ফ্রিল্যান্সিং প্রশিক্ষণের মাধ্যমে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, AVJOBS (Ansar & VDP Job Portal) সফটওয়্যার এবং AI application ব্যবহার করে দেশীয় ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরির উদ্যোগ সময়োপযোগী। একই সঙ্গে আনসার ওয়েলফেয়ার ট্রাস্টের মাধ্যমে বিদেশে কর্মসংস্থানের উদ্যোগ সদস্যদের জন্য নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দেবে।
মানবসম্পদ উন্নয়নের অংশ হিসেবে জাপানি ভাষা, ফ্রিল্যান্সিং, ডিজিটাল মার্কেটিং ও 6G ওয়েল্ডিংসহ আধুনিক প্রশিক্ষণ কার্যক্রমের প্রশংসা করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, এসব উদ্যোগ দেশের দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলার কৌশলগত লক্ষ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় আনসার-ভিডিপিকে একটি নির্ভরযোগ্য “First Responder” বাহিনী হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, বন্যা ও অগ্নিকাণ্ডসহ বিভিন্ন দুর্যোগে তাদের সাহসিকতা ও মানবিক দায়বদ্ধতা প্রশংসনীয়। পাশাপাশি রেইন ওয়াটার হারভেস্টিং, সোলার প্যানেল ও বায়োগ্যাস প্লান্ট স্থাপনের মতো পরিবেশবান্ধব উদ্যোগও বাহিনীর ইতিবাচক অগ্রযাত্রার অংশ।
ক্রীড়া ক্ষেত্রে আনসার-ভিডিপির সাফল্যের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ৫ম, ৬ষ্ঠ ও ৭ম বাংলাদেশ গেমসে টানা তিনবার চ্যাম্পিয়ন হওয়ায় বাহিনীটি ২০০৪ সালে স্বাধীনতা পদক অর্জন করে। বর্তমানে দেশের ১০টি ক্রিকেট স্টেডিয়ামে নিরাপত্তা নিশ্চিতে ৩৭৯ জন অঙ্গীভূত আনসার সদস্য মোতায়েন রয়েছে বলেও জানান তিনি।
তিনি বলেন, খেলাধুলাকে পেশা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে সরকার বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে এবং আনসার-ভিডিপির ১৫ জন ক্রীড়াবিদকে স্পোর্টস কার্ড প্রদান করা হয়েছে।
আনসার ও ভিডিপি বাহিনীর কাঠামোগত উন্নয়নের অংশ হিসেবে বিভিন্ন বিধিমালার খসড়া চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, উপজেলা পর্যায়ে কার্যক্রম আরও শক্তিশালী করতে নতুন প্রবিধানমালা প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি সদর দপ্তরে বায়োমেট্রিক উপস্থিতি ব্যবস্থা চালুর মাধ্যমে প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা হচ্ছে।
শেষে তিনি আশা প্রকাশ করে বলেন, সদস্যদের নিষ্ঠা, শৃঙ্খলা, পেশাদারিত্ব ও দেশপ্রেমের মাধ্যমে বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনী ভবিষ্যতে “প্রযুক্তিনির্ভর মানবিক সামাজিক বাহিনী” হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবে।
-6a0d3d19ca6e9.jpg)