এলআর ফান্ডের সদর-অন্দর: ২য় পর্ব
তথ্যপ্রবাহ ও স্বচ্ছতায় বড় বাধা খোদ ডিসি অফিস
তথ্য অধিকার কর্মী এবং আরও অনেকে বলছেন, এলআর ফান্ড সংক্রান্ত তথ্য না দেওয়ার এই প্রবণতা কাঠামোগত এবং সম্পূর্ণ পরিকল্পিত।
এহসানুল হক জসীম, ঢাকা
প্রকাশ: ১৩ জানুয়ারি ২০২৬, ১১:৩৪ পিএম
ছবি: ডেইলি সান
জানতে চাওয়া হয়েছিল, লোকাল রিসোর্সেস ফান্ড বা এলআর ফান্ডে ২০২৫ সালে কত টাকা জমা হয়েছে এবং কত টাকা ব্যয় হয়েছে? বিভিন্ন জেলা থেকে এক ও অভিন্ন উত্তর আসে। কেউই তথ্য দিতে রাজি নয়।
বিভিন্ন জেলা প্রশাসক (ডিসি)-এর কার্যালয়ে তথ্য অধিকার আইন-২০০৯ এর অধীনে আবেদন করার পরও এলআর ফান্ডের আয়, ব্যয় বা সুবিধাভোগীদের সম্পর্কে কোনো তথ্য দিতে অস্বীকৃতি জানানো হয়। কয়েকটি ডিসি অফিস লিখিতভাবে উত্তর দিয়ে জানিয়েছে, তারা এই সংক্রান্ত কোনো তথ্য দিতে অপারগ। আরও কয়েকটি ডিসি অফিস কোনো উত্তরই দেয়নি।
তথ্য অধিকার কর্মী এবং আরও অনেকে বলছেন, এলআর ফান্ড সংক্রান্ত তথ্য না দেওয়ার এই প্রবণতা কাঠামোগত এবং সম্পূর্ণ পরিকল্পিত।
সৈয়দ সাইফুল আলম শোভন যেমনটি বলছেন, “ডিসি অফিসগুলো তথ্য সরবরাহ করে না, কারণ ডিসি এবং অন্যান্য কর্মকর্তারা এই তহবিলের অপব্যবহার করেন।”
এই তথ্য অধিকার কর্মী এলআর ফান্ড সম্পর্কে তথ্য পেতে বিভিন্ন অফিসে বার বার ধর্ণা দিয়েছেন, এবং এর জন্য তাঁকে হয়রানী ও নানা পরিস্থিতিরও শিকার হতে হয়েছে।
মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের দাবি ও বাস্তবতা:
মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ এলআর ফান্ডকে অ-নিরীক্ষিত বা অডিটবিহীন বলতে নারাজ। এই বিভাগের সিনিয়র সহকারী সচিব মুহাম্মদ সাদিকুর রহমান স্বাক্ষরিত আনুষ্ঠানিক এক উত্তরে বলা হয়েছে, ২০১৬ সালের ১০ আগস্ট তারিখে এলআর ফান্ড সম্পর্কে একটি পরিপত্র জারি করা হয়েছিল। সেই পরিপত্র অনুযায়ী অডিট কমিটি "নিয়মিত” অডিট পরিচালনা করে থাকে।
তবে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ এটা স্বীকার করেছে যে, এই স্থানীয় পাবলিক ফান্ড পরিচালনা সংক্রান্ত কোন গাইডলাইন বা নির্দিষ্ট কোন নির্দেশিকা নেই।
সরকারি দাবির বিপরীতে নিয়মিত অডিটের কোনো প্রামাণ্য প্রমাণ পাওয়া যায়নি। বরং মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের এমন দাবিকে অসত্য বা মিথ্যা দাবি বলতে হয়। তবে এলআর ফান্ডের অডিট কেবল ২০০৮ সালে একবার হয়েছিল। সেই অডিটে দেখা গেছে, তহবিলটি যে উদ্দেশ্যে গঠন করা হয়েছিল সে উদ্দেশ্যে এর ব্যবহার করা হয়নি, বরং অপব্যবহার করা হয়েছে।
২০০৮ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত মৌলভীবাজারের ডিসি ছিলেন মো. মফিজুল ইসলাম। এলআর ফান্ড সম্পর্কে তাকে প্রশ্ন করা হলে তিনি এমন একটি ফান্ডের অস্তিত্ব স্বীকার করলেও এর অডিট বা ব্যবহার সম্পর্কে আর কোন মন্তব্য করতে চাননি। এই সংক্রান্ত প্রশ্নের উত্তর দিতে অস্বীকৃতি জানিয়ে ফোনকল কেটে দেন। মৌলভীবাজারের জেলা প্রশাসক অফিসও এই সংক্রান্ত কোনও প্রশ্নের উত্তর প্রদান করেনি।
তথ্যপ্রবাহে সমন্বিত অন্তরায়:
এলআর ফান্ড অডিটের বিষয়ে অসত্য দাবী করলেও মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে বলা হয়, ২০২৫ সালে এলআর ফান্ডের জমা, ব্যয় এবং স্থিতি সম্পর্কে বিবরণ জেলা প্রশাসকদের কার্যালয়ে যোগাযোগ করলে তথ্য পাওয়া যাবে। আরটিআই আইন অনুযায়ী তথ্য চেয়ে একাধিক জেলায় আবেদন করা হয়।
অভিন্ন উত্তর আসে। ১৭ ডিসেম্বর তারিখে স্বাক্ষরিত একটি চিঠিতে টাঙ্গাইলের এনডিসি লাবিবুজ্জামান মুস্তাবীন জানান, তথ্য প্রদান করা সম্ভব নয়। সিলেটের সহকারী কমিশনার মো. পারভেজ স্বাক্ষরিত ১৮ ডিসেম্বর উত্তরে বলা হয়, তারা এলআর ফান্ড সংক্রান্ত কোনো তথ্য সরবরাহ করতে পারবেন না।
ডিসির বাসার বাজার হয় এলআর ফান্ড থেকে-- এই সংক্রান্ত অভিযোগ এবং আরও দুটি প্রশ্নের জবাবে ২৯ ডিসেম্বর তারিখে কুড়িগ্রাম ডিসি অফিস থেকে তথ্য দিতে অস্বীকৃতি জানানো হয়।
চট্টগ্রামের সহকারী কমিশনার জান্নাতুল ফেরদৌসের ৩০ ডিসেম্বর স্বাক্ষরিত চিঠিতে একই ধরনের অস্বীকৃতির প্রতিধ্বনি। শেরপুরের এনডিসি রাজীব সরকারের স্বাক্ষরিত একই রকম একটি প্রতিক্রিয়া এই প্রতিবেদকের কাছে ফরোয়ার্ড করা হয়। ঢাকাসহ আরও কয়েকটি জেলা থেকে কোন সাড়া পাওয়া যায়নি।
তথ্যপ্রবাহে অস্বীকৃতির জানানো এবং অভিন্ন ধরনের জবাব এটাই প্রমাণ করে যে-- এটা কোনো বিচ্ছিন্ন প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়, বরং তথ্য প্রবাহে সমন্বিত একটি প্রাতিষ্ঠানিক অন্তরায়।
তথ্য চাইতে গিয়ে হয়রানি:
শোভনের ক্ষেত্রে তথ্য চাওয়ার বিষয়টি আমলাতান্ত্রিক অস্বীকৃতিতেই থেমে থাকেনি। তিনি দাবি করেন, “কিছু জেলা প্রশাসক ২০২৩ এবং ২০২৪ সালে আমাকে তলব করেছিলেন। তাদের মধ্যে দুই জেলা প্রশাসক আমাকে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে হাজির হতে বলেছিলেন। এমনকি হয়রানি করার জন্য পুলিশ আমার ঢাকার বাসায়ও গিয়েছিল।”
নাগরিকদের তথ্য অধিকার আইন ব্যবহার থেকে ভয় দেখানোর উদ্দেশ্যে থেকে এটা করা হয়েছে বলে তিনি মনে করেন।
আইনবিদরা বলছেন, এমন আচরণ তথ্য অধিকার আইন এবং সাংবিধানিক সুরক্ষা উভয়কেই ক্ষুণ্ন করে।
এই প্রতিবেদককেও তথ্য অধিকার আইন প্রয়োগ করেও তথ্য পেতে বেশ বেগ পেতে হয়।
‘অসাংবিধানিক’ তহবিল:
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট ইশরাত হাসান বলেন, এলআর ফান্ডের মূল সমস্যা হল এর অস্বচ্ছতা বা স্বচ্ছতার অভাব। কারণ কত টাকা আদায় হচ্ছে ও কোন খাতে কত ব্যয় হচ্ছে তার বিস্তারিত তথ্য জনসমক্ষে প্রকাশ করা হয় না, নিয়মিত ও স্বাধীন অডিট রিপোর্ট দৃশ্যমান নয়, ব্যয়ের ক্ষেত্রে স্পষ্ট লিখিত নীতিমালা ও মানদণ্ডের ঘাটতি রয়েছে এবং অনেক ক্ষেত্রে নগদ বা অস্বচ্ছ হিসাবপদ্ধতির কারণে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ে, ফলে জনস্বার্থে পরিচালিত একটি তহবিল হয়েও এলআর ফান্ড ব্যবস্থাপনা প্রশ্নবিদ্ধ থেকে যাচ্ছে।
তিনি মনে করেন, এমন একটি তহবিলের পরিচালনা অসাংবিধানিক হতে পারে।
বাংলাদেশের সংবিধানের ৮৫ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী রাষ্ট্রের সব রাজস্ব আইন দ্বারা ভিন্নভাবে নির্ধারিত না হলে কনসোলিটেডেড ফান্ডে জমা হওয়ার কথা, এবং ৮৮ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী তা কন্ট্রোলার অ্যান্ড অডিটর জেনারেল এর অডিটের আওতায় থাকতে হবে।
ইশরাত হাসান বলেন, “এলআর ফান্ডের পরিচালনা, ব্যয়ের খাত ও অডিট যদি জনসমক্ষে প্রকাশের সুস্পষ্ট ভিত্তি না থাকে এবং যদি আদায়কৃত অর্থ কনসোলিটেডেড ফান্ডে না গিয়ে পৃথকভাবে ব্যয় করা হয়, তাহলে সেই পরিচালনা পদ্ধতি সংবিধান ও সরকারি আর্থিক বিধির পরিপন্থি হয়ে আইনগতভাবে প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে।”
সুপ্রিম কোর্টের আরেক আইনজীবী ব্যারিস্টার নিশাত মাহমুদ বলেন, রাষ্ট্রীয় পদে অধিনস্ত কোনো ব্যক্তি রাষ্ট্রের কোনো তহবিলের সুবিধা ভোগ করলে উক্ত তহবিলের সুবিধা ভোগের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা রক্ষায় তার অডিট এবং রাষ্ট্র কর্তৃক অন্যান্য নিরীক্ষার পদ্ধতি দ্বারা নিরীক্ষা হওয়া উচিত। এছাড়া, স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা যাবে না।
অপরাধ বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, স্পষ্ট আইনি কাঠামো এবং গাইডলাইন ছাড়া যেকোনো তহবিল অনিবার্যভাবে দুর্নীতিকে সহজতর করবে, এমনকি যদি তা জনস্বার্থেও চালু বা পরিচালিত হয়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক এবং অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তাওহিদুল হক যেমনটি বলছেন, “কোনো তহবিলের আয়ের উৎস বা ব্যয় যে খাতে হয় তা নির্বিশেষে, স্বচ্ছতা অপরিহার্য। এটি ছাড়া তহবিলের অপব্যবহার হবে। এলআর ফান্ড অবশ্যই নিরীক্ষার আওতায় আনা উচিত।”
অবৈধ এলআর ফান্ডের প্রতি তীব্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) এর নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান এই তহবিল পরিচালনায় স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিয়েছেন। তিনি বলেন, দুর্নীতি প্রতিরোধে যথাযথ আইনি কাঠামো ও তদারকির অধীনে পাবলিক ফান্ড পরিচালনা করা অপরিহার্য।
একক স্বাক্ষরে গোপনীয়ভাবে তহবিল পরিচালনা:
জেলা পর্যায়ে জেলা প্রশাসক একক স্বাক্ষরকারী হিসেবে এলআর তহবিলের ওপর পূর্ণ কর্তৃত্ব ভোগ করেন। বেশিরভাগ টাকা তহবিলে নগদে জমা হয়, প্রায়শই রসিদ ছাড়াই, এবং জেলা প্রশাসক বা এনডিসির বিবেচনার ভিত্তিতে ব্যয় করা হয়।
একটি পাবলিক ফান্ডের এমন কাঠামো এটাই নিশ্চিত করে যে, সংগৃহীত পরিমাণ বা ব্যয়ের পদ্ধতি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ বা জনসাধারণের কাছে দৃশ্যমান না হয়।
মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ ৮ ডিসেম্বর তাদের উত্তরে জানায়, ডিসি অফিসগুলো এলআর ফান্ড সম্পর্কিত সমস্ত তথ্য সংরক্ষণ করে থাকে। মন্ত্রিপরিষদের এমন জবাবের পরও সংশ্লিষ্ট দফতরগুলো তথ্য জানাতে অস্বীকৃতি জানায়।
এই অস্বীকৃতির মধ্যে অনেক প্রশ্নের জবাব এসে যায়, বিশেষ করে অস্বচ্ছ প্রক্রিয়ার বিষয়টি।
শোভন বলেন, ‘এটি কেবল স্বচ্ছতার ব্যর্থতা নয়, এটি এই ফান্ডকে অডিটের বাইরে রাখার জন্য তৈরি একটি ইচ্ছাকৃত ব্যবস্থা।’
যতক্ষণ পর্যন্ত এলআর ফান্ড অডিটের আওতায় না আসবে, জনসাধারণের সামনে প্রকাশ না করা হবে এবং আইনি তদারকি থেকে দূরে রাখা হবে, ততক্ষণ পর্যন্ত এটি একটি সুরক্ষিত কালো তহবিল হিসেবে থাকবে।