EN ☀️
×

Follow Us

বাংলাদেশ

জালিয়াতি করে অযোগ্য ঠিকাদার থেকে বেশি দামে ওয়াকিটকি ক্রয় উত্তর সিটির

স্টেট আইটি কোম্পানি থেকে তিন লাখ টাকা দরে ১০০টি এবং এক লাখ ৬৪ হাজার টাকা দরে ২৮০টি ওয়াকিটকি কেনা হয়েছে।

রাশেদুল হাসান

প্রকাশ: ১৫ আগস্ট ২০২৫, ০৪:২২ পিএম

জালিয়াতি করে অযোগ্য ঠিকাদার থেকে বেশি দামে ওয়াকিটকি ক্রয় উত্তর সিটির

ছবি: সংগৃহীত

অ অ

ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনে (ডিএনসিসি) যোগসাজশে বাজার দর যাচাই করে দাম বাড়িয়ে অযোগ্য ঠিকাদারের কাছ থেকে ওয়াকিটকি কেনা হয়েছে। দরপত্রের শর্ত অনুযায়ী অভিজ্ঞতা না থাকলেও একটি চীনা কোম্পানির সনদ ব্যবহার করা সত্ত্বেও একটি দেশি কোম্পানিকে কাজ দেওয়া হয়েছে। স্টেট আইটি নামে ওই কোম্পানির কাছ থেকে প্রায় তিন লাখ টাকা দামে ১০০টি এবং এক লাখ ৬৪ হাজার টাকা দরে ২৮০টি ওয়াকিটকি কেনা হয়েছে।

ডিএনসিসির ওয়াকিটকির দাম অন্যান্য সংস্থার থেকে কয়েকগুণ বেশি পড়েছে। তথ্য যাচাইয়ে দেখা যায়, ২০২৩ সালে ২ হাজার ৪০০টি ওয়াকিটকি কিনেছে বাংলাদেশ পুলিশ। যার প্রতিটির দাম পড়েছে ৪৭ হাজার ৫২০ টাকা। উত্তর সিটির একটি প্রকল্পের আওতায় ২০১৯ সালে ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের জন্য প্রতিটি ৫১ হাজার ৯৩৫ টাকা দরে মোট ৪০০টি ওয়াকিটকি কেনা হয়েছে।

উত্তর সিটি মোট ৭ কোটি ৯৪ লাখ টাকা আনুষঙ্গিক মালামালসহ ৩৮০টি ওয়াকিটকি কিনেছে। যার মধ্যে ১০০টি হাইতেরা পিডিসি৬৮০ মডেলের ওয়াকিটকি রয়েছে। যার প্রতিটি ২ লাখ ৯৪ হাজার টাকা এবং ২৮০টি হাইতেরা এইচপি৭৮৮ ইউভি মডেলের ওয়াকিটকি কেনা হয়। যার প্রতিটির দাম পড়েছে ১ লাখ ৬৪ হাজার টাকা।

এই ক্রয় প্রক্রিয়ার সঙ্গে অন্যান্যের মধ্যে উত্তর সিটির প্রধান প্রকৌশলী ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. মঈন উদ্দিন, নির্বাহী প্রকৌশলী সাইফুল ইসলাম এবং সহকারী প্রকৌশলী আমিনুর রহমান জড়িত।

ডেইলি সান সম্প্রতি তথ্য অধিকার আইনে আবেদন করে সম্প্রতি উত্তর সিটির ৩৮০ টি ওয়াকি ক্রয়ের সমস্ত নথি সংগ্রহ করেছে। নথি বিশ্লেষনে দেখা যায়, ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে এই ক্রয় সংক্রান্ত কার্যেদেশ দেওয়া হয় কোম্পানিটিকে এবং এ ক্রয় প্রক্রিয়ার প্রতিটি ধাপে অনিয়মের আশ্রয় নেওয়া হয়েছে। যেমন, বাজারমূল্য যাচাইয়ের তিনটি প্রতিষ্ঠান থেকে দর সংগ্রহ করা হয়েছে অথচ তারা অতীতে কেউই ঢাকা উত্তর সিটিতে কোনো মালামাল সরবরাহ করেনি। তাদের ট্রেড লাইসেন্স অনুযায়ী তিন প্রতিষ্ঠানের দুটির ব্যবসার ধরণ টেলিকমিউনিকেশন সরঞ্জামের সংক্রান্ত নয়।

চীনা ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানের সনদে কাজ দেওয়া হয়েছে স্টেট আইটিকে

উত্তর সিটি গত বছরের অক্টোবরে ‌‌‌‌‌Supply of UHF Band Portable handset (W/T) of Multimode radio & DMR Trunking radio, and related accessories for Dhaka North City Corporation (FY:2024-2025 শীর্ষক দরপত্রটি  আহ্বান করে। এ দরপত্রের ঠিকাদারের যোগ্যতার শর্তে বলা হয়েছিল, দরদাতাদের অবশ্যই গত তিন বছরের মধ্যে অন্তত একটি একই ধরনের চুক্তি সম্পন্ন করা হয়েছে, যার মূল্য ৪ কোটি টাকা বা তার বেশি।

ওয়াকিটকি কেনার কাজটি দেওয়া হয়েছে মেসার্স দ্য স্টেট আইটি লিমিটেড নামের একটি প্রতিষ্ঠানকে। তারা মোট দুটি অভিজ্ঞতার সনদ জমা দেয়। একটি ওয়েস্ট জোন পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড থেকে ৪ কোটি ৬৪ লাখ টাকা চুক্তিমূল্যে, যা ছিল একটি যৌথ উদ্যোগে সরবরাহ এবং যেখানে স্টেট আইটি প্রধান অংশীদার ছিল না। ফলে এ সনদটি গ্রহণ করা হয়নি। পুলিশ টেলিকম অর্গানাইজেশন কর্তৃক ইস্যুকৃত আরেকটি সনদ জমা দেওয়া হয়। যার ওপর ভিত্তি করে স্টেট আইটকে কাজ দেওয়া হয়।

পুলিশ টেলিকমের সনদটি ছিল ১০ লাখ ৫৬ হাজার মার্কিন ডলার (বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ১১ কোটি ৪০ লাখ টাকা) চুক্তি মূল্যের। এই দরপত্রটি ছিল আন্তর্জাতিক সরবরাহ দরপত্র। যার আওতায় ২ হাজার ৪০০টি ভিএইচএফ ডিএমআর টায়ার-২ ওয়াকিটকি সরবরাহের কার্যাদেশ দেওয়া হয়। ২০২৪ সালের মে এই কাজের সনদ প্রদান করা হয়েছে। এটিতে স্বাক্ষর করেছিলেন তখনকার পুলিশ টেলিকম অর্গানাইজেশনের পুলিশ সুপার (লজিস্টিকস) এম আনোয়ার জাহিদ, যিনি বর্তমানে পটুয়াখালীতে কর্মরত।

এ অভিজ্ঞতা সনদটি চীনা হাইতেরা কমিউনিকেশনস কর্পোরেশন লিমিটেডের অনুকূলে ইস্যু করা হয়েছে। পুলিশ টেলিকমের তৎকালীন পুলিশ সুপার (লজিস্টিকস) এম আনোয়ার জাহিদ নিশ্চিত করেছেন, সনদটি হাইতেরার অনুকূেলে প্রদান করা হয়েছিল, স্টেট আইটির জন্য নয়। স্টেট আইটি কেবল স্থানীয় এজেন্ট হিসেবে কাজ করেছে।

এ বিষয়ে ঢাকা উত্তর সিটির নির্বাহী প্রকৌশলী ও ক্রয়কারী কর্মকর্তা সাইফুল ইসলাম তার ভুল স্বীকার করে জানান, তিনি স্থানীয় এজেন্টের উল্লেখ থাকার বিষয়টি খেয়াল করেননি। 

এ বিষয়ে জানতে চাইলে সরকারি ক্রয় প্রক্রিয়া সংক্রান্ত জাতীয় প্রশিক্ষক মো. আফিল উদ্দিনের বলেন, স্থানীয় এজেন্টের জন্য কোনো অভিজ্ঞতার সনদ ইস্যু করা হয় না। তবে কাজের স্বার্থে কার্যাদেশে তার নাম উল্লেখ করা হয়। সনদ ইস্যু করা হয় মূল ঠিকাদারের জন্যই।

দাপ্তরকি ব্যয় বাড়াতে বাজার দর কমিটির যোগসাজশের যাচাই 

দর যাচাই সংক্রান্ত  নথি যাচাই করে দেখা যায়, বাজারমূল্য নির্ধারণের জন্য গঠিত কমিটি তিনটি প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে দর সংগ্রহ করা হয়। এর মধ্যে দুটি প্রতিষ্ঠান-রুশদিয়া এন্টারপ্রাইজ ও এসএম কর্পোরেশন। এদের এই খাতে কোনো পূর্ব অভিজ্ঞতা ছিল না। স্টেট আইটিসহ এ তিন প্রতিষ্ঠানের জমা দেওয়া দরপত্রগুলোর ভাষা, শর্ত ও বিন্যাসে হুবহু এক ছিল, যা যোগসাজশের স্পষ্ট ইঙ্গিত বহন করে। তিনটি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে স্টেট আইটি সব আইটেমের দাম সবচেয়ে কম, রুশদিয়া দ্বিতীয় সর্বোচ্চ আর এসএম কর্পোরেশন সবচেয়ে বেশি দর প্রস্তাব করেছে। অথচ এ কোম্পানি দুটির ওয়াকিটকির উৎপাদকের অথরাইজেশন ও সরবরাহের পূর্ব অভিজ্ঞতা নেই।

এ বিষয়ে উত্তর সিটির বিদ্যুৎ বিভাগের সহকারী প্রকৌশলী (অতিরিক্ত দায়িত্ব) আমিনুর রহমান বলেন, স্টেট আইটির ঠিকাদারের সাথে চীনা কোম্পানি হাইতেরার একজন লোক আমাদের অফিসে আসতেন। তিনি ওই কোম্পানিগুলোর কথা বলেছেন। তাই আমরা তাদের থেকে দর সংগ্রহ করেছি।

নথিতে দেখা যায়, স্টেট আইটি প্রদত্ত দর সর্বনিম্ন হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছে। ওই কোম্পানির দেওয়া দরের সাথে ঠিকাদারের লাভ, ট্যাক্স ও ভ্যাট ওভারহেড যোগ করে ১০০টি ওয়াকিটকির প্রত্যেকটির দাপ্তরিক ক্রয় মূল্য ২ লাখ ৯৪ হাজার টাকা ও ২৮০টির দর ১ লাখ ৬৪ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়। বিস্ময়করভাবে স্টেট আইটি ঠিক এই দামেই দরপত্র জমা দিয়েছিল।

এ তিন কোম্পানি উত্তর সিটির নিয়মিত ঠিকাদার নয় অথচ তাদের কাছ থেকে ওয়াকিটকির দর নেওয়া হয়েছে। আবার নিয়মিত ঠিকাদার যেমন সিস্টেম কমিউনিকেশন লিমিটেড যারা আগে উত্তর সিটিকে ওয়াকিটকি সরবরাহ করেছিল তাদের কাছ থেকে দর সংগ্রহ করা হয়নি।

উত্তর সিটির প্রকৌশলীদের একটি অংশ জানিয়েছে, বাজার দর বেশি দেখিয়ে দাপ্তরিক মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে যাতে ঠিকাদারকে বেশি দামে কাজ দেওয়া যায়। ক্রয়কারী কর্মকর্তাদের পকেট ভারী হয় এবং দরপত্র বাতিলের ঝুঁকিও তৈরি না হয়।

ওয়াকিটকির উচ্চমূল্যের পক্ষে যুক্তি দিয়ে ক্রয়কারী কর্মকর্তারা বলেছেন, এই ওয়াকিটকিতে স্মার্ট ফোনের সব ফিচার যেমন টেক্সট মেসেজিং এবং ভিডিও-অডিও কলের মতো বিশেষ সুবিধা রয়েছে। কর্মকর্তাদের এক অংশ বলছে মেয়র আতিকুলের বোনের ছেলে তৌফিকের ইচ্ছায় এই উচ্চ দামের ওয়াকিটকি ওই কোম্পানির কাছ থেকে কেনার উদ্যোগ নেয়া হয়। পরে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হলে উত্তর সিটির তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী রফিকুল ইসলাম আবারও এই ওয়াকিটকি কেনার উদ্যোগ নেন। 

সংশ্লিষ্টরা যা বলছেন

দরপত্র যাচাইয়ের বিষয়ে জিজ্ঞাসা করা হলে যাচাই কমিটির প্রধান ও প্রধান প্রকৌশলী ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. মঈন উদ্দিন বলেন, আপনার যদি এ দরপত্র সংক্রান্ত বিষয়ে কোনো অভিযোগ থাকে তাহলে লিখিতভাবে জানাতে পারেন। আমরা তদন্ত করে দেখবো। 

উত্তর সিটির তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (বিদ্যুৎ) মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, আমি কোনো কমিটিতে নাই। না আছি ক্রয় কমিটিতে, আর না আছি যাচাইয়ে। ওরা দর যাচাই করে আমার কাছে পাঠিয়েছে, আমি শুধু ওপরে ফরওয়ার্ড করে দিয়েছি। 

উত্তর সিটির প্রশাসক মোহাম্মদ এজাজ বলেন, আপনি নিউজ করেন। আমি তদন্ত করে ব্যবস্থা নেব।

আরও পড়ুন