মিল্কিওয়ের জন্ম ইতিহাস নিয়ে নতুন তথ্য দিল নাসার হাবল
ডেইলি সান রিপোর্ট, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি
প্রকাশ: ২০ আগস্ট ২০২৬, ১১:৩৬ এএম
ছবি: সংগৃহীত
নাসার হাবল মহাকাশ দূরবীক্ষণযন্ত্রের তথ্য ব্যবহার করে জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সির শুরুর ইতিহাস সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ নতুন তথ্য পেয়েছেন। গবেষণায় প্রায় ১১ দশমিক ৮ বিলিয়ন বছর আগে দুটি গ্যালাক্সির একীভবনের শক্ত প্রমাণ পাওয়া গেছে।
বিজ্ঞানীদের মতে, ওই সময় তরুণ মিল্কিওয়ে ‘এলকেএইচ’ নামে তুলনামূলক ছোট একটি গ্যালাক্সিকে নিজের সঙ্গে মিশিয়ে নেয়। এর ফলে বিপুলসংখ্যক নক্ষত্র, গ্যাস ও অদৃশ্য পদার্থ মিল্কিওয়ের অংশ হয়ে যায়।
নাসা জানিয়েছে, এই আবিষ্কারের ফলে মিল্কিওয়ে কীভাবে গড়ে উঠতে শুরু করেছিল, সে সম্পর্কে বিজ্ঞানীদের ধারণা আগের তথ্যের তুলনায় প্রায় ১ দশমিক ৮ বিলিয়ন বছর পেছনে গেছে। গবেষণার বিস্তারিত ফলাফল সোমবার নেচার অ্যাস্ট্রোনমি সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়েছে।
বর্তমানে মিল্কিওয়ে একটি বিশাল সর্পিল গ্যালাক্সি, যেখানে শত শত বিলিয়ন নক্ষত্র রয়েছে। তবে শুরুতে এটি এত বড় ছিল না। বিজ্ঞানীদের ধারণা, গ্যাসের মেঘ থেকে নতুন নক্ষত্র তৈরির পাশাপাশি ছোট ছোট গ্যালাক্সির সঙ্গে একীভূত হওয়ার মাধ্যমে ধীরে ধীরে এটি বড় হয়েছে।
নতুন গবেষণায় এমনই একটি গুরুত্বপূর্ণ একীভবনের তথ্য পাওয়া গেছে। গবেষকদের মতে, প্রায় ১১ দশমিক ৮ বিলিয়ন বছর আগে ‘এলকেএইচ’ নামের একটি ছোট গ্যালাক্সি মিল্কিওয়ের সঙ্গে মিশে যায়। তখন মহাবিস্ফোরণের পর প্রায় ২ বিলিয়ন বছর পেরিয়েছিল।
গবেষণার প্রধান লেখক ও ইতালির বোলোনিয়া জ্যোতির্বিজ্ঞান ও মহাকাশবিজ্ঞান পর্যবেক্ষণকেন্দ্রের গবেষক দাভিদে মাসসারি বলেন, মিল্কিওয়ে কীভাবে তৈরি হয়েছে, তা বোঝার ক্ষেত্রে এই ছোট গ্যালাক্সির ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর ভাষায়, মিল্কিওয়ে যদি মানুষের একটি বাড়ির মতো হয়, তাহলে এলকেএইচ ছিল সেই বাড়ি তৈরির প্রথম দিকের গুরুত্বপূর্ণ ইটগুলোর একটি।
মিল্কিওয়ের প্রাচীন ইতিহাস অনুসন্ধানে বিজ্ঞানীরা বিভিন্ন মহাকাশ জরিপের তথ্য ব্যবহার করেছেন। এর মধ্যে ইউরোপীয় মহাকাশ সংস্থার গাইয়া অভিযানের তথ্যও রয়েছে।
গবেষকেরা মিল্কিওয়ের কেন্দ্র থেকে প্রায় ২০ হাজার আলোকবর্ষের মধ্যে থাকা ৩৯টি প্রাচীন গোলাকার নক্ষত্রগুচ্ছ বা গ্লোবুলার ক্লাস্টার বিশ্লেষণ করেন। এসব ক্লাস্টার একই সময়ের কাছাকাছি তৈরি হওয়া বিপুলসংখ্যক পুরোনো নক্ষত্রের ঘন সমষ্টি। নক্ষত্রগুচ্ছের বয়স ও গঠন বিশ্লেষণ করে গ্যালাক্সির অতীত সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়।
গবেষণার সহলেখক ও ইতালির বোলোনিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক কিয়ারা জেরবিনাতি বলেন, হাবলের উচ্চমানের ছবি ও বিস্তারিত তথ্যের কারণে গবেষকেরা এসব নক্ষত্রগুচ্ছের বয়স এবং ধাতবতা নির্ভুলভাবে মাপতে পেরেছেন। গাইয়ার তথ্যের সঙ্গে এসব ফল মিলিয়ে তাঁরা এমন কয়েকটি নক্ষত্রগুচ্ছ শনাক্ত করেন, যেগুলোর বৈশিষ্ট্য অন্যগুলোর চেয়ে আলাদা।
পরে গবেষকেরা বুঝতে পারেন, এসব নক্ষত্রগুচ্ছ আসলে এলকেএইচ গ্যালাক্সিতে তৈরি হয়েছিল।
নক্ষত্রগুচ্ছগুলোর বয়স ও ভারী মৌলের পরিমাণ বা ‘ধাতবতা’ বিশ্লেষণ করে গবেষকেরা তিনটি আলাদা দল শনাক্ত করেন। প্রথম দলে ছিল মিল্কিওয়ের একেবারে শুরুর সময়ে তৈরি হওয়া নক্ষত্রগুচ্ছ। এগুলো গ্যালাক্সিটির নিজস্ব প্রাথমিক গঠনের অংশ।
দ্বিতীয় দলে ছিল প্রায় ১০ বিলিয়ন বছর আগে গাইয়া-সসেজ-এনসেলাডাস নামের একটি গ্যালাক্সির সঙ্গে সংঘর্ষ ও একীভবনের সময় মিল্কিওয়ে যে নক্ষত্রগুচ্ছগুলো নিজের সঙ্গে যুক্ত করেছিল, সেগুলো।
তৃতীয় দলটিই ছিল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এই নক্ষত্রগুচ্ছগুলো এলকেএইচ গ্যালাক্সিতে তৈরি হয়েছিল। পরে প্রায় ১১ দশমিক ৮ বিলিয়ন বছর আগে এলকেএইচ মিল্কিওয়ের সঙ্গে মিশে গেলে এসব নক্ষত্রগুচ্ছও মিল্কিওয়ের অংশ হয়ে যায়।
গবেষকদের হিসাব অনুযায়ী, মিল্কিওয়ের সঙ্গে মিশে যাওয়ার সময় এলকেএইচ গ্যালাক্সিতে থাকা নক্ষত্রগুলোর মোট ভর ছিল প্রায় ৫০ কোটি সূর্যের সমান। সে সময় তরুণ মিল্কিওয়ে বর্তমানের তুলনায় অনেক ছোট ছিল। ফলে এলকেএইচের সঙ্গে এই একীভবন গ্যালাক্সিটির প্রাথমিক গঠনে বড় ধরনের প্রভাব ফেলেছিল।
এই একীভবনের মাধ্যমে মিল্কিওয়ে বিপুলসংখ্যক নক্ষত্রের পাশাপাশি গ্যাস ও অদৃশ্য পদার্থও পেয়েছিল। এর ফলে পরবর্তী সময়ে গ্যালাক্সিটির আরও বড় হয়ে ওঠার ভিত্তি শক্ত হয়।
গবেষক মাসসারি বলেন, এর আগে কিছু গবেষণায় ধারণা করা হয়েছিল, মিল্কিওয়ের শুরুর দিকের বিবর্তন মূলত এই গ্যালাক্সির ভেতরে তৈরি হওয়া নক্ষত্রের মাধ্যমে হয়েছে।
তবে নতুন গবেষণা সেই ধারণাকে আরও বিস্তৃত করেছে। গবেষকদের মতে, মিল্কিওয়ের প্রাথমিক ইতিহাস বুঝতে হলে অন্য গ্যালাক্সিতে জন্ম নেওয়া নক্ষত্রগুলোকেও হিসাবের মধ্যে রাখতে হবে।
অর্থাৎ, মিল্কিওয়ে শুধু নিজের ভেতরে নক্ষত্র তৈরি করে বড় হয়নি; অন্য ছোট গ্যালাক্সিকে নিজের সঙ্গে মিশিয়ে নিয়েও ধীরে ধীরে বড় হয়েছে। নতুন গবেষণায় প্রায় ১১ দশমিক ৮ বিলিয়ন বছর আগের এমনই একটি গুরুত্বপূর্ণ একীভবনের প্রমাণ পাওয়া গেছে।