EN ☀️
×

Follow Us

বাংলাদেশ

লোডশেডিং চলবে কতদিন?

৩২ হাজার মেগাওয়াট সক্ষমতা থাকতেও উৎপাদন মাত্র ১৪ হাজার

ডেইলি সান রিপোর্ট

প্রকাশ: ২৪ এপ্রিল ২০২৬, ০৯:০২ পিএম

লোডশেডিং চলবে কতদিন?

ছবি: সংগৃহীত

অ অ

গরমের দাবদাহের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে লোডশেডিংয়ের কষ্ট। শহর থেকে গ্রাম- দেশের কোথাও স্বস্তি নেই। দিনে পাঁচ থেকে ছয় ঘণ্টা, গ্রামাঞ্চলে সাত থেকে আট ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ থাকছে না। রাতেও রেহাই নেই। ঘুমের মধ্যে বারবার বিদ্যুৎ বিভ্রাটে অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছেন সাধারণ মানুষ।

চট্টগ্রামের বাসিন্দা নয়ন বড়ুয়া জানান, গভীর রাতেও দুই-তিনবার বিদ্যুৎ যাচ্ছে এবং একবার গেলে দেড় থেকে দুই ঘণ্টার আগে ফিরছে না। তাঁর দাবি, চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকায় প্রতিদিন ছয় থেকে সাত ঘণ্টা লোডশেডিং হচ্ছে।

নেত্রকোনার কলমাকান্দার বাসিন্দা পলাশ তালুকদার বলেন, ‘এসএসসি পরীক্ষার মধ্যে এমনিতেই তীব্র গরম, আর সাথে কারেন্ট (বিদ্যুৎ) নাই, সব মিলিয়ে খুবই বাজে অবস্থা।’

চাঁপাইনবাবগঞ্জের স্থানীয় গণমাধ্যমকর্মী মোহাম্মদ আসাদ জানান, ‘সকাল থেকে দুইবার বিদ্যুৎ যায় অন্তত আধা ঘণ্টা করে। দুপুর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত তিনবার যায় আরও আধা ঘণ্টা করে। আর সন্ধ্যার পর থেকে ভোর পর্যন্ত তিন থেকে চারবার যায় অন্তত এক ঘণ্টা করে।’

মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে জ্বালানি সংকট শুরু হওয়ার পর থেকেই দেশে লোডশেডিং একটু একটু করে বেড়েছে। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে বিদ্যুৎ বিভ্রাট শুরু হয়েছে আরও আগে থেকেই। কিন্তু গত তিনদিনে গ্রাম-শহর নির্বিশেষে সারা দেশে লোডশেডিং বেড়েছে বলেই তথ্য মিলছে।

মূলত, গরমের কারণে বিদ্যুতের চাহিদা বৃদ্ধি এবং বেশ কয়েকটি বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রের ইউনিটে কারিগরি ত্রুটির কারণে উৎপাদন বন্ধ থাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ কমেছে।

বিদ্যুৎ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, সারাদেশে চাহিদা বাড়লেও বিদ্যুৎ উৎপাদনের ঘাটতি থাকায় গত বুধ ও বৃহস্পতিবার দুই হাজার মেগাওয়াটের বেশি লোডশেডিং দিতে হয়েছে।

এমনকি বিদ্যুৎ উৎপাদনে ঘাটতি তৈরি হওয়ায় বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকায় প্রতিদিন অন্তত ১১০ মেগাওয়াট লোডশেডিং দেওয়ার সিদ্ধান্ত বৃহস্পতিবার সংসদে জানিয়েছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত।

যদিও, দুটি বিদ্যুৎ কেন্দ্রের বন্ধ হয়ে যাওয়া ইউনিট চালু এবং আদানির বিদ্যুৎ সরবরাহ ঠিক হলে সপ্তাহখানেকের মধ্যে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে পারে বলে জানিয়েছেন বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী।

‘আদানি পাওয়ার প্ল্যান্ট আমাদের যা সাপ্লাই করতো তাদের একটি ইউনিটে সমস্যা হওয়ায় এখন অর্ধেক দিতে পারছে। বাঁশখালির এসএস পাওয়ারের ক্ষেত্রেও একই অবস্থা। তাদের সবার সঙ্গে আমরা কথা বলেছি। আশা করছি সপ্তাহ খানেকের মধ্যে পরিস্থিতির উন্নতি হবে,’ বলেন তিনি।

বাংলাদেশ পাওয়ার গ্রিড কোম্পানির সবশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, বুধবার দেশে বিদ্যুতের সর্বোচ্চ চাহিদা ছিল ১৬ হাজার ৬৪৭ মেগাওয়াট। যার বিপরীতে ওই দিন বিদ্যুৎ উৎপাদনের সর্বোচ্চ পরিমাণ ১৪ হাজার ৪৬৭ মেগাওয়াট। অর্থাৎ সরবরাহ ঘাটতি থাকায় সারাদেশে লোডশেডিং দিতে হয়েছে দুই হাজার মেগাওয়াটের বেশি।

চাহিদা এবং সরবরাহের হিসেবে বৃহস্পতিবারও তিন হাজার মেগাওয়াটের কাছাকাছি লোডশেডিংয়ের তথ্য জানিয়েছে বিদ্যুৎ বিভাগ।

বাংলাদেশ পাওয়ার গ্রিড কোম্পানির অঞ্চলভিত্তিক তথ্য অনুযায়ী, ঢাকা জোনে সব থেকে বেশি ছয় হাজার ১৭ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে ৪৫০ মেগাওয়াট লোডশেডিং দেওয়া হয়েছে।

খুলনা জোনে এক হাজার ৯৭৭ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে ৩৮০ মেগাওয়াট, চট্টগ্রামে এক হাজার ৫৮৮ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে ২৫০ মেগাওয়াট, রাজশাহী জোনে এক হাজার ৮০৮ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে ২৮০ মেগাওয়াট লোডশেডিং দেওয়া হয়েছে।

এছাড়া কুমিল্লা জোনে এক হাজার ৫৭৫ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে ২২০ মেগাওয়াট, ময়মনসিংহে এক হাজার ৭০ মেগাওয়াটের বিপরীতে ১৮০ মেগাওয়াট, সিলেটে ৫৭৬ মেগাওয়াটের বিপরীতে ১০০ মেগাওয়াট, বরিশালে ৪৬৮ মেগাওয়াটের বিপরীতে ৬০ মেগাওয়াট এবং রংপুরে এক হাজার দুই মেগাওয়াটের বিপরীতে ১৬৬ মেগাওয়াট লোডশেডিং হয়েছে।

বিদ্যুৎ উৎপাদনে ঘাটতি কেন?

জ্বালানি সংকট শুরু হওয়ার পর থেকেই দেশজুড়ে ধাপে ধাপে লোডশেডিং বেড়েছে। গরমের তীব্রতা বৃদ্ধি আর একাধিক পাওয়ার প্লান্টের ইউনিটে কারিগরি জটিলতা তৈরি হওয়ায় সম্প্রতি পরিস্থিতি আরও অবনতি হয়েছে।

সরকারি তথ্য অনুযায়ী, কাগজেকলমে দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনের মোট সক্ষমতা ৩২ হাজার ৩৩২ মেগাওয়াট। যার মধ্যে গ্রিডভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ২৮ হাজার ৯১৯ মেগাওয়াট।

কিন্তু এখন পর্যন্ত বাংলাদেশে একদিকে সর্বোচ্চ ১৬ হাজার মেগাওয়াটের কিছু বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব হয়েছে। এছাড়া ভারতের আদানি পাওয়ারের সঙ্গেও ১৬শ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আমদানির চুক্তি রয়েছে বাংলাদেশের।

তাহলে এত উৎপাদন সক্ষমতা থাকার পরও বিদ্যুৎ নিয়ে এই বেহাল দশা কেন?

বিদ্যুৎ বিভাগ বলছে, বাংলাদেশের বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো মূলত গ্যাস ও কয়লা নির্ভর হওয়ায় জ্বালানি সংকটে বর্তমানে দৈনিক বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে ১৪ হাজার মেগাওয়াটের আশপাশে।

এছাড়া আদানির একটি বিদ্যুৎ ইউনিটে কারিগরি সমস্যা তৈরি হওয়ায় সব মিলিয়ে সংকট দেখা দিয়েছে বলেও জানান বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব উম্মে রেহানা।

‘আমাদের বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা অনেক, কিন্তু পর্যাপ্ত জ্বালানি সরবরাহ না হওয়ায় বিদ্যুৎ উৎপাদনে ঘাটতি তৈরি হয়েছে,’ বলেন তিনি।

বাংলাদেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ বলেই মনে করেন জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, জ্বালানির চিন্তা না করে কেবল বিদ্যুৎকেন্দ্র তৈরি ও উৎপাদন সক্ষমতা বাড়িয়েছে বাংলাদেশ।

যারা ফলে যখনই জ্বালানির ঘাটতি হয়েছে, তখনই বিদ্যুৎ নিয়ে এই জটিলতা তৈরি হয়েছে বলে মনে করেন জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. ইজাজ হোসেন।

‘আপনার গাড়ি আছে কিন্তু গাড়ি চালানোর তেল নেই, বাংলাদেশের বিদ্যুৎ সেক্টরের বর্তমান অবস্থা ঠিক এমন,’ বলেন তিনি।

লোডশেডিং চলবে কতদিন

তীব্র গরমে লোডশেডিং বেড়ে যাওয়ায় চরম দুর্ভোগে পড়েছেন সাধারণ মানুষ। শিল্প উৎপাদন এবং কৃষি উৎপাদনেও এর বিরূপ প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। 

আর তাই বিদ্যুৎ নিয়ে এমন পরিস্থিতি আরও কতদিন চলবে এই প্রশ্নই এখন ঘুরেফিরে সামনে আসছে। পরিস্থিতি পুরো ঠিক না হলেও খুব শিগগিরই সহনীয় পর্যায়ে আসবে বলেই মনে করছে বিদ্যুৎ বিভাগ।

তারা বলছে, ২৬ এপ্রিল থেকে আদানি পাওয়ারের আমদানিকৃত বিদ্যুৎ আবারও পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এছাড়া বাঁশখালির এসএস পাওয়ারের আইপিপি প্ল্যান্ট থেকে ৬৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ ২৮শে এপ্রিল থেকে স্বাভাবিক হতে পারে।

‘২৮ এপ্রিল থেকে প্রায় তেরশ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আমরা পাবো, যাতে সংকট খানিকটা কমবে। এছাড়া জ্বালানি সংকটে আরএনপিএন এর বন্ধ ইউনিটটি চালু হলে সব মিলিয়ে মে মাসের প্রথম সপ্তাহে প্রায় দুই হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ দেওয়া সম্ভব হবে,’ বলে জানান যুগ্ম সচিব উম্মে রেহানা।

এক সপ্তাহের মধ্যে বিদ্যুৎ সরবরাহ পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হয়ে আসতে পারে বলে মনে করেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত।

তিনি বলেন, ‘আদানি পাওয়ার প্ল্যান্ট আমাদেরকে যা সাপ্লাই করতো তাদের একটি ইউনিটে সমস্যা হওয়ায় এখন অর্ধেক দিতে পারছে, বাঁশখালির এসএস পাওয়ারের ক্ষেত্রেও একই অবস্থা। তাদের সবার সঙ্গে আমরা কথা বলেছি, আশা করছি সপ্তাহ খানেকের মধ্যে পরিস্থিতির উন্নতি হবে।’

তবে, মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতি চলমান থাকলে এবং বাংলাদেশে জ্বালানি সংকটের এই প্রেক্ষাপট ঠিক না হওয়া পর্যন্ত লোডশেডিং সহ্য করেই চলতে হবে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞদের অনেকে।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ইজাজ হোসেন বলছেন, প্রায় ছয় থেকে সাত হাজার মেগাওয়াটের তেলভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো সচল করে এই মুহূর্তে লোডশেডিং কমানো সম্ভব।

কিন্তু এক্ষেত্রে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম যত বাড়বে, সেটি বহন করা বাংলাদেশের বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় কঠিন বলেই মনে করেন ইজাজ হোসেন।

তিনি বলেন, ‘বর্তমানে প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দেওয়া হচ্ছে এই খাতে। এবার হয়ত সেটা ৬০ হাজার কোটি টাকা হতে পারে। ফার্নেস অয়েল নির্ভর বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো থেকে চাইলেই বাড়তি উৎপাদন করা যাবে না।’

সূত্র: বিবিসি বাংলা

আরও পড়ুন