মেটার বিরুদ্ধে ২৫ বিলিয়ন ডলার জরিমানার রায়
ডেইলি সান রিপোর্ট, ঢাকা
প্রকাশ: ২২ অক্টোবর ২০২৬, ০৪:৩৫ পিএম
মেটার সিইও মার্ক জুকারবার্গ। ছবি: বিবিসি
ব্যবসায়িক রীতিনীতি এবং ব্যবহারকারীদের ডেটা বা তথ্য সুরক্ষায় অনিয়মের দায়ে ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম ও হোয়াটসঅ্যাপের মূল প্রতিষ্ঠান মেটা-কে তাদের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় অঙ্কের জরিমানা করা হয়েছে। বুধবার (২১ অক্টোবর) যুক্তরাষ্ট্রের একটি আদালত মেটাকে ২৫ বিলিয়ন ডলার (প্রায় ১৮.৬ বিলিয়ন পাউন্ড) জরিমানা প্রদানের নির্দেশ দিয়েছেন।
জরিমানার পরিমাণ কোম্পানিটির প্রায় এক ত্রৈমাসিকের (৩ মাসের) মোট লাভের সমান। রাজ্যের আইনজীবীরা মেটার বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ ৪০ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত জরিমানা দাবি করেছিলেন। অন্যদিকে মেটার যুক্তি ছিল, ৩.৪ বিলিয়ন ডলারের বেশি জরিমানা করা অসাংবিধানিক হবে।
যুক্তরাষ্ট্রের নিউ মেক্সিকোর একটি আদালত চলতি বছরের শুরুতে দুই সপ্তাহব্যাপী চলা একটি মামলার রায়ে দেখতে পান, ফেসবুক ব্যবহারকারীদের তথ্য কীভাবে পরিচালনা করা হয়— সে বিষয়ে প্রতিষ্ঠানটি বছরের পর বছর ধরে জনসাধারণের সাথে মিথ্যাচার করেছে।
মামলার রায়ে বিচারক ফ্রান্সিস ম্যাথিউ বলেন, ‘‘এই মিথ্যাচার কেবল ফেসবুকের তথ্য ব্যবহারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং তা ফেসবুকের মূল ব্যবসায়িক রীতিনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে গিয়ে আঘাত করেছে।’’
তবে মেটার প্রধান আইনজীবী সিজে ম্যাহোনি এই রায়ের তীব্র সমালোচনা করে বলেন, "এই আদেশের ফলে নিউ মেক্সিকো রাজ্যে ব্যবসা করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়বে।’’ মেটা এই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে এবং ম্যাহোনি আশা প্রকাশ করেছেন যে তারা আপিলে জয়ী হবেন।
নিউ মেক্সিকো রাজ্যের এই মামলাটির সূত্রপাত হয়েছিল মূলত বিতর্কিত ‘কেমব্রিজ অ্যানালিটিকা’ কেলেঙ্কারিতে মেটার (তৎকালীন ফেসবুক) ভূমিকার কারণে। ওই রাজনৈতিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠানটি ২০১৬ সালের মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক প্রচারণায় কোটি কোটি ফেসবুক ব্যবহারকারীর তথ্য তাদের সম্মতি ছাড়াই ব্যবহার করেছিল, যার মাধ্যমে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রথমবারের মতো আমেরিকার প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন।
এছাড়াও, নিউ মেক্সিকো রাজ্য মেটার বিরুদ্ধে অভিযোগ এনেছিল যে, প্ল্যাটফর্মে থাকা 'হেট স্পিচ' বা ঘৃণাত্মক বক্তব্য থেকে মেটা কীভাবে লাভবান হয়। তা প্রতিরোধে তাদের নিজস্ব নিয়মগুলো কীভাবে প্রয়োগ করা হয়—সে বিষয়েও তারা জনগণকে ইচ্ছাকৃতভাবে বিভ্রান্ত করেছে। জুরি বোর্ড এই অভিযোগেও মেটাকে দোষী সাব্যস্ত করেছে।
নিউ মেক্সিকোর আইনজীবীরা আদালতে দেখিয়েছেন যে, মেটার শীর্ষ কর্মকর্তারা বছরের পর বছর ধরে জনগণের কাছে দাবি করে এসেছেন যে ব্যবহারকারীর অনুমতি ছাড়া তাদের তথ্য কোনো তৃতীয় পক্ষকে দেওয়া হয় না— যা সম্পূর্ণ মিথ্যা ছিল।
রাজ্যের আইনজীবীদের দাবি, মেটার এই অসততার কারণে নিউ মেক্সিকোর প্রায় ২০ লাখ মানুষের সবাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। জুরি বোর্ড রায়ে জানায়, মেটা রাজ্যের ভোক্তা অধিকার আইন ৪০ মিলিয়নেরও (৪ কোটি) বেশি বার লঙ্ঘন করেছে।
নিউ মেক্সিকোর অ্যাটর্নি জেনারেল রাউল তোরেস বুধবার (২১ অক্টোবর) বলেন, ‘‘দীর্ঘদিন ধরে এই শক্তিশালী প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো এমনভাবে কাজ করেছে যেন তাদের বিশাল আকার এবং প্রভাব তাদের আইনের ঊর্ধ্বে নিয়ে গেছে। এই রায় স্পষ্ট করে দিল যে, জবাবদিহিতার বাইরে যাওয়ার মতো শক্তিশালী কোনো কর্পোরেশন হতে পারে না।’’
বিচারক রায়ে লিখেছেন, ২০১০ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত ১১ বছরেরও বেশি সময় ধরে মেটা অত্যন্ত পরিকল্পিত ও স্বেচ্ছাকৃত উপায়ে এই আইন লঙ্ঘন ও মিথ্যাচার চালিয়ে গেছে। বিচারক তার আদেশে আরও লিখেছেন, মার্ক জাকারবার্গসহ ফেসবুকের শীর্ষ নির্বাহীদের ভেতরের আলাপচারিতাগুলো এমনভাবেই সাজানো হয়েছিল যা জনসাধারণকে বিভ্রান্ত করে।
আইন অনুযায়ী প্রথমে মেটার এই জরিমানার পরিমাণ হিসাব করা হয়েছিল ২১৯ বিলিয়ন ডলার, যা পরবর্তীতে বিচারক ম্যাথিউ কমিয়ে ২৫ বিলিয়ন ডলারে নামিয়ে আনেন।
এত বড় অঙ্কের জরিমানার মুখোমুখি হলেও, মেটা বর্তমানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই (AI) প্রযুক্তির দৌড়ে টিকে থাকতে জরিমানার চেয়েও বহুগুণ বেশি অর্থ খরচ করছে।
মার্ক জাকারবার্গ জানিয়েছেন, তাদের সাধারণ ব্যবহারকারী-কেন্দ্রিক এআই টুল ‘মিউজ’ ইতিমধ্যেই ১০ মিলিয়ন (১ কোটি) মানুষ ব্যবহার করছেন। এই খরচ মেটাতে গিয়ে মেটা গত ১৪ বছরের মধ্যে প্রথমবারের মতো ২ বিলিয়ন ডলারের নেতিবাচক নগদ প্রবাহ বা ঘাটতি রিপোর্ট করেছে।
অর্থাৎ, মেটার আয় আগের চেয়ে অনেক বাড়লেও (জুলাই-সেপ্টেম্বর প্রান্তিকে আয় ২৬% বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬৪.৫ বিলিয়ন ডলারে), তারা আয়ের চেয়ে এআই প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ করছে অনেক বেশি।