সাক্ষাৎকার - ড. মো. আলী আফজাল রিহ্যাব সভাপতি
আত্মঘাতী সিদ্ধান্তে ধ্বংসের মুখে আবাসন খাত
জমির মালিকের ওপর ১৫% কর আত্মঘাতী, হুমকিতে ৫০ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব
ডেইলি সান রিপোর্ট
প্রকাশ: ২০ জুন ২০২৬, ১১:০০ এএম
রিহ্যাব সভাপতি ড. মো. আলী আফজাল।
প্রস্তাবিত বাজেটে জমি বা ফ্ল্যাট মালিকের ওপর ১৫ শতাংশ মূলধনি কর আরোপের মতো আত্মঘাতী সিদ্ধান্তে আবাসন খাত ধ্বংসের মুখে পড়েছে বলে জানিয়েছেন রিহ্যাব সভাপতি ড. মো. আলী আফজাল। তিনি বলেন, আবাসন খাত ধ্বংস হলে সরকারের ৫০ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব হুমকিতে পড়বে। আঘাত আসবে ৫০ লাখ মানুষের কর্মসংস্থানে। তিনি প্রস্তাব উত্থাপন করে বলেন, ক্রেতারা কি জমি বা ফ্ল্যাট বিক্রি করে কর দেবেন? কারণ কোনো ডেভেলপার প্রতিষ্ঠান লোকসান করবে না। এতে পুরো চাপ ক্রেতার ওপর পড়বে। প্রস্তাবিত বাজেটের নতুন করকাঠামো এক ধরনের জুলুম। এটা প্রত্যাহার করতে হবে।
গতকাল বাংলাদেশ প্রতিদিনকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে এসব কথা বলেন আবাসন খাতের সংগঠন রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড হাউজিং অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (রিহ্যাব) সভাপতি ড. মো. আলী আফজাল। তাঁর মতে প্রস্তাবিত বাজেটে রিহ্যাবের দাবির প্রতিফলন নেই। ফলে আবাসন খাত পুরোপুরি অবহেলিত। রাষ্ট্র মনে করে এ খাত কর আদায়ের মেশিন, চাপ দিলেই টাকা বের হবে। আবাসন খাতের সহযোগী ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ শিল্পের সব পণ্যের দাম প্রায় ৩১ শতাংশ বেড়েছে। ফলে প্রায় ৬০ শতাংশ ফ্ল্যাট বিক্রি কমে গেছে। আবাসন ব্যবসায়ীরা ভালো নেই। ব্যবসা ভালো চলছে না। সঠিক নীতিমালার অভাবে প্রতি বছর প্রায় ৬০ হাজার কোটি টাকা অপ্রদর্শিত অর্থ হিসেবে তৈরি হয়। প্রস্তাবিত বাজেট নিয়ে আবাসন খাতের মূল্যায়ন তুলে ধরে বলেন, পরিষ্কারভাবে বলছি আবাসন ব্যবসায়ীরা ভালো নেই। ব্যবসা ভালো চলছে না। বৈশ্বিক যুদ্ধ পরিস্থিতি, জুলাই এবং অন্তর্বর্তী সময়ের প্রভাবে প্রায় ৬০ শতাংশ ফ্ল্যাট বিক্রি কমে গেছে। আবাসন খাতের সহযোগী ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ শিল্পের সব পণ্যের দাম প্রায় ৩১ শতাংশ বেড়েছে। আমাদের প্রত্যাশা ছিল আবাসনশিল্পের জন্য সরকারের পক্ষ থেকে নীতিসহায়তা দেওয়া হবে। যদিও সরকার খাদ্য ও কৃষির জন্য প্রণোদনা দিচ্ছে। কিন্তু আবাসনের জন্য কী দিচ্ছে? সরকারের মনে রাখা উচিত, বাংলাদেশের ১৮ কোটি মানুষের জন্য আবাসনের ব্যবসা করতে হবে। ২০৫০ সালে দেশের জনসংখ্যা ২৫ কোটি হবে। ছোট এই ভূখণ্ডে আবাসন ও খাদ্য দুটিই দিতে হবে। কিন্তু দুর্ভাগ্য, এ খাত অবহেলায় ছিল। অবহেলায় রয়ে গেছে।
প্রস্তাবিত বাজেটের নতুন করকাঠামোর প্রভাব আবাসন খাতের প্লট ও ফ্ল্যাট বিক্রিতে কতটুকু পড়বে-এমন প্রশ্নের জবাবে রিহ্যাব সভাপতি বলেন, মোবাইল কেনার মতো বাজারে গিয়ে কিনে নিয়ে এলাম, এভাবে আবাসন খাতে কেনাবেচা হয় না। প্লট- ফ্ল্যাট দীর্ঘ সময় ধরে কেনাবেচা হয়। কোনো ক্রেতা ৮ হাজার টাকা প্রতি বর্গফুট হিসেবে দুই বছর কিস্তি দেওয়ার পর ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ শিল্পের সব পণ্যের দাম প্রায় ৩১ শতাংশ বেড়ে গেলে, তার প্রভাব পড়ে ডেভেলপারদের ওপর। বাজেটে যে কর আরোপ করা হয়েছে, এতে সবকিছুর দাম আরও বেড়ে গেছে ১০ থেকে ১২ শতাংশ। তার মানে সবকিছুর দাম ৪৫ শতাংশ বেড়ে গেলে সেই মূল্যবৃদ্ধি যদি চাপিয়ে দেওয়া হয়, ক্রেতা তা মানবে না। কারণ ক্রেতার সঙ্গে আমার দুই বছর আগে চুক্তি হয়েছে। এতে ডেভেলপার ভবন নির্মাণকাজ শেষ করতে পারবেন না। এটা একটা বড় চ্যালেঞ্জ। এখানে রাষ্ট্র কোনো সহায়তা করছে না। ড. মো. আলী আফজাল বলেন, ডেভেলপাররা যখন জমি নেন, তাতে আগে থেকেই সাইনিং মানিতে ১৫ শতাংশ কর আছে। বাজেটে নতুন প্রস্তাব আসছে, জমির মালিককে তাঁর অংশের জন্য মূলধনি কর ১৫ শতাংশ দিতে হবে, এটা একটা আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত। একজন মানুষের সারা জীবনের অর্জন ৫ কাঠা জমি। সে যখন দেখবে এতে বিল্ডিং করার জন্য দেড় কোটি টাকা ট্যাক্স দিতে হচ্ছে, তখন বলবে, এর থেকে বিল্ডিং করব না। দেশের অসংখ্য সরকারি কর্মকর্তার সারা জীবনের অর্জন একটি প্লট। তাদের বিল্ডিং করার সামর্থ্য নেই। এ কারণেই সে ডেভেলপার প্রতিষ্ঠানের কাছে ভবন নির্মাণ করতে যায়। বিনিময়ে হয়তো ৫০-৫০ রেশিও চুক্তি হয়। জমির মালিক হয়তো ১০টি ফ্ল্যাট পান। এই ১০টি ফ্ল্যাটের দাম যদি ১০ কোটি টাকা হয়, তাকে দেড় কোটি টাকা কর দিতে হবে। জমির মালিক এ টাকা কোথায় পাবেন? তিনি কি আবার তার জমি-ফ্ল্যাট বিক্রি করে কর দেবেন? এতে পুরো চাপ ক্রেতার ওপর পড়বে। কারণ ডেভেলপার প্রতিষ্ঠান লোকসান করবে না। ফলে প্রস্তাবিত বাজেটে এই নতুন কর এক ধরনের জুলুম। এটা অবশ্যই প্রত্যাহার হতে হবে।
আবাসন খাতের এই নেতার অভিযোগ, বাংলাদেশে জমি ও ফ্ল্যাটের রেজিস্ট্রেশন খরচ পুরো এশিয়া মহাদেশের মধ্যে সর্বোচ্চ। সরকারই অপ্রদর্শিত অর্থ তৈরি করছে। ক্রেতা যখন আড়াই কোটি টাকা দিয়ে একটি ফ্ল্যাট কিনছে, রাষ্ট্রের আইন মেনে মৌজা রেট তখন ৫০ লাখ টাকা। তার ১৫ শতাংশ বা সাড়ে ৭ লাখ টাকা সরকার কর পাচ্ছে। আর ক্রেতা তার সম্পদ পেয়ে যাচ্ছে। মাঝখানে ব্যবসায়ীর ২ কোটি টাকা অপ্রদর্শিত হয়ে যায়। এ সিস্টেমের জন্য প্রতি বছর ৪০ থেকে ৬০ হাজার কোটি টাকা অপ্রদর্শিত অর্থ তৈরি হয়। এ কারণে কর ৩ শতাংশ করার দাবি করেছে রিহ্যাব। কিন্তু প্রস্তাবিত বাজেটে রিহ্যাবের দাবির প্রতিফলন নেই। ফলে আবাসন খাত পুরোপুরি অবহেলিত। রাষ্ট্রের কোনো ভাবনাই নেই। রাষ্ট্র মনে করে এ খাত কর আদায়ের মেশিন, চাপ দিলেই টাকা বের হবে। ড. মো. আলী আফজাল বলেন, আমরা অনেক দিন ধরেই গেইন ট্যাক্স দিয়ে আসছি। নিয়ম হলো, গেইন ট্যাক্স ৫% অথবা শতাংশপ্রতি ৬০ হাজার টাকা। সরকার বা এনবিআর ৬০ হাজার টাকার কথা বলে না, শুধু বলে ৫% গেইন ট্যাক্স। আসলে যেটা বেশি হয়, সরকার সেটাই নেয়। রাষ্ট্রের এখানে বাণিজ্য না করে উল্টা করা উচিত, এর মধ্যে যেটা কম হবে, জনগণ সেটা দেবে। মজার বিষয় হলো, সাভারের যেসব নিচু জমি আছে সেগুলো ১ লাখ টাকায় কেনাবেচা হয়। ১ লাখ টাকা জমির দাম, আর গেইন ট্যাক্স ৬০ হাজার টাকা। এটা কি বাস্তবসম্মত? এভাবে আবাসন খাত ধ্বংস করার জন্য যা যা দরকার, সবই করা আছে।
আবাসন খাতের সেকেন্ডারি বাজার প্রসঙ্গ তুলে ধরে রিহ্যাবের এই শীর্ষ নেতা বলেন, আমরা চেয়েছিলাম একটা সেকেন্ডারি মার্কেট তৈরি হোক। একটা গাড়ি রিসেল করলে পুনরায় রেজিস্ট্রি হয় না। শুধু নাম বদলের ফি দিতে হয়। কিন্তু ফ্ল্যাট রিসেলের ক্ষেত্রে আবার রেজিস্ট্রি করে বড় খরচ করতে হয়। এখানে গাড়ির মতো নাম বদলের সিস্টেম থাকলে সেকেন্ডারি মার্কেট তৈরি হতো।
আবাসন খাতে ঋণব্যবস্থা নিয়ে হতাশা প্রকাশ করে রিহ্যাব সভাপতি বলেন, বিভিন্ন দেশে ২০ বছরের দীর্ঘমেয়াদি আবাসন খাতের ঋণব্যবস্থা চালু থাকলেও বাংলাদেশে সেই সুযোগ নেই। কয়েক দিন আগে বন্ধ কলকারখানার জন্য ৬০ হাজার কোটি টাকার তহবিল দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। আমরা গভর্নরকে যখন প্রশ্ন করি, আবাসন খাতের জন্য আছে কি না? তিনি বললেন, নেই। তারা ৭ শতাংশে ব্যবসায়ীদের ঋণ দেবে, সেখানে আবাসন খাত নেই। বাংলাদেশে কি আবাসনের দরকার নেই? আমরা বাংলাদেশ ব্যাংককে প্রস্তাব দিয়েছিলাম যে উপজেলাতে বাড়ি করলে ২ শতাংশ সুদের হার থাকবে। এতে অনেকেই ঢাকায় বাড়ি না করে উপজেলায় বাড়ি করবে। রিহ্যাব সভাপতি ড. মো. আলী আফজাল বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনা বা ড্যাপ প্রসঙ্গ তুলে ধরে বলেন, এটা দেশের জন্য মারাত্মক ক্ষতি হয়েছে। কোন উর্বর মস্তিষ্ক থেকে আসছে আমি জানি না। বাংলাদেশ ১৮ কোটি মানুষের দেশ। ছোট একটা ভূখণ্ড। এ দেশের আয়তন বাড়বে না। জনসংখ্যা বাড়বে। তাই এক ইঞ্চি চাষযোগ্য জমি নষ্ট করা যাবে না। প্রত্যেক জমিকে জোনিং করতে হবে যে এ জমি চাষের জন্য, এ জমি বাড়ির জন্য। সিঙ্গাপুর, হংকংয়ে ৪০-৫০ তলা বিল্ডিং হয়। আমাদের মাটির কোনো সমস্যা নেই। মতিঝিলে যে ৪০ তলা সিটি সেন্টার বিল্ডিং হয়েছে, সেটা তো দেবে যায়নি। মিরপুরে বড় ভবন হয়েছে। সরকারের উল্টা বলা উচিত ছিল, ৪০ তলা সিটি সেন্টারের রাস্তায় বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে হাই কোর্ট পর্যন্ত কোনো বিল্ডিংই ৪০ তলার নিচে করা যাবে না। সরকার আর একটা কাজ করতে পারত, একটা আইকনিক ডিজাইন কালার বলে দিতে পারত, তাহলে সেই ব্যাংকপাড়া একটা আইকনিক সিটি হতো। একই সঙ্গে ফার্মগেট থেকে মিরপুর পর্যন্ত আইডিবির মতো ২০ তলা বিল্ডিং না হলে, দৃষ্টিনন্দন জায়গা হতো। একই সঙ্গে অসংখ্য মানুষের বসবাসের জায়গা হতো। সেটা না করে বলা হচ্ছে, মিরপুরে তিন-চার তলার ওপরে বিল্ডিং করা যাবে না। এটা বৈষম্য। মিরপুর ডিওএইচএসে ৪ কাঠা জমিতে আট তলার বিল্ডিং করা যায়। কিন্তু দেয়ালের ওপাশে ৫ কাঠা জমিতে চার তলার বেশি করা যাবে না। একই দেশের নাগরিক, কিন্তু বৈষম্য হচ্ছে।
সূত্র: বাংলাদেশ প্রতিদিন