‘জেডএফসি ২’-এর রোমাঞ্চকর রাত
ডেইলি সান রিপোর্ট, স্পোর্টস
প্রকাশ: ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:২৬ পিএম
ঘুষি, কিক আর দর্শকদের গর্জনে শুক্রবার (১৮ সেপেটেম্বর) বিকেল থেকেই সরগরম ছিল বসুন্ধরা স্পোর্টস সিটির জুলকান ইনডোর অ্যারেনা। মূল ফটক দিয়ে প্রবেশ করতেই চোখে পড়ে বিশাল ব্যানার।
তাতে টাঙানো সাত দেশ থেকে আসা ফাইটারদের ছবি। এরপর সেই ফাইটারদেরই রিংয়ে একের পর এক লড়াই। গ্যালারিতে উচ্ছ্বাস আর চিৎকার। সব মিলিয়ে বাংলাদেশের ফাইটিং অঙ্গনে জমজমাট এক রাত কাটল।
সাত দেশের ফাইটারদের অংশগ্রহণে তানভীর বসুন্ধরা গ্রুপের (টিবিজি) আয়োজনে শেষ হয়েছে আন্তর্জাতিক কমব্যাট স্পোর্টস প্রতিযোগিতা ‘জুলকান ফাইটিং চ্যাম্পিয়নশিপ’-এর (জেডএফসি) দ্বিতীয় আসর ‘জেডএফসি ২ : প্রাইড অব বাংলাদেশ’। দর্শক গ্যালারিতে বসে লড়াই উপভোগ করেন তানভীর বসুন্ধরা গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আহমেদ ইব্রাহিম সোবহান এবং সানভীর বসুন্ধরা গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এমিল আহমেদ সোবহান।
১০টি বাউটে বাংলাদেশের ফাইটারদের সঙ্গে লড়েছেন থাইল্যান্ড, ইন্দোনেশিয়া, সিঙ্গাপুর, যুক্তরাষ্ট্র, ইরান ও মালয়েশিয়ার ফাইটাররা। পাঁচটি মূল শিরোপাসহ একাধিক বাউটে বিশ্বমঞ্চের অভিজ্ঞ ফাইটারদের মুখোমুখি হয়েছেন বাংলাদেশের তরুণ ও উদীয়মান ফাইটাররা।
পেশাদার বক্সিং, এমএমএ, মুয়াই
থাই এবং দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো বেয়ার-নাকেল বক্সিং—চার ধরনের লড়াইয়ে সাজানো হয়েছিল পুরো আয়োজন।
শুরুর লড়াইয়েই জয়ের স্বাদ পান গাজী আরনাজ। শম্পা ইসলামের বিপক্ষে জয় দিয়ে আসর শুরু করেন তিনি। দ্বিতীয় বাউটে সিঙ্গাপুরের ডোনোভান ম্যাকইনটায়ারকে হারিয়ে জয়ের ধারাবাহিকতা ধরে রাখেন গণদান চাকমা। তৃতীয় বাউটে ডেডি ইমপ্রাক্সের বিপক্ষে জয় তুলে নেন রাকিব হোসেন।
শুরুতেই তিন বাংলাদেশির জয় গ্যালারিতে তৈরি করে বাড়তি উন্মাদনা।
রাতের সবচেয়ে আলোচিত লড়াই ছিল দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো বেয়ার-নাকেল বক্সিং। গ্লাভস ছাড়া তিন রাউন্ডের এই বাউটে মুখোমুখি হন যুক্তরাষ্ট্রের উইল চপ এবং ইরানের মোস্তফা আশোরি। বক্সিংয়ের পরিচিত রীতির বাইরে এমন লড়াই দেখতে দর্শকদের আগ্রহ ছিল চোখে পড়ার মতো। প্রতিটি ঘুষির সঙ্গে গ্যালারি থেকে ভেসে এসেছে উচ্ছ্বাস আর চিৎকার। তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ এই লড়াই শেষে জয় পান যুক্তরাষ্ট্রের উইল চপ। ভিন্ন ধরনের এই লড়াই জেডএফসি ২-এর রাতকে দিয়েছে আলাদা মাত্রা। একই সঙ্গে দেশের কমব্যাট স্পোর্টসে যুক্ত হয়েছে নতুন এক অধ্যায়।
মেইন ইভেন্টে ছিল শিরোপার লড়াই। ডাব্লিউএমও এশিয়া মুয়াই থাই চ্যাম্পিয়নশিপের জন্য বাংলাদেশের মাসজেদুল রেজার প্রতিপক্ষ ছিলেন থাইল্যান্ডের থানাপাত তিথাম। এশিয়ার শক্তিশালী প্রতিপক্ষের বিপক্ষে মাসজেদুলের লড়াই ঘিরে শুরু থেকেই ছিল বাড়তি আগ্রহ। ডাব্লিউএমও এশিয়া মুয়াই থাইয়ের আরেক বাউটে বাংলাদেশের মাসজেদুল রেজা ওমিও লড়েছেন থাইল্যান্ডের থানাপাত তিথামের বিপক্ষে। জয় পান বাংলাদেশের মাসজেদুল।
জেডএফসি মুয়াই থাই চ্যাম্পিয়নশিপেও সাফল্য পেয়েছে বাংলাদেশ। মালয়েশিয়ার এরওয়ান্ডি কালাইকে হারিয়ে শিরোপা উঁচিয়ে ধরেন বাংলাদেশের মুহাম্মদ রাশেদ। আন্তর্জাতিক প্রতিপক্ষের বিপক্ষে তাঁর লড়াইও ছিল দর্শকদের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে।
কো-মেইন ইভেন্টে জেডএফসি বক্সিং চ্যাম্পিয়নশিপের ছয় রাউন্ডের লড়াইয়ে বাংলাদেশের সুরা কৃষ্ণ চাকমার প্রতিপক্ষ ছিলেন ইন্দোনেশিয়ার কুন্দিমাং। বক্সিংয়ের আরেক বাউটে বাংলাদেশের সিরাজুল রাব্বির প্রতিপক্ষ ছিলেন সিঙ্গাপুরের শন রাফায়েল সানি। সেখানে জয় পান সিঙ্গাপুরের ফাইটার। এ ছাড়া হ্যারি হুতাগালংসহ দেশি-বিদেশি ফাইটাররা বিভিন্ন বাউটে অংশ নেন।
নারীদের পেশাদার বক্সিংয়েও ছিল শিরোপার লড়াই। মালয়েশিয়ার মেরেডি মাইকেলকে হারিয়ে নিজের শিরোপা পুনরুদ্ধার করেন বাংলাদেশের সানজিদা জান্নাত। এর আগে জেডএফসি ১-এও লড়াই করেছিলেন তিনি। কঠিন প্রতিপক্ষকে হারিয়ে শিরোপা ফিরে পাওয়ার পর উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেন সানজিদা। কৃতজ্ঞতা জানান পরিবারের প্রতি। তিনি বলেন, ‘আমার খুব ভালো লাগছে। এটা ভাষায় প্রকাশ করতে পারছি না। মেরেডি খুব শক্তিশালী ফাইটার। কঠিন লড়াইয়ের পর তাকে হারাতে পেরেছি। আমার পুরো যাত্রায় যাঁরা পাশে ছিলেন, বিশেষ করে আমার পরিবারকে ধন্যবাদ।’
পেশাদার এমএমএতেও বাংলাদেশের সাফল্য এসেছে। ইন্দোনেশিয়ার ফিলিপুস রাঙ্গার বিপক্ষে লড়েছেন মনজুর আলম। জয় তুলে নিয়ে তিনিও ফিরে পেয়েছেন নিজের শিরোপা। জেডএফসি ১-এর পর এবারও আন্তর্জাতিক প্রতিপক্ষের বিপক্ষে লড়াই করে নিজেদের অবস্থান জানান দিয়েছেন সানজিদা ও মনজুর।
রিংয়ের লড়াইয়ের পাশাপাশি গ্যালারিতেও ছিল বিনোদনজগতের তারকাদের বর্ণিল উপস্থিতি। দর্শকদের উৎসাহ দিতে হাজির হয়েছিলেন জনপ্রিয় ধারাবাহিক ‘ব্যাচেলর পয়েন্ট’-এর অভিনয়শিল্পী জিয়াউল হক পলাশ, মারজুক রাসেল, চাষী আলম, মুসাফির সাঈদ বাচ্চু এবং পরিচালক কাজল আরেফিন অমি। এ ছাড়া লড়াই উপভোগ করতে উপস্থিত ছিলেন অভিনেত্রী তাসনিয়া ফারিণ, সংগীতশিল্পী জেফার রহমান, উপস্থাপক রাফসান শাবাবসহ দেশের শীর্ষস্থানীয় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের তারকারা।
চলতি বছরের এপ্রিলে ‘জেডএফসি ১ : দ্য টেকওভার’ সফলভাবে আয়োজনের পর এবার হলো দ্বিতীয় আসর। দেশের ফাইটারদের আন্তর্জাতিক প্রতিপক্ষের বিপক্ষে লড়াইয়ের সুযোগ তৈরি করা এবং বাংলাদেশে পেশাদার ফাইটিংয়ের পরিসর বাড়ানোই ছিল আয়োজনটির অন্যতম লক্ষ্য। বসুন্ধরা স্পোর্টস সিটিকে কেন্দ্র করে এমন আন্তর্জাতিক আয়োজন স্থানীয় ফাইটারদের পেশাদার সুযোগ তৈরির পাশাপাশি বিশ্ব ক্রীড়াঙ্গনে বাংলাদেশের কমব্যাট স্পোর্টসকে পরিচিত করার নতুন পথ তৈরি করছে।
দেশি-বিদেশি ফাইটারদের লড়াই, বেয়ার-নাকেল বক্সিংয়ের নতুন অভিজ্ঞতা, শিরোপার উত্তেজনা আর গ্যালারির তারকাদের উপস্থিতিতে তাই শুধু একটি প্রতিযোগিতা নয়, বাংলাদেশের ফাইটিং অঙ্গনে আলাদা এক রাতের সাক্ষী হয়ে থাকল ‘জেডএফসি ২: প্রাইড অব বাংলাদেশ’।