বগুড়ায় ব্যবসায়ীদের দখলে ফুটপাত ও সড়ক
জেলা প্রশাসন, পুলিশ ও সিটি কর্পোরেশনের বিরুদ্ধে অবহেলার অভিযোগ
টি. এম. মামুন, বগুড়া
প্রকাশ: ১৯ মে ২০২৬, ০৭:০৯ পিএম
বগুড়া নগরীর রাস্তা ও ফুটপাতে ফলের দোকান বসানো হয়েছে। ছবি: টি. এম. মামুন
প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী নগরী বগুড়া এখন অবৈধ দখলে পরিণত হয়েছে। স্থায়ী ও ভ্রাম্যমাণ ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে অটোচালক ও মোটরসাইকেল মেকানিক্স—সকলেই অবৈধভাবে দখলে নিয়েছে শহরের সবগুলো ফুটপাত ও সড়কের বড় একটি অংশ। দখলকারীদের বাধার মুখে ফুটপাত ব্যবহার করতে না পেরে সড়কে নেমে হাঁটতে গিয়ে প্রতিদিনই আহত হচ্ছেন অসংখ্য নারী ও শিশু শিক্ষার্থীসহ অন্যান্য পথচারী। জনভোগান্তি রোধে দায়িত্বে অবহেলার জোরালো অভিযোগ উঠেছে জেলা ও পৌর প্রশাসন (বর্তমান সিটি কর্পোরেশন) এবং পুলিশ বিভাগের বিরুদ্ধে। পৃথক এই তিনটি সংস্থাই একে অপরের বিরুদ্ধে অসহযোগিতার অভিযোগ করছে। সব মিলিয়ে তিন বিভাগের ঈদুর-ইঁদুর খেলায় ভোগান্তি ও কষ্টের শিকার হচ্ছেন সাধারণ জনসাধারণ।
সূত্র দাবি করে, জেলা শহরের জিরো পয়েন্ট সাতমাথা ও এর আশপাশ মিলিয়ে মাত্র দুই বর্গকিলোমিটার এলাকা জুড়ে প্রতিদিন ব্যবসা করছেন প্রায় ১ হাজার ১০০ প্রভাবশালী দোকানী। তবে বিষয়টি নিয়ে ফুটপাত ও সড়কে অবৈধ ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলতে গেলেই অপমান ও লাঞ্ছিত হতে হয়েছে পথচারীদের। ব্যবসায়ীদের কথা শুনে সহজেই অনুমান করা যায়, এদের পেছনে প্রশাসনের যে কোনো অংশের শক্তিশালী বেআইনি হস্তক্ষেপ রয়েছে। যার কারণে ক্রমেই বাড়ছে এ ধরনের দোকানের সংখ্যা।
জুলাই আন্দোলনের আগে তৎকালীন পুলিশ সুপার সুদীপ কুমার (বর্তমানে একাধিক মামলায় কারাগারে) খুন আর চাঁদাবাজীর নগরে পরিণত করে গেছেন বগুড়াকে। জুলাই পরবর্তী সময়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হলেও ট্রাফিক ব্যবস্থা ও ফুটপাতসহ সড়কের অবৈধ দখল ব্যবসা ততটা কমেনি। এমনকি ভ্রাম্যমাণ ব্যবসায়ীদের কবল থেকে রেহাই পাচ্ছে না আদালত প্রাঙ্গণও। আদালত পাড়াতেও চলছে অস্থায়ী দোকানীদের বেআইনি ব্যবসা। আদালত এলাকায় ব্যবসায়ীদের কাছেই রয়েছে নানারকম ছুরি ও কাঁচি, যা নিশ্চিতভাবে নিরাপত্তা ঝুঁকি বাড়িয়েছে বিচারপ্রার্থী থেকে শুরু করে বিচারকদের জন্য। আদালত পাড়ায় নিরাপত্তা, যানজট ও বেআইনি ব্যবসা নিয়ে কোনো পদক্ষেপ নিতে দেখা যায়নি আদালতে দায়িত্বপ্রাপ্ত পুলিশ পরিদর্শকে (কোর্ট ইন্সপেক্টর)।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, অবৈধ ফুটপাত ও সড়ক দখলদার ব্যবসায়ীরা দোকানপ্রতি প্রতিদিন চাঁদা দেন ১০০ টাকা থেকে ২৫০ টাকা পর্যন্ত। পৌর পুলিশ আদায় করে ব্যবসায়ী ভেদে ২০ থেকে ৫০ টাকা, সদর পুলিশ ফাঁড়ি ও ট্রাফিক আদায় করে ৫০ থেকে ১০০ টাকা এবং উভয়ের মধ্যে সমন্বয়কারী হিসেবে চিহ্নিত একটি অংশ আদায় করে ৫০ থেকে ১০০ টাকা। অর্থাৎ ফুটপাত ও সড়ক দখল করা একজন ব্যবসায়ীকে প্রতিদিন চাঁদা দিতে হচ্ছে সর্বনিম্ন ১০০ টাকা থেকে ২৫০ টাকা পর্যন্ত। এর মধ্যে কিছু দোকান সারাদিনের জন্য বসে এবং কিছু দোকান দুপুর ও বিকেল থেকে রাত ১২টা পর্যন্ত চালু থাকে।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ভ্রাম্যমাণ কাপড়ের দোকান রয়েছে ১ হাজার ১০০টি, ফলের দোকান রয়েছে প্রায় ২৫০টি, চটপটি ও ফুচকাসহ মুখরোচক খাবারের দোকান রয়েছে প্রায় ৩০টি, চায়ের দোকান রয়েছে ২৫টি, ডাবের দোকান রয়েছে ২০টি, কাঁচা শাক-সবজি-মাংসের দোকান রয়েছে ১৫টি এবং সার্কিট হাউজ ও আদালত এলাকায় ফাস্ট ফুডের দোকান রয়েছে প্রায় ৩৫টি। গণমাধ্যমে সমালোচনা এড়াতে হঠাৎ কখনো অভিযান চালানো হলেও কার্যকরী পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। যানজটসহ ফুটপাত ও অবৈধ সড়ক দখল বিষয়ে পরস্পরবিরোধী বক্তব্য পাওয়া গেছে জেলা ও পৌর প্রশাসনসহ পুলিশ বিভাগের মধ্যে।
বগুড়া ট্রাফিক পুলিশের ইনচার্জ (ইন্সপেক্টর) মো. সালেকুজ্জামানের দাবি, তিনি যানজট নিরসনে সর্বোচ্চ চেষ্টা করছেন। কিন্তু পৌর কর্তৃপক্ষ এবং জেলা প্রশাসনের আশানুরূপ আগ্রহ নেই। তার ভাষায়, পৌরসভার কোনো অভিভাবক নেই, নাগরিক সেবায় তেমন কোনো কাজ দৃশ্যমান নয়। জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটরা জনভোগান্তি রোধে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনায় ততটা উৎসাহী নন। যে কারণে পুলিশ একবেলা অবৈধ ব্যবসায়ীদের ফুটপাত ও সড়ক থেকে সরিয়ে দিলেও পরক্ষণেই তারা আবার ফিরে আসে। বগুড়া পৌরসভার বাজার পরিদর্শক আব্দুল হাই জানান, অভিযান চলমান রয়েছে, তবে সকলের সহযোগিতা প্রয়োজন।
সরকারি চাকরিজীবী এনামুল হক, আইনজীবী অ্যাডভোকেট বজলুর রশীদ, শিক্ষক শাহাদৎ হোসেন, ব্যবসায়ী রবিউল হাসানসহ নবাববাড়ী, গোহাইল রোড ও মফিজ পাগলার মোড় এলাকার কয়েকজন জানান, প্রশাসন এমন একটি ফুটপাত দেখাতে পারবে না, যেটা অবৈধ ব্যবসায়ীদের দখলে নেই। স্টেশন রোড, থানা রোড, টেম্পল রোড, গোহাইল রোড (পার্ক রোড), নবাববাড়ী রোড, জিলা স্কুল রোড, সার্কিট হাউজ রোডের শতাধিক দোকান ছাড়াও মফিজ পাগলার মোড়, শান্ত হেলমেট কালেকশন থেকে শুরু করে সিয়াম হোটেলের দক্ষিণে হক মটরস পর্যন্ত দোকানগুলো পুলিশ ও প্রশাসনকে মাসিক মোটা অংকের চাঁদা দিয়ে বেআইনিভাবে ইজারা দিয়েছেন। পৃথক তিনটি সংস্থা সকল বিভাগের সমন্বয়ের কথা বলে ঈদুর-ইঁদুর খেলা খেলছে।

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) বগুড়া জেলা শাখার সভাপতি অধ্যক্ষ সাহাবুদ্দিন সৈকত, সাধারণ সম্পাদক জিয়াউর রহমান এবং সুশাসনের জন্য প্রচারাভিযান (সুপ্র) এর সম্পাদক কেজিএম ফারুক জানান, ফুটপাত ও সড়ক দখল করা ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ গ্রহণে জেলা ও পৌর প্রশাসনসহ পুলিশ বিভাগের আন্তরিকতার কোনো প্রমাণ মিলছে না। শুধু তাই নয়, সমন্বয়ের দোহাই দিয়ে তারা একে অপরকে অদক্ষ ও দায়িত্বহীনতার পরিচয় দিয়ে যাচ্ছেন।
বগুড়ার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ট্রাফিক ও মিডিয়া) আতোয়ার রহমান জানান, যে কোনো বেআইনি কাজের সঙ্গে কোনো পুলিশ সদস্যের জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়া মাত্রই তার বিরুদ্ধে আইনগত কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।
জেলার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) মো. মাসুদ হোসেন জানান, এ বিষয়ে তার কোনো ব্যক্তিগত মতামত দেওয়ার সুযোগ নেই। তবে জেলা আইনশৃঙ্খলা ও সমন্বয় সভায় এ বিষয়ে বেশ কিছু মতামত ও সিদ্ধান্ত এসেছে। বগুড়া শহরকে সুন্দর ও পরিচ্ছন্ন করতে গেলে জেলা প্রশাসন, পুলিশ বিভাগ, সওক বিভাগ ও সিটি কর্পোরেশনসহ সকল বিভাগের সমন্বিত পরিকল্পনার প্রয়োজন রয়েছে। চাইলেই সব ক্ষেত্রে ভ্রাম্যমাণ আদালত (মোবাইল কোর্ট) করা সম্ভব না। অভিযান অব্যাহত রয়েছে, একই স্থানে একবার ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করলে পরবর্তীতে সেখানে নিয়মিত মামলা করতে হয়। তাছাড়া অনেক ক্ষেত্রে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করার সময় অপরাধীদের ‘বিশেষ পরিচয়’ বহন কাজের বিঘ্ন ঘটায়।
অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) ইমরুল কায়েস দাবি করেন, আমাদের নিজ নিজ অবস্থান থেকে সবাইকে সচেতন এবং আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে হবে। পুলিশ চাইলেই ফুটপাত ও সড়ক অবৈধ দখলমুক্ত করতে পারে। প্রচলিত আইনে পুলিশের নির্দিষ্ট পরিমাণ আর্থিক জরিমানা করার সুযোগ রয়েছে, এটুকু করলেই জনভোগান্তি অনেকটাই কমতে পারে।