EN ☀️
×

Follow Us

বাংলাদেশ

দুই বছর অনুপস্থিত থেকেও বেতন তুলছেন অধ্যক্ষ

ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ আবুল হোসেন বলেন, ‘ইউএনও মহোদয়ের নির্দেশে আমি বেতনের কাগজে সই করি। সরকার তাকে বেতন দিচ্ছেন, তাই আমিও বাধ্য হয়ে দিচ্ছি।’

ডেইলি সান রিপোর্ট, লালমনিরহাট

প্রকাশ: ২৬ এপ্রিল ২০২৬, ১০:০০ পিএম

দুই বছর অনুপস্থিত থেকেও বেতন তুলছেন অধ্যক্ষ

ছবি: সংগৃহীত

অ অ

লালমনিরহাটের আদিতমারী উপজেলার মহিষখোচা বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজের অধ্যক্ষ এবং জেলা আওয়ামী লীগের শিক্ষা ও গবেষণাবিষয়ক সম্পাদক শরওয়ার আলম টানা প্রায় দুই বছর প্রতিষ্ঠানে অনুপস্থিত থেকেও পূর্ণ বেতন-ভাতা পাচ্ছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। এ নিয়ে জেলাজুড়ে ব্যাপক সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে।

জানা যায়, শরওয়ার আলম ১৯৯৭ সালের ১৮ অক্টোবর জালিয়াতির মাধ্যমে তিনটি বিষয়ে তৃতীয় বিভাগ নিয়েও ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিষয়ের প্রভাষক পদে নিয়োগ পান। পরে প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষ অবসর নিলে দলীয় প্রভাবে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের দায়িত্ব নেন তিনি। এরপর পূর্বপদে ইস্তফা না দিয়ে এবং ১২ বছরের স্থলে মাত্র ১০ বছরের অভিজ্ঞতায় ২০১২ সালের ১৯ জানুয়ারি অধ্যক্ষ পদ বাগিয়ে নেন।

২০২৪ সালের জুলাই মাসে আওয়ামী লীগবিরোধী আন্দোলন শুরু হলে তিনি প্রতিষ্ঠানে আসা বন্ধ করে দেন। জুলাই আন্দোলনের হত্যা মামলার আসামি এই অধ্যক্ষ এরপর থেকে আজ পর্যন্ত হাজিরা খাতায় অনুপস্থিত।

২০২৪ সালের ২৮ আগস্ট শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা তার নিয়োগ জালিয়াতির প্রমাণসহ আদিতমারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বরাবর লিখিত অভিযোগ করেন। তদন্ত কমিটি গঠিত হলে সত্যতা পেয়ে আইনগত ব্যবস্থার সুপারিশ করা হয়। এর প্রেক্ষিতে তৎকালীন ইউএনও নুর ই আলম সিদ্দিকী তাকে সাময়িক বরখাস্ত করেন। তবে তিন মাস পর ওই আদেশ বাতিল হলে পুনরায় পূর্ণ বেতন পেতে শুরু করেন তিনি। অভিযোগ উঠেছে, বেতনের একটি বড় অংশ কর্তৃপক্ষকে উৎকোচ দিয়ে এই সুবিধা নিচ্ছেন পলাতক এই অধ্যক্ষ।

তার অনুপস্থিতিতে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন সহকারী অধ্যাপক আবুল হোসেন। তবে তার বিরুদ্ধেও প্রতিষ্ঠানের ইট-খোয়া নিজ বাড়িতে পাচার, ফ্যান চুরির মামলা আপসের নামে অর্ধলাখ টাকা আত্মসাৎ এবং প্রতিষ্ঠানে অনিয়মিত থাকার অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া সমাজকর্মের সহকারী অধ্যাপক আবু হেনা মোস্তফা জামান- যিনি ৪ বছরের সাজাপ্রাপ্ত ও বর্তমানে গ্রেপ্তার- তাকেও ৭ বছর অনুপস্থিত থেকে বেতন দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

শিক্ষার্থী মাজেদুল বলেন, অধ্যক্ষ শরওয়ার আলম জুলাই আন্দোলন থেকে প্রতিষ্ঠানে আসেন না। পুকুর পাড় নির্মাণের নামে ১৩ লাখ টাকা আত্মসাৎ করে পালিয়েছেন। তিনি না এসে বেতন পাওয়ায় বাকি শিক্ষকদের অনেকেই না এসে বেতন তুলতে শুরু করেছেন। এখন দু’একটি ক্লাস ছাড়া ক্লাস হচ্ছে না। 

অভিভাবক নজরুল ইসলাম বলেন, কেউ না এসে বেতন পাচ্ছেন আর একজন ভারপ্রাপ্ত দায়িত্ব পেয়ে প্রতিষ্ঠানের পরিত্যক্ত ভবনের বারান্দার ইট খোয়া বাড়িতে নিয়েছেন। চুরির মামলা আপসের নামে টাকা নিয়ে আত্মসাৎ করেছেন। সবাই আত্মসাৎ নিয়ে ব্যস্ত, পড়ালেখার দিকে কারও নজর নেই। ঐতিহ্যবাহী এ প্রতিষ্ঠানটি নষ্টের দ্বার প্রান্তে। 

কলেজের সহকারী অধ্যাপক এটিএম আতাউর রহমান বলেন, টানা প্রায় দুই বছর অনুপস্থিত থেকেও রহস্যজনকভাবে বেতন ভাতা পাচ্ছেন তিনি। তাকে দেখে অনেকেই এখন এ প্রতিষ্ঠানে অনিয়মিত। যে যার মতো আসেন আর চলে যান। ফলে শিক্ষার্থীদের পাঠদান ব্যাহত হচ্ছে। শুনেছি, পলাতক অধ্যক্ষ পুনরায় যোগদানের চেষ্টা করছেন। 

ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ আবুল হোসেন নিজের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ অস্বীকার করে সাংবাদিকদের বলেন, ‘ইউএনও মহোদয়ের নির্দেশে আমি বেতনের কাগজে সই করি। সরকার তাকে বেতন দিচ্ছেন, তাই আমিও বাধ্য হয়ে দিচ্ছি।’

প্রতিষ্ঠানটির পরিচালনা কমিটির সভাপতি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) বিধান কান্তি হালদার বলেন, ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ বেতন ভাতার সিট প্রস্তুত করে দেন, আমি অনুমোদন করি মাত্র। এতে কোনো ধরনের লেনদেনের সুযোগ নেই। তিনি যদি ভারপ্রাপ্ত দায়িত্বে পালনে অনিচ্ছুক হন তবে লিখিত জানালে আমরা অন্য কাউকে দায়িত্ব দিব। পলাতক অধ্যক্ষ পুনরায় যোগদান করতে একটি লিখিত আবেদন করেছেন। আমরা তা খতিয়ে দেখে ব্যবস্থা নিব।

অধ্যক্ষ শরওয়ার আলম প্রতিষ্ঠানে দুই বছর অনুপস্থিত থেকেও বেতন ভাতাসহ সকল সুবিধা ভোগ করায় বর্তমান ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষসহ প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষক কর্মচারীরা অনেকেই অনিয়মিত। যার কারণে ঐতিহ্যবাহী এ প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার পরিবেশ মুখ থুবড়ে পড়ছে। পরিবেশ ফেরাতে কঠোর নজরদারিসহ ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি শিক্ষার্থী, অভিভাবকসহ স্থানীয়দের।

আরও পড়ুন