৬ কারণে ব্যালন ডি’অর পাচ্ছে না ব্রাজিলের ফুটবলাররা
খেলা ডেস্ক
প্রকাশ: ২৮ অক্টোবর ২০২৬, ০৩:৫১ পিএম
ছবি: রয়টার্স
লন্ডন প্যালাডিয়ামে সোমবার রাতে ব্যালন ডি’অরের ৭০তম আসরে ছেলেদের শীর্ষ দশে কোনো ব্রাজিলিয়ান ছিলেন না। ভিনিসিয়ুস জুনিয়র হয়েছেন ১৭তম। ২০০৭ সালে কাকার পর ১৯ বছরেও সোনালি বল আসেনি ব্রাজিলে। অথচ ১৯৯৭ থেকে ২০০৭ সালের মধ্যে পাঁচবার পুরস্কারটি জিতেছিল দেশটি। কেন এই খরা? বিশ্লেষণে উঠে এসেছে ছয়টি কারণ।
ফুটবল বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় এবং মর্যাদাপূর্ণ ব্যক্তিগত পুরস্কার ‘ব্যালন ডি’অর’। কিন্তু একসময়ের বিশ্ব ফুটবল কাঁপানো ব্রাজিলের জন্য এই ট্রফিটি এখন যেন এক দীর্ঘ মরুভূমি। ২০০৭ সালে কাকার পর দীর্ঘ প্রায় দুই দশকেও কোনো ব্রাজিলিয়ান ফুটবলার এই সোনালী ট্রফিটি হাতে তুলতে পারেননি। নেইমার জুনিয়র থেকে শুরু করে সাম্প্রতিক সময়ে ভিনিসিয়ুস জুনিয়রের মতো তারকারাও ট্রফির খুব কাছে গিয়েও ব্যর্থ হয়েছেন।
১. আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টে (বিশ্বকাপ ও কোপা) ব্যর্থতা
ব্যালন ডি’অর জয়ের ক্ষেত্রে জাতীয় দলের হয়ে বড় টুর্নামেন্ট জেতা অন্যতম প্রধান শর্ত হিসেবে দেখা হয়। অথচ ২০০২ সালের পর ব্রাজিল আর কোনো বিশ্বকাপ জিততে পারেনি, এমনকি সেমিফাইনাল বা ফাইনালে ওঠার লড়াইয়েও তারা নিয়মিত মুখ থুবড়ে পড়ছে। ২০২৪ সালে কোপা আমেরিকায় ভিনিসিয়ুসের নিষ্প্রভ পারফরম্যান্স এবং জাতীয় দলের সার্বিক ব্যর্থতা তাকে ক্লাবের দারুণ সাফল্যের পরও ব্যালন ডি’অরের রেস থেকে ছিটকে দিয়েছিল।
২. ইউরোপীয় ফুটবলের ট্যাকটিক্যাল রূপান্তর
ব্রাজিলিয়ান ফুটবল মানেই ছিল ‘জোগা বোনিতো’ বা শৈল্পিক ফুটবল। কিন্তু আধুনিক ইউরোপীয় ফুটবল এখন অনেক বেশি গতিশীল, শারীরিক ও কৌশলনির্ভর। ব্রাজিলের অনেক ফুটবলার শৈশবে কেবল ড্রিবলিং বা ব্যক্তিগত স্কিলের ওপর নির্ভর করে বড় হলেও ইউরোপের কঠিন ট্যাকটিক্যাল সেটআপে এসে ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে হিমশিম খাচ্ছেন।
৩. একক তারকার ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা
ফুটবল কিংবদন্তি রোমারিওর মতে, ব্রাজিলিয়ান ফুটবলের অন্যতম বড় সমস্যা হলো পুরো দেশের প্রত্যাশা কেবল একজন তারকার ওপর চাপিয়ে দেওয়া। আগে যেখানে রোনালদো, রিভালদো, রোনালদিনহোরা একসাথে খেলতেন, সেখানে গত এক দশকে কেবল নেইমার এবং বর্তমানে কেবল ভিনিসিয়ুস বা রাফিনহাদের ওপর পুরো দলের ভার দেওয়া হচ্ছে। ফলে তারা অতিমাত্রায় চাপে পিষ্ট হয়ে যান।
৪. মাঠের বাইরের বিতর্ক ও শৃঙ্খলার অভাব
ব্রাজিলিয়ান ফুটবলারদের একটি বড় অংশের বিরুদ্ধে মাঠের বাইরের লাইফস্টাইল, অতিরিক্ত পার্টি করা এবং শৃঙ্খলার অভাবের অভিযোগ দীর্ঘদিনের। নেইমার তার ক্যারিয়ারের সেরা সময়েও ইনজুরি এবং মাঠের বাইরের নানা বিতর্কের কারণে আলো হারাতে বসেন। অন্যদিকে, ভিনিসিয়ুস জুনিয়রের মাঠে মেজাজ হারানো বা প্রতিপক্ষের খেলোয়াড় ও দর্শকদের সাথে তর্কে জড়ানোর বিষয়টিও ব্যালন ডি’অরের ভোটারদের মানসিকতায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলে বলে মনে করেন অনেক বিশ্লেষক।
৫. ইউরোপীয় সংবাদমাধ্যমের হাইপ ও ‘পিআর’ লড়াই
ব্যালন ডি’অরের ক্ষেত্রে এখন পাবলিক রিলেশনস এবং মিডিয়া হাইপ বড় ভূমিকা রাখে। ইউরোপের দেশগুলো (যেমন: স্পেন, ফ্রান্স বা ইংল্যান্ড) তাদের খেলোয়াড়দের নিয়ে যেভাবে প্রচার চালায়, ল্যাটিন আমেরিকার ফুটবলাররা অনেক সময় সেই তুলনায় মিডিয়া কাভারেজ কম পান। ভোট দেওয়ার দায়িত্বে থাকা সাংবাদিকদের ওপর এই মিডিয়া ন্যারেটিভ পরোক্ষ প্রভাব বিস্তার করে।
৬. ব্রাজিলের ঘরোয়া একাডেমিগুলোর কাঠামোগত দুর্বলতা
ব্রাজিলিয়ান ক্লাব ও যুব একাডেমিগুলোর ফুটবলার তৈরির কাঠামো আগের মতো শক্তিশালী নেই। ইউরোপের ক্লাবগুলো খুব অল্প বয়সেই লাতিন প্রতিভাদের কিনে নেয়। ফলে নিজেদের চেনা পরিবেশে পূর্ণাঙ্গ ফুটবলার হিসেবে গড়ে ওঠার আগেই তারা ইউরোপের কঠিন প্রতিযোগিতায় পড়ে খেই হারিয়ে ফেলেন। টেকসই প্রতিভা বিকাশের এই অভাবই আজ ব্রাজিলকে ব্যালন ডি'অর থেকে দূরে রাখছে।
লাতিন ফুটবলের জাদু আর সৌন্দর্য দিয়ে একসময় ব্যালন ডি’অর শাসন করত সেলেসাওরা। তবে আধুনিক ফুটবলের পরিবর্তনের সাথে ব্রাজিল যদি তাদের রণকৌশল ও মানসিকতায় বদল আনতে না পারে, তবে হেক্সা মিশনের পাশাপাশি ব্যালন ডি’অরের এই খরাও আরও দীর্ঘ হতে পারে।