EN ☀️
×

Follow Us

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি

এআই দিয়ে ছবি বানাতে কত পানি-বিদ্যুৎ খরচ হয়?

মুঠোফোনে লেখা একটি কমান্ডে এআই ছবি বানালেও দূরের ডেটা সেন্টারে খরচ হয় বিপুল পানি ও বিদ্যুৎ।

প্রযুক্তি ডেস্ক

প্রকাশ: ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩:২৫ পিএম

এআই দিয়ে ছবি বানাতে কত পানি-বিদ্যুৎ খরচ হয়?

ছবি: রয়টার্স

অ অ

মুঠোফোনে কয়েকটা শব্দ লিখলেই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) চোখের পলকে একটি ছবি বানিয়ে দেয়। কাজটি এখন এত সহজ যে এর পেছনের জটিলতা নিয়ে আমরা মাথা ঘামাই না। কিন্তু একটি মাত্র নির্দেশ পালন করতে গিয়ে পর্দার আড়ালে খরচ হয়ে যায় বিপুল পরিমাণ পানি ও বিদ্যুৎ। এই পানির হিসাব মেলাতে এআই কোম্পানিগুলো এখন সমুদ্রের তলদেশে ডেটা সেন্টার বসানোর কথাও ভাবছে।

আপনি ঘরে বসে ফোনে এআই ব্যবহার করলে নিজে কোনো পানি খরচ করেন না। প্রশ্ন হলো, তাহলে এআই কোম্পানিগুলো কেন পানি খরচের কথা বলছে? এর কারণ লুকিয়ে আছে দূরের এক ডেটা সেন্টারে।

কমান্ড থেকে ছবি: কাজটি হয় কীভাবে

আপনি এআই টুলে যখন ছবি বানানোর নির্দেশ দেন, সেই নির্দেশ ইন্টারনেট হয়ে সেকেন্ডের মধ্যে দূরের একটি ডেটা সেন্টারে চলে যায়। ডেটা সেন্টার আসলে বিশাল এক কম্পিউটার কারখানা। সেখানে হাজার হাজার শক্তিশালী সার্ভার দিনরাত কাজ করে। আপনার ছবিটি তৈরি করে দেয় এই সার্ভারগুলোই। এখানে আপনার নিজের ফোন বা ল্যাপটপের কোনো ভূমিকা থাকে না।

হাজার হাজার সার্ভার একসঙ্গে জটিল হিসাব করলে সেগুলো প্রচণ্ড গরম হয়ে ওঠে। ঠিকমতো তাপ না সরালে দামি যন্ত্রগুলো পুড়ে যেতে পারে। তাই সার্ভার ঠান্ডা রাখতে দরকার হয় বিপুল পরিমাণ পানির।

কেন এত পানি লাগে

বেশির ভাগ বড় ডেটা সেন্টার সার্ভার ঠান্ডা রাখতে ‘বাষ্পীভবন শীতলীকরণ’ পদ্ধতি ব্যবহার করে। ব্যাপারটা অনেকটা আমাদের ঘামার মতো। গরম সার্ভারের পাশ দিয়ে ঠান্ডা পানি প্রবাহিত করা হয়। এই পানি তাপ শুষে নিয়ে নিজে গরম হয়ে যায়। এরপর সেই গরম পানিকে কুলিং টাওয়ারের বাতাসে পাঠানো হয়। সেখানে পানির কিছু অংশ বাষ্প হয়ে উড়ে যায়, আর তাতেই বাকি পানি আবার ঠান্ডা হয়। ঠান্ডা পানি ফের সার্ভারে ফিরে যায়।

এই পদ্ধতিতে পানি সাশ্রয় হয় না, বরং অপচয় হয়। প্রথমত, গরম পানি ঠান্ডা করার সময় তার একটি অংশ বাষ্প হয়ে উড়ে যায়। তাই ঘাটতি মেটাতে নিয়মিত নতুন পানি লাগে। দ্বিতীয়ত, পানি বাষ্প হয়ে যাওয়ার পর বাকি পানিতে লবণ ও খনিজের ঘনত্ব বেড়ে যায়। এই খনিজযুক্ত পানি বারবার ব্যবহার করলে সার্ভার ও পাইপে আস্তরণ জমে যন্ত্রপাতির ক্ষতি হতে পারে। তাই একসময় সেই ঘন পানি ফেলে দিয়ে নতুন সুপেয় পানি যোগ করতে হয়।

পানির খরচ আসলে কত

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক প্রকৌশল সাময়িকী আইইইই স্পেকট্রামে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে প্রকাশিত একটি বিশ্লেষণে এই তথ্য উঠে এসেছে। ২০২৩ সালের এক গবেষণার হিসাবে, জিপিটি-৩ দিয়ে ১৫০ থেকে ৩০০ শব্দের একটি লেখা তৈরিতে যুক্তরাষ্ট্রের একটি গড় ডেটা সেন্টারে প্রায় ১৭ মিলিলিটার পানি খরচ হতো। এর মধ্যে সরাসরি কুলিংয়ে লাগে পৌনে ২ মিলিলিটার। বাকিটা লাগে বিদ্যুৎ উৎপাদনে। ছবি তৈরির নির্দিষ্ট হিসাব ওই প্রতিবেদনে নেই।

ছবি তৈরির পানি খরচ নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন বিশ্লেষণে ভিন্ন সংখ্যা পাওয়া যায়। জ্বালানি খরচের উপাত্তের ভিত্তিতে করা কিছু হিসাবে একটি ছবি তৈরিতে গড়ে প্রায় ২৩ মিলিলিটার পানি লাগার কথা বলা হয়েছে। আবার কিছু বিশ্লেষণে এই অঙ্ক ৫ থেকে ৬০ মিলিলিটার, এমনকি তার চেয়েও বেশি দেখা গেছে। হিসাবের পদ্ধতির ওপরই এই পার্থক্য নির্ভর করে—শুধু সার্ভার ঠান্ডা করার পানি ধরা হচ্ছে, নাকি বিদ্যুৎ উৎপাদনের পানিও যোগ হচ্ছে। তুলনায়, একটি সাধারণ গুগল সার্চে পানি লাগে অনেক কম, বিভিন্ন হিসাবে তা শূন্য দশমিক ২ থেকে শূন্য দশমিক ৬ মিলিলিটারের মধ্যে।

একক হিসাবে এই সংখ্যা সামান্য মনে হতে পারে। কিন্তু প্রতিদিন সারা বিশ্বে কোটি কোটি মানুষ একসঙ্গে এআই দিয়ে ছবি বা লেখা বানান। তাই এই সামান্য পানির মোট পরিমাণ অনেক বড়। যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটনভিত্তিক নীতি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান এনভায়রনমেন্টাল অ্যান্ড এনার্জি স্টাডি ইনস্টিটিউটের (ইইএসআই) তথ্য অনুযায়ী, একটি মাঝারি আকারের ডেটা সেন্টার বছরে প্রায় ১১ কোটি গ্যালন পানি খরচ করে। এই পরিমাণ প্রায় এক হাজার পরিবারের সারা বছরের পানির চাহিদার সমান। বড় ডেটা সেন্টারগুলোয় দিনে ৫০ লাখ গ্যালন পর্যন্ত পানি লাগতে পারে।

পানির এই খরচ শুধু সার্ভার ঠান্ডা রাখাতেই সীমাবদ্ধ নয়। ডেটা সেন্টার চালাতে যে বিপুল বিদ্যুৎ লাগে, তার বড় অংশ এখনো আসে জীবাশ্ম জ্বালানি বা তাপবিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে। এসব বিদ্যুৎকেন্দ্রের যন্ত্রপাতি ঠান্ডা রাখতেও প্রচুর পানি দরকার হয়। অর্থাৎ এআই যত বেশি বিদ্যুৎ টানবে, পরোক্ষভাবে পানির খরচও তত বাড়বে।

এই পানি আসে কোথা থেকে

ডেটা সেন্টারগুলো সাধারণত পানি সংগ্রহ করে স্থানীয় সরবরাহ লাইন, নদী বা ভূগর্ভস্থ উৎস থেকে। এই পানির বড় অংশই সুপেয় বা খাওয়ার উপযোগী মিঠাপানি। ফলে অনেক জায়গায় স্থানীয় বাসিন্দাদের দৈনন্দিন ব্যবহার ও কৃষিকাজের পানির ওপর চাপ পড়ছে। গ্রীষ্মকালে এই পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়।

সমালোচনার মুখে মাইক্রোসফট, গুগল, অ্যামাজনের মতো বড় প্রযুক্তিপ্রতিষ্ঠান এখন বিকল্প উৎসের দিকে ঝুঁকছে। মাইক্রোসফট তাদের টেকসই উন্নয়ন প্রতিবেদনে জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস, ওয়াশিংটন অঙ্গরাজ্যের কুইন্সি, ক্যালিফোর্নিয়া ও সিঙ্গাপুরের মতো এলাকায় তারা পরিশোধিত বর্জ্যপানির ব্যবহার বাড়িয়েছে। বাসাবাড়ি বা কারখানার ব্যবহৃত দূষিত পানিকে শোধনাগারে প্রক্রিয়াজাত করে আবার ব্যবহারের উপযোগী করাকেই পরিশোধিত বর্জ্যপানি বলে। এই পানি পানের উপযোগী না হলেও পরিবেশের জন্য নিরাপদ এবং সার্ভার ঠান্ডা রাখার জন্য কার্যকর। মাইক্রোসফটের দাবি, সিঙ্গাপুরে তাদের ডেটা সেন্টারের প্রায় পুরোটাই (৯৯ শতাংশ) এখন অ-সুপেয় পানি দিয়ে চলে।

অ্যামাজন ওয়েব সার্ভিসেস (এডব্লিউএস) ২০২৫ সালের জুনে জানায়, ২০৩০ সালের মধ্যে তারা যুক্তরাষ্ট্রের ১২০টির বেশি ডেটা সেন্টারে পরিশোধিত বর্জ্যপানি ব্যবহার করবে। এতে বছরে প্রায় ৫৩ কোটি গ্যালন সুপেয় পানি সাশ্রয় হবে বলে প্রতিষ্ঠানটির দাবি।

গুগল ও মাইক্রোসফট প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, ২০৩০ সালের মধ্যে তারা ‘ওয়াটার পজিটিভ’ হবে। অর্থাৎ তারা যত পানি খরচ করবে, তার চেয়ে বেশি পানি পরিবেশে ফিরিয়ে দেবে। অ্যামাজনও একই অঙ্গীকার করেছে। প্রতিষ্ঠানটির দাবি, ২০২৫ সাল শেষে তারা সেই লক্ষ্যের প্রায় তিন-চতুর্থাংশ পূরণ করে ফেলেছে।

সমুদ্রের তলদেশে ডেটা সেন্টার

সুপেয় পানির চাপ কমাতে ও ঠান্ডা রাখার খরচ বাঁচাতে এআই প্রতিষ্ঠানগুলো এখন সমুদ্রের দিকে তাকাচ্ছে। সমুদ্রের পানি বিনা মূল্যে পাওয়া যায় এবং এটি প্রাকৃতিকভাবেই ঠান্ডা। তাই সার্ভার ঠান্ডা করার জন্য এটি ভালো সমাধান হতে পারে।

এই ধারণা থেকে ২০১৮ সালে মাইক্রোসফট স্কটল্যান্ডের অর্কনি দ্বীপপুঞ্জের উপকূলে ‘প্রজেক্ট নেটিক’ নামে একটি পরীক্ষামূলক ডেটা সেন্টার সমুদ্রের তলদেশে বসিয়েছিল। প্রায় দুই বছর পর সেটি তুলে দেখা যায়, ডাঙায় থাকা সমসংখ্যক সার্ভারের তুলনায় পানির নিচের সার্ভারগুলো আট গুণ কম নষ্ট হয়েছে। এটি মাইক্রোসফট নিজেই জানিয়েছিল। তবে রক্ষণাবেক্ষণ ও মেরামতের নানা ব্যবহারিক জটিলতার কারণে প্রকল্পটি বাণিজ্যিকভাবে আর এগোয়নি। ২০২৪ সালে মাইক্রোসফটের ক্লাউড অপারেশনস বিভাগের প্রধান নোয়েল ওয়ালশ সংবাদমাধ্যমকে জানান, তাঁরা আর কোথাও পানির নিচে ডেটা সেন্টার বানাচ্ছেন না।

মাইক্রোসফট থেমে গেলেও এই পথে এগিয়ে গেছে চীন। চীনা প্রতিষ্ঠান হাইল্যান্ডার হাইনান দ্বীপের উপকূলে বিশ্বের প্রথম বাণিজ্যিক পানির নিচের ডেটা সেন্টার চালু করেছে বলে চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম সিসিটিভি জানিয়েছে। ১ হাজার ৩০০ টন ওজনের এই স্থাপনা সমুদ্রের ৩৫ মিটার গভীরে বসানো হয়েছে। হাইল্যান্ডারের দাবি, পরিকল্পনামতো সেখানে ১০০টি মডিউল বসানো গেলে স্থলভাগের একই ক্ষমতার ডেটা সেন্টারের তুলনায় এটি বছরে প্রায় ১২ কোটি ২০ লাখ কিলোওয়াট ঘণ্টা বিদ্যুৎ এবং ১ লাখ ৫ হাজার টন সুপেয় পানি সাশ্রয় করবে।

সুপেয় পানি ছাড়া কীভাবে চলে

স্থলভাগে যেভাবে পানি বাষ্প করে সার্ভার ঠান্ডা করা হয়, সমুদ্রের নিচে সেভাবে কাজ হয় না। সেখানকার সার্ভারগুলো একটি বদ্ধ বাক্সের (মডিউল) ভেতরে থাকে। চারপাশের ঠান্ডা লবণাক্ত সমুদ্রের পানি কেবল বাক্সের বাইরের আবরণ দিয়ে তাপ শুষে নেয়। এটি অনেকটা গরম চায়ের কাপ বরফ-ঠান্ডা পানির গামলায় ডুবিয়ে রাখার মতো।

সমুদ্রের পানি সরাসরি যন্ত্রপাতির সংস্পর্শে আসে না, তাই মরিচা ধরারও ভয় নেই। এই পদ্ধতিতে বাষ্পীভবনের সুযোগ নেই, শুধু তাপের বিনিময় হয়। বিশাল সমুদ্রের সামান্য একটু পানি এতে যৎসামান্যই গরম হয়, যা পরিবেশের ক্ষতি করে না।

একই পানি কেন বারবার ব্যবহার করা যায় না

অনেকের প্রশ্ন, ডেটা সেন্টারগুলো কেন একই পানি বারবার রিসাইকেল করে না? এর বড় কারণ পানির গুণাগুণ। বাষ্পীভবন পদ্ধতিতে পানি বাষ্প হয়ে উড়ে গেলে তাতে থাকা খনিজ উপাদান (যেমন আয়রন, ক্যালসিয়াম বা লবণ) নিচে পড়ে থাকে। ফলে অবশিষ্ট পানিতে খনিজের ঘনত্ব বেড়ে যায়।

এই পানি বারবার ব্যবহার করলে খনিজ উপাদান পাইপ বা যন্ত্রপাতির গায়ে পুরু আস্তরণ বা ‘স্কেল’ তৈরি করে। মানুষের রক্তনালিতে চর্বি জমলে যেমন রক্ত চলাচলে বাধা তৈরি হয়, পাইপে আস্তরণ জমলেও তেমনি পানির প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়। এতে দামি যন্ত্রপাতির মারাত্মক ক্ষতি হয়। তাই বাধ্য হয়েই পুরোনো খনিজযুক্ত পানি ফেলে দিয়ে নতুন সুপেয় পানি ঢালতে হয়।

এর বিকল্প কী

বিকল্প হিসেবে এখন ‘ক্লোজড-লুপ’ (বদ্ধ চক্র) বা ‘ইমারশন কুলিং’ পদ্ধতি নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। গাড়ির রেডিয়েটরে যেভাবে ইঞ্জিন ঠান্ডা রাখা হয়, ক্লোজড-লুপ পদ্ধতি অনেকটা সে রকম। এতে পানি বা বিশেষ তরল একটি বদ্ধ পাইপের ভেতর দিয়ে ঘোরে, যা বাইরের বাতাসের সংস্পর্শে আসে না। তাই তরলটি বাষ্প হয়ে উড়ে যায় না এবং বারবার ব্যবহার করা যায়। অন্যদিকে ইমারশন কুলিং পদ্ধতিতে পুরো সার্ভারকেই বিদ্যুৎ-অপরিবাহী একধরনের রাসায়নিক তরলে ডুবিয়ে রাখা হয়।

এই পদ্ধতিগুলোয় পানির অপচয় প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে আসে, কিন্তু দেখা দেয় নতুন সংকট। পানি বাষ্প হয়ে প্রাকৃতিকভাবে ঠান্ডা হওয়ার সুযোগ না থাকায়, বদ্ধ গরম তরল ঠান্ডা করতে ডেটা সেন্টারগুলোয় বিশাল বৈদ্যুতিক পাখা বা শক্তিশালী এসি (চিলার বা রেফ্রিজারেশন সিস্টেম) চালাতে হয়। এতে প্রয়োজন হয় প্রচুর বিদ্যুতের। পুরো পদ্ধতি স্থাপন করাও অত্যন্ত ব্যয়বহুল।

প্রযুক্তি–দুনিয়ায় তাই একটি কথা প্রচলিত আছে—বিদ্যুৎ বাঁচাতে গেলে পানি বেশি খরচ হয়, আর পানি বাঁচাতে গেলে বিদ্যুৎ বেশি পোড়ে। এই দুটির মধ্যে পরিবেশবান্ধব ও টেকসই ভারসাম্য তৈরি করাই এখন প্রকৌশলীদের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

আরও পড়ুন