টেলিগ্রামে কড়া, এক্সে নরম—শিশু নিপীড়নমূলক কনটেন্ট নিয়ে অ্যাপলের দ্বিমুখী নীতি
একই ধরনের অভিযোগ, অথচ শাস্তির মাত্রা সম্পূর্ণ ভিন্ন—প্রশ্ন উঠেছে অ্যাপলের নিরপেক্ষতা নিয়ে
প্রযুক্তি ডেস্ক
প্রকাশ: ০৯ আগস্ট ২০২৬, ০৪:০৪ পিএম
একই ধরনের অভিযোগ, ভিন্ন সিদ্ধান্ত—অ্যাপ স্টোরে টেলিগ্রাম ও এক্স-এর প্রতি অ্যাপলের অসম আচরণ নিয়ে উঠেছে প্রশ্ন। প্রতীকী ছবি
শিশু নিপীড়নমূলক কনটেন্ট ছড়ানোর অভিযোগে জনপ্রিয় মেসেজিং অ্যাপ টেলিগ্রামকে বারবার অ্যাপ স্টোর থেকে সরিয়ে দিলেও, একই ধরনের অভিযোগে ইলন মাস্কের এক্স-কে বারবার ছাড় দিচ্ছে প্রযুক্তি কোম্পানি অ্যাপল।
প্রযুক্তি খাতের এই দুই বড় প্ল্যাটফর্মের ক্ষেত্রে অ্যাপলের স্পষ্ট দ্বিমুখী নীতি ও রাজনৈতিক বাধ্যবাধকতা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক দেখা দিয়েছে বলে জানিয়েছে দ্য ভার্জ।
শিশু যৌন নিপীড়নমূলক কনটেন্টের উপস্থিতি শনাক্তের জেরে টেলিগ্রামকে সাময়িকভাবে অ্যাপ স্টোর থেকে সরিয়ে দেয় অ্যাপল। বিতর্কিত কনটেন্ট মুছে ফেলার পর অ্যাপটি পুনরায় ফিরিয়ে আনা হলেও, অ্যাপলের কনটেন্ট মডারেশন নীতি ও বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মের প্রতি তাদের অসম আচরণ নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।
সম্প্রতি প্রায় এক ঘণ্টার জন্য অ্যাপলের অ্যাপ স্টোর থেকে হঠাৎ গায়েব হয়ে যায় বিশ্বজুড়ে ১০০ কোটিরও বেশি মানুষের ব্যবহৃত সামাজিক প্ল্যাটফর্ম টেলিগ্রাম। বিশেষ করে যেসব দেশে কড়া সেন্সরশিপ ও সামাজিক বিধিনিষেধ রয়েছে, সেসব দেশের মানুষের কাছে টেলিগ্রাম নিরাপদ যোগাযোগের অন্যতম প্রধান আশ্রয়। ফলে অ্যাপটির হঠাৎ অনুপস্থিতি ব্যবহারকারীদের মধ্যে বড় ধরনের উদ্বেগ তৈরি করে।
পরে অ্যাপল স্পষ্ট করে জানায়, শিশু যৌন নিপীড়নমূলক বেআইনি উপাদান পাওয়ার কারণেই প্ল্যাটফর্মটি সাময়িকভাবে সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল। সংশ্লিষ্ট কনটেন্ট পুরোপুরি সরিয়ে ফেলার পর অ্যাপ স্টোরে টেলিগ্রামের উপস্থিতি পুনর্বহাল করা হয়।
টেলিগ্রামের বিরুদ্ধে অ্যাপল দ্রুত ব্যবস্থা নিলেও ইলন মাস্কের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এর ক্ষেত্রে তাদের ছাড় দেওয়ার ইতিহাস দীর্ঘদিনের। এক্স-এর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা চ্যাটবট গ্রক ব্যবহার করে শিশুদের বিকৃত ও যৌন উদ্দীপক ছবি বা ডিপফেইক তৈরি হয়ে পুরো প্ল্যাটফর্মে ছড়িয়ে পড়লেও অ্যাপ স্টোর থেকে সরানোর কোনো পদক্ষেপ নেয়নি অ্যাপল।
বিশ্লেষকরা বলছেন, প্ল্যাটফর্মভেদে এই ধরনের সিদ্ধান্তের পেছনের কারণ প্রযুক্তিগত নয়, বরং রাজনৈতিক। জর্জটাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন ও প্রযুক্তি বিষয়ক অধ্যাপক অনুপম চন্দর এ প্রসঙ্গে বলেন, বড় ও প্রভাবশালী কোনো প্ল্যাটফর্মের বিরুদ্ধে পূর্ণাঙ্গ কনটেন্ট মডারেশন নীতি প্রয়োগ করতে গেলে যে সম্ভাব্য বড় রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়ার মুখে পড়তে হয়, সেই ঝুঁকি নিতেই হয়।
দুবাইভিত্তিক কোম্পানি টেলিগ্রাম শুরু থেকেই তথ্যের সেন্সরশিপ বা মডারেশনের ক্ষেত্রে শিথিল নীতির জন্য পরিচিত। অন্যদিকে বিশেষজ্ঞদের মতে, এক্স-কে অ্যাপ স্টোর থেকে সরালে অ্যাপলকে যে রাজনৈতিক ঝড়ের মুখে পড়তে হতো, টেলিগ্রামের ক্ষেত্রে সেই ঝুঁকি ছিল না—আর এই পার্থক্যই একই ধরনের বা তার চেয়েও স্পর্শকাতর ঘটনার ক্ষেত্রে ভিন্ন নীতি প্রয়োগের কারণ।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সরকারের পক্ষ থেকে টেলিগ্রামের ওপর কড়াকড়ি আরোপ ও কনটেন্ট সরিয়ে নেওয়ার দাবি ক্রমাগত বেড়েছে। ২০১৭ সালে ইন্দোনেশিয়া সরকারের নিষেধাজ্ঞার হুমকির পর সন্ত্রাসবাদ সম্পর্কিত কনটেন্ট মুছতে শুরু করে টেলিগ্রাম। ২০২২ সালে উসকানিমূলক ও বিদ্বেষপূর্ণ মন্তব্য ছড়ানোর অভিযোগে অ্যাপটি নিষিদ্ধের কথা বিবেচনা করেছিল জার্মানি।
পরিস্থিতি সবচেয়ে জটিল আকার নেয় ২০২৪ সালে, যখন ফ্রান্সে টেলিগ্রামের রুশ বংশোদ্ভূত প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী পাভেল দুরভকে গ্রেপ্তার করা হয়। অবৈধ লেনদেন ও শিশু নিপীড়নমূলক কনটেন্ট ছড়ানোয় সহযোগিতার অভিযোগ আনে ফরাসি কর্তৃপক্ষ। এছাড়া গত মাসে রাশিয়া দুরভের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবাদে সহায়তার আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দায়ের করে। ক্রেমলিনের দাবি, ইউক্রেনীয় গোয়েন্দারা রাশিয়ায় হামলার পরিকল্পনায় টেলিগ্রাম ব্যবহার করছে।
এসব চাপের মুখে টেলিগ্রাম তাদের কনটেন্ট মডারেশন নীতিতে কড়া পরিবর্তন আনতে বাধ্য হয়েছে। প্রাইভেট মেসেজিং মডারেশনের ক্ষেত্রে কঠোর অবস্থান নেওয়ার কথা জানিয়েছে তারা। ‘আশপাশের ব্যবহারকারী খুঁজে বের করার’ মতো কয়েকটি বিতর্কিত ফিচার বন্ধ করা হয়েছে, অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত সন্দেহে ব্যবহারকারীদের তথ্য চেয়ে আদালতের নির্দেশে সাড়া দিতে শুরু করেছে এবং বেআইনি কনটেন্ট শনাক্তে নজরদারি বাড়িয়েছে অ্যাপটি।
অধ্যাপক অনুপম চন্দর বলেন, ‘টেলিগ্রামের তুলনায় যুক্তরাষ্ট্রে এক্স-এর রাজনৈতিক ভিত্তি ও সমর্থন অনেক বেশি শক্তিশালী। টেলিগ্রামকে অ্যাপ স্টোর থেকে সরানোর চেয়ে এক্স-কে সরালে অ্যাপলকে যে ভয়াবহ রাজনৈতিক ঝড়ের মুখে পড়তে হতো, তা তারা এড়াতে চেয়েছে।’
উল্লেখ্য, ২০১৮ সালেও শিশু যৌন নির্যাতনমূলক কনটেন্টের কারণে টেলিগ্রামকে সাময়িকভাবে অ্যাপ স্টোর থেকে সরিয়ে দিয়েছিল অ্যাপল। বেআইনি কনটেন্টের প্রশ্নে টেলিগ্রামের বিরুদ্ধে অ্যাপল যতটা কঠোর, এক্স-এর ক্ষেত্রে ততটাই ভিন্ন নীতি দেখিয়েছে তারা।
গত বছরের শেষদিকে এক্স-এর এআই চ্যাটবট গ্রক ব্যবহার করে ছবি এডিটের সুবিধা চালু হলে পুরো প্ল্যাটফর্মে প্রাপ্তবয়স্ক ও শিশুদের বিকৃত যৌন উদ্দীপক ডিপফেইক ছবি ছড়িয়ে পড়ে। এই ঘটনার পর যুক্তরাজ্য ও ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ বিশ্বজুড়ে তীব্র ক্ষোভ তৈরি হয় এবং অ্যাপল ও গুগলের অ্যাপ স্টোর থেকে এক্স-কে সরানোর দাবি ওঠে। সম্মতি ছাড়া ডিপফেইক ছবি তৈরির অভিযোগে এক্স ও এর এআই কোম্পানি এক্সএআই-এর বিরুদ্ধে মামলাও করেন মাস্কের এক সন্তানের মা অ্যাশলে সেন্ট ক্লেয়ার ও একদল কিশোর-কিশোরী।
এত বৈশ্বিক চাপ ও আইনি জটিলতার পরও এক্স-কে অ্যাপ স্টোর থেকে সরায়নি অ্যাপল। বরং পর্দার আড়ালে আলোচনার মাধ্যমে পরিবর্তন আনার অনুরোধ জানিয়ে আসছে তারা। মার্কিন সিনেটরদের কাছে পাঠানো এক চিঠির বরাত দিয়ে এনবিসি নিউজ জানিয়েছে, গ্রকের ডিপফেইক কেলেঙ্কারির পর নানা অভিযোগ ও প্রতিবেদন দেখে অ্যাপল নিজে থেকেই এক্স-এর সঙ্গে যোগাযোগ করে এবং কনটেন্ট মডারেশন ব্যবস্থার উন্নতির জন্য স্পষ্ট পরিকল্পনা জমা দিতে বলে।
পরবর্তীতে অ্যাপল জানায়, এক্স তাদের নীতিমালার লঙ্ঘন অনেকটাই সমাধান করেছে। তবে গ্রকের দলকে সতর্ক করে বলা হয়, প্রয়োজনীয় পরিবর্তন না আনলে অ্যাপ স্টোর থেকে সরিয়ে দেওয়া হতে পারে। এই বিতর্কের মুখে চলতি বছরের জানুয়ারিতে মাস্ক এক বিবৃতিতে বলেন, ‘বেআইনি কোনো উপাদান প্রকাশের ক্ষেত্রে সাধারণ নিয়মই প্রযোজ্য—গ্রক ব্যবহার করে অবৈধ কনটেন্ট তৈরি করলেও ব্যবহারকারীকে একই পরিণতি ভোগ করতে হবে।’
গ্রক ব্যবহার করে শিশুদের বিকৃত ছবি তৈরি ও ছড়ানোর অভিযোগে এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে সরাসরি মামলাও করেছে মাস্কের এআই কোম্পানি এক্সএআই। তবে এই বিতর্ক চলাকালে এক্স বা গ্রক—কোনোটিকেই অ্যাপ স্টোর থেকে সরায়নি অ্যাপল।
অধ্যাপক অনুপম চন্দরের ভাষ্যে, এক্স-কে অ্যাপ স্টোর থেকে সরানোর সিদ্ধান্ত নিতে হলে তা আসতে হবে অ্যাপলের সিইও বা পরিচালনা পর্ষদের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে। এমন সিদ্ধান্তের ফলে মাস্কের মতো প্রভাবশালী ও ক্ষুব্ধ ব্যক্তিত্বের প্রতিক্রিয়ার মুখে পড়া এবং এর রাজনৈতিক পরিণতি ভোগের প্রস্তুতি অ্যাপলকে নিতে হতো।
মাস্ককে চটালে কী হতে পারে, তা অ্যাপল ভালোভাবেই জানে। ২০২২ সালে টুইটার (বর্তমান এক্স) কেনার পরপরই মাস্ক প্রকাশ্যে অভিযোগ তুলেছিলেন, অ্যাপল অ্যাপ স্টোরে তাদের সীমিত করার চেষ্টা করছে। তবে সেই বিতর্ক বেশি দূর গড়ায়নি—অ্যাপল প্রধান নির্বাহী টিম কুক সরাসরি অ্যাপল কার্যালয়ে মাস্ককে স্বাগত জানিয়ে মুখোমুখি আলোচনার মাধ্যমে সেই ‘ভুল বোঝাবুঝির’ অবসান ঘটান।
অন্যদিকে টেলিগ্রামের প্রতিষ্ঠাতা দুরভের দাবি, টেলিগ্রামের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার আগে অ্যাপল তাদের সঙ্গে কোনো যোগাযোগই করেনি। দুটি অ্যাপের ক্ষেত্রে এই স্পষ্ট বৈষম্যমূলক আচরণ নিয়ে আনুষ্ঠানিক মন্তব্য করতে রাজি হয়নি অ্যাপল। কোনো অ্যাপ অ্যাপ স্টোর থেকে সরানো বা রাখার সিদ্ধান্ত ঠিক কীভাবে নেওয়া হয়, সেই অভ্যন্তরীণ প্রক্রিয়া সবসময়ই গোপন রাখে প্রতিষ্ঠানটি।
সাম্প্রতিক এসব ঘটনা ইঙ্গিত দেয়, অ্যাপলের কড়া নীতিমালার মধ্যেও রয়েছে নমনীয়তার সুযোগ—আর প্রতিপক্ষ যখন বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী ধনকুবের, তখন তো বটেই।