কর্মক্ষেত্রে সততা, সময়ানুবর্তিতা ও আমানতদারির সঙ্গে দায়িত্ব পালনের মাধ্যমে উপার্জন হালাল রাখা সম্ভব। ছবি: সংগৃহীত
জীবন-জীবিকার প্রয়োজনে প্রতিদিন কোটি কোটি মানুষ কর্মস্থলের দিকে ছুটছেন। কারো গন্তব্য অফিস, কারো কারখানা, দোকান কিংবা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। সংসারের খরচ, সন্তানের পড়াশোনা আর পরিবারের নানাবিধ প্রয়োজন মেটাতে কর্মব্যস্ততা মানুষের জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। তবে একজন মুসলিমের কাছে চাকরি বা ব্যবসা কেবলই মাস শেষে অর্থ বা বেতন পাওয়ার মাধ্যম নয়; বরং এটি সততা, আমানতদারি, দায়িত্ববোধ ও আল্লাহভীতির এক বড় পরীক্ষাস্থল।
ইসলাম মানুষকে সর্বদা কর্মমুখর হতে শেখায় এবং হালাল জীবিকা অর্জনে সর্বোচ্চ উৎসাহিত করে। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ এরশাদ করেছেন, ‘অতঃপর যখন নামাজ শেষ হবে, তখন তোমরা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়ো এবং আল্লাহর অনুগ্রহ অনুসন্ধান করো।’ (সুরা: আল-জুমুআহ, আয়াত: ১০) তাই হালাল পথে জীবিকা খোঁজার পাশাপাশি কর্মক্ষেত্রে ইসলামের চিরন্তন নীতিমালা মেনে চলা প্রতিটি মুমিনের জন্য জরুরি।
একজন চাকরিজীবী মাস শেষে যে বেতন পান, তা দিয়ে তিনি সংসার চালান, মা-বাবার ওষুধ কেনেন কিংবা সন্তানের পড়াশোনার খরচ জোগান। তাই এই উপার্জনের উৎসটি সম্পূর্ণ পবিত্র ও নিষ্কলুষ হওয়া আবশ্যক। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘কোনো ব্যক্তি নিজ হাতের উপার্জনের চেয়ে উত্তম খাদ্য কখনো ভক্ষণ করেনি।’ (বুখারি, হাদিস: ২০৭২)
কর্মজীবনের সবচেয়ে বড় আমানত হলো সময় ও অর্পিত দায়িত্ব। একজন কর্মী যে নির্দিষ্ট সময়ের বিনিময়ে বেতন নিচ্ছেন, সেই সময়টুকু প্রতিষ্ঠানের কাজেই ব্যয় করা তার নৈতিক ও ধর্মীয় দায়িত্ব। কোনো ধরনের কারসাজি বা ফাঁকিবাজির মাধ্যমে এই সময়ের অপচয় করা আমানতের খেয়ানত করার শামিল, যার হিসাব আল্লাহর দরবারে দিতে হবে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের নির্দেশ দিচ্ছেন, তোমরা আমানতসমূহ তার হকদারদের কাছে পৌঁছে দাও।’ (সুরা: আন-নিসা, আয়াত: ৫৮)
পেশাগত জীবনে যোগ্যতার পাশাপাশি উত্তম চরিত্রের সমন্বয় থাকা জরুরি। অধীনস্থ কর্মী বা সহকর্মীদের সাথে পারস্পরিক আচরণ কেমন হবে, সে বিষয়ে ইসলামের স্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে। কর্মস্থলে কাউকে ছোট করা, সহকর্মীর পেছনে নিন্দা (গিবত) করা, অন্যের কৃতিত্ব নিজের নামে চালিয়ে দেওয়া কিংবা অহংকার করা ইসলামের দৃষ্টিতে মারাত্মক অন্যায়। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমরা একে অন্যের প্রতি উপহাস করো না... এবং একে অন্যের গিবত করো না।’ (সুরা: আল-হুজুরাত, আয়াত: ১১-১২)
জীবিকার ব্যস্ততা যেন মানুষের জীবনের মূল উদ্দেশ্যকে ভুলিয়ে না দেয়। কাজের অজুহাতে নামাজ ও অন্যান্য ফরজ ইবাদত অবহেলা করা যাবে না। আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয়ই নামাজ মুমিনদের ওপর নির্ধারিত সময়ে ফরজ করা হয়েছে।’ (সুরা: আন-নিসা, আয়াত: ১০৩)
একই সাথে নিজ নিজ পেশায় দক্ষতা অর্জন করাও ইসলামের দৃষ্টিতে দায়িত্বের অংশ। একজন চিকিৎসক, শিক্ষক, প্রকৌশলী বা ব্যবসায়ীকে অবশ্যই তার কাজে পারদর্শী হতে হবে, কারণ অযোগ্যতা লুকিয়ে দায়িত্ব নেওয়া সমাজ ও ব্যক্তি উভয়ের জন্যই ক্ষতির কারণ হতে পারে।
দিনশেষে ঘরে ফেরার সময় ক্লান্ত শরীরে যদি এই আত্মতৃপ্তি ও স্বস্তি থাকে যে—‘আজ আমি কারও হক নষ্ট করিনি, হারামে জড়াইনি এবং দায়িত্বে ফাঁকি দিইনি’, তবেই একজন মানুষের কর্মজীবন সফল এবং তা ইবাদতে পরিণত হবে।