বিপাকে হাজার কৃষক
হাওরে ধানের ন্যায্য মূল্য নেই, বৃষ্টিতে নষ্ট হচ্ছে ফসল
জেলার ১২টি উপজেলার ছোট-বড় ১৩৭টি হাওরে এ বছর ২ লাখ ২৩ হাজার ৫১১ হেক্টর জমিতে বোরো ধানের আবাদ হয়েছে।
ডেইলি সান রিপোর্ট, সুনামগঞ্জ
প্রকাশ: ২৫ এপ্রিল ২০২৬, ০৫:৪৫ পিএম
ছবি: সংগৃহীত
সুনামগঞ্জের হাওরাঞ্চলে এবার বোরো ধানের ফলন ভালো হলেও ন্যায্য মূল্য না পাওয়া এবং টানা বৈরী আবহাওয়ায় কাটা ধান শুকাতে না পারায় চরম বিপাকে পড়েছেন হাজার হাজার কৃষক। সঙ্গে রয়েছে ফসল রক্ষা বাঁধ ভেঙে ফসল তলিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা। সব মিলিয়ে এ বছর হাওরপাড়ের কৃষকদের মুখে হাসি নেই।
তাহিরপুর উপজেলার মাটিয়ান হাওরের কৃষক সুহেল মিয়া (৪০) জানান, হাওরাঞ্চলে বিকল্প কর্মসংস্থান না থাকায় বংশ পরম্পরায় ধান চাষই তাদের একমাত্র জীবিকা। তবুও প্রতি বছর প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও মানবসৃষ্ট দুর্ভোগের শিকার হতে হচ্ছে।
তিনি ক্ষোভের সঙ্গে বলেন, ‘কৃষি কইরা লাভ নাই, বড় বিপদে আছি। সব জিনিসপত্রের দাম শুধু বাড়েই বাড়ে, খালি ধানের দাম বাড়ে না।’
সুহেল মিয়া জানান, ধারদেনা করে ১৪ কিয়ার জমিতে ধান চাষ করতে শুধু উৎপাদন খরচেই গেছে ৫০ হাজার টাকা। এর পর ধান কাটা, মাড়াই ও ঘরে তোলা পর্যন্ত আরও প্রায় ৫০ হাজার টাকা খরচ হবে বলে তিনি আশঙ্কা করছেন। নিজের ও পরিবারের শ্রম তো রয়েছেই। এরপরও ধানের ন্যায্য দাম মিলছে না। ইতোমধ্যে ১৪ কিয়ারের মধ্যে ৫ কিয়ারের ধান কাটা হয়েছে। বাকি ধান এখনো মাঠে। মেঘ-রোদের লুকোচুরিতে কাটা ধান শুকানো যাচ্ছে না, রং নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।
তিনি বলেন, ‘আগামী দিনগুলোতে পরিবার নিয়ে কীভাবে চলবো, বুঝতে পারছি না।’
-69eca99e10021.jpg)
একই হাওরের আরেক কৃষক জুয়েল মিয়া জানান, হাওর থেকে বাড়িতে ধান আনার মতো পাকা সড়ক না থাকায় কয়েক ধাপে ধান শুকানোর খলায় আনতে হয়, যার ফলে খরচ আরও বাড়ছে। তেলের দাম বেশি হওয়ায় প্রতি কিয়ার (৩০ শতাংশ) জমিতে ধান কাটার মেশিন বাবদ খরচ হচ্ছে ৩ থেকে ৪ হাজার টাকা।
তিনি বলেন, ‘সব মিলিয়ে এক মন ধানের উৎপাদন খরচ পড়ে ১ হাজার থেকে ১ হাজার ২০০ টাকা, আর বেচতে গেলে পাই ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা, খুব বেশি হলে ১ হাজার টাকা। তাহলে ধান চাষ করে কী করবো?’
সরেজমিনে শনি ও মাটিয়ান হাওরে গিয়ে দেখা গেছে, হাওরের পাশে অস্থায়ী ছোট খোপড়ি ঘর তুলে সেখানে অবস্থান করছেন কৃষকরা। দিনের বেলা ধান শুকানো আর রাতে পাহারা দেওয়াই এখন তাদের রুটিন। ধান শুকানো ও বস্তায় ভরার কাজে সহযোগিতা করছেন পরিবারের ছেলে-মেয়ে ও স্ত্রীরাও।
এদিকে, সরকারি খাদ্যগুদামে ধান সংগ্রহ এখনো শুরু না হওয়ায় ফড়িয়া ব্যবসায়ীরা কম দামে ধান কিনছেন। ঋণ পরিশোধের চাপে পড়ে বাধ্য হয়েই কম দামে ধান বিক্রি করে দিতে হচ্ছে অনেক কৃষককে।
জেলার ১২টি উপজেলার ছোট-বড় ১৩৭টি হাওরে এ বছর ২ লাখ ২৩ হাজার ৫১১ হেক্টর জমিতে বোরো ধানের আবাদ হয়েছে। এর মধ্যে হাওরের গভীর অংশে ১ লাখ ৬৫ হাজার ২৭৫ হেক্টর এবং উঁচু অংশে ৫৮ হাজার ২৩৬ হেক্টর। ধানের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ১৪ লাখ মেট্রিক টনেরও বেশি, যার বাজারমূল্য ৫ হাজার কোটি টাকারও বেশি।
তবে এই বিশাল ফসলই এখন বিপদে। আগামী ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকতে পারে বলে জানিয়েছেন সুনামগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) প্রকৌশলী মামুন হাওলাদার। তিনি বলেন, বৃষ্টিতে নদ-নদীর পানি বাড়লে যেকোনো সময় হাওরে অকাল বন্যা দেখা দিতে পারে এবং ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হতে পারে। তাই তিনি ধান ৮০ শতাংশ পাকলেই দ্রুত কাটার পরামর্শ দিয়েছেন।
এ প্রসঙ্গে জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোহাম্মদ ওমর ফারুক বলেন, ‘বর্তমান পরিস্থিতিতে আমরা কৃষকদের পরামর্শ ও সহযোগিতা করছি এবং ধান ৮০ শতাংশ পাকলেই দ্রুত কেটে মাড়াই করে শুকানোর জন্য বলছি। একই সঙ্গে আবহাওয়া বার্তাও পৌঁছে দিচ্ছি।’
এছাড়া শত কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত ফসল রক্ষা বাঁধে অনিয়মের কারণে বাঁধ ভেঙে ফসল ডুবির আশঙ্কাও করছেন স্থানীয় কৃষকরা। ধানের ন্যায্য মূল্য, পর্যাপ্ত শ্রমিক সংকট, বৃষ্টি এবং বন্যার ঝুঁকি- সব মিলিয়ে হাওরাঞ্চলের লাখো কৃষক পরিবার এখন গভীর উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন।