নক্ষত্রের জন্মরহস্য উন্মোচন করল জেমস ওয়েব
মহাশূন্যের বিশাল গ্যাসমেঘ যখন নিজস্ব মহাকর্ষ বলের তীব্র চাপে সংকুচিত হতে থাকে, তখনই নক্ষত্রের জন্ম হয়
ডেইলি সান রিপোর্ট
প্রকাশ: ২৬ মে ২০২৬, ১২:০৩ এএম
ছবি: সংগৃহীত
মহাকাশে কীভাবে নক্ষত্রের জন্ম হয় এবং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তারা কীভাবে রূপান্তরিত হয়— তা নিয়ে সম্পূর্ণ নতুন ও যুগান্তকারী তথ্য পেয়েছেন জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা।
মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসার জেমস ওয়েব ও হাবল মহাকাশ দূরবীক্ষণ যন্ত্রের (টেলিস্কোপ) যৌথ পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, বড় আকারের নক্ষত্রগুচ্ছ (স্টার ক্লাস্টার) ছোটগুলোর তুলনায় অনেক দ্রুত নিজেদের চারপাশের গ্যাসমেঘ সরিয়ে ফেলতে সক্ষম। বিজ্ঞানীদের মতে, এই আবিষ্কার ভবিষ্যতে মহাবিশ্বে গ্রহ তৈরির জটিল প্রক্রিয়াটি আরও নিখুঁতভাবে বুঝতে সাহায্য করবে।
মহাকাশবিজ্ঞানীদের মতে, মহাশূন্যের বিশাল গ্যাসমেঘ যখন নিজস্ব মহাকর্ষ বলের তীব্র চাপে সংকুচিত হতে থাকে, তখনই নক্ষত্রের জন্ম হয়। নক্ষত্রটি ডানা মেলার পর তার ভেতর থেকে শক্তিশালী নাক্ষত্রিক বাতাস, তীব্র অতিবেগুনি বিকিরণ এবং সুপারনোভা বিস্ফোরণ ঘটতে শুরু করে। এই শক্তিগুলোর কারণে নক্ষত্রের চারপাশের অবশিষ্ট গ্যাস ও ধুলার মেঘ দূরে সরে যায়। ফলে ওই নির্দিষ্ট অঞ্চলে নতুন কোনো নক্ষত্র তৈরির প্রক্রিয়া চিরতরে থেমে যায়। বিজ্ঞান জগতের এই বিশেষ ঘটনাটিকে গবেষকেরা ‘নাক্ষত্রিক প্রতিক্রিয়া’ বা ‘স্টেলার ফিডব্যাক’ বলে থাকেন।
নাসা জানিয়েছে, এই গবেষণার জন্য বিজ্ঞানীরা পৃথিবীর কাছাকাছি থাকা চারটি গ্যালাক্সির প্রায় ৯ হাজার তরুণ নক্ষত্রগুচ্ছ গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করেছেন। জেমস ওয়েব টেলিস্কোপের অত্যাধুনিক অবলোহিত (ইনফ্রারেড) প্রযুক্তি ব্যবহার করে ঘন গ্যাস ও ধুলার মেঘের ভেতরে উঁকি দেওয়া সম্ভব হয়েছে। এর ফলে বিজ্ঞানীরা প্রতিটি নক্ষত্রগুচ্ছের সঠিক বয়স ও ভর নির্ধারণ করতে পেরেছেন। পর্যবেক্ষণের সময় কিছু নক্ষত্রগুচ্ছ তখনও ঘন গ্যাসের আড়ালে ঢাকা ছিল, আবার কিছু অবয়ব পুরোপুরি উন্মুক্ত ও দৃশ্যমান অবস্থায় পাওয়া গেছে।
বিখ্যাত বিজ্ঞান সাময়িকী ‘নেচার অ্যাস্ট্রোনমি’- তে প্রকাশিত এই গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশাল আকারের নক্ষত্রগুচ্ছগুলো যেখানে জন্ম নেয়, সেখান থেকে তারা তুলনামূলক অনেক দ্রুত বের হয়ে আসে। বড় নক্ষত্রগুচ্ছগুলো মাত্র ৫০ লাখ বছরের মধ্যে তাদের চারপাশের সব গ্যাসমেঘ তাড়িয়ে সম্পূর্ণ দৃশ্যমান হয়ে ওঠে। অপরদিকে, অপেক্ষাকৃত ছোট আকৃতির নক্ষত্রগুচ্ছগুলোর ক্ষেত্রে এই একই প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে সময় লেগে যায় প্রায় ৭০ থেকে ৮০ লাখ বছর।
সুইডেনের স্টকহোম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান গবেষক অ্যাঞ্জেলা আদামো এই আবিষ্কারের গুরুত্ব তুলে ধরে বলেন, ‘নক্ষত্রের জন্ম ও বিকাশ নিয়ে আগে আমরা যেসব গণনাভিত্তিক বা থিওরিটিক্যাল মডেল ব্যবহার করতাম, সেগুলো বাস্তব চিত্র পুরোপুরি ব্যাখ্যা করতে পারছিল না। জেমস ওয়েব ও হাবলের দেওয়া নতুন এই তথ্য ভবিষ্যৎ মহাকাশ গবেষণার ক্ষেত্রে একটি শক্তিশালী ও গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি তৈরি করে দিল।’
গ্রহ গঠনের ওপর এর প্রভাব কী?
গবেষকদের ধারণা, নক্ষত্রগুচ্ছ থেকে চারপাশের গ্যাস যদি খুব দ্রুত সরে যায়, তবে তরুণ নক্ষত্রগুলোর চারপাশে থাকা ‘গ্রহ তৈরির চাকতি’ (প্রোটোপ্ল্যানেটারি ডিস্ক) সরাসরি তীব্র অতিবেগুনি বিকিরণের মুখোমুখি হয়। এই বিকিরণের ফলে গ্রহ গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় ধূলিকণা ও গ্যাসীয় উপাদানগুলো জমাট বাঁধার আগেই মহাকাশে হারিয়ে যেতে পারে। অর্থাৎ, যেসব অঞ্চলে গ্যাস দ্রুত সরে যায়, সেখানে গ্রহ তৈরির সম্ভাবনা বা গতি কমে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে।
মহাজাগতিক এই নতুন পর্যবেক্ষণটি আগামী দিনে নক্ষত্র এবং সৌরজগতের মতো বিভিন্ন গ্রহের উৎপত্তি ও বিবর্তন সম্পর্কে বিজ্ঞানীদের বহুদিনের পুরোনো ধারণাকে আরও নির্ভুল ও সমৃদ্ধ করবে বলে আশা করা হচ্ছে।