EN ☀️
×

Follow Us

খেলা

আধুনিক ফুটবলের ব্যাকরণ বদলে যেভাবে ‘গোল্ডেন বল’ জিতলেন রদ্রি

মেসিকে বারবার থামিয়েছেন, ফাইনালে ৬৮% বল দখলের নেপথ্য স্থপতিও রদ্রি

ইমন ইসলাম

ইমন ইসলাম

প্রকাশ: ২০ জুলাই ২০২৬, ০৭:১৭ এএম

আধুনিক ফুটবলের ব্যাকরণ বদলে যেভাবে ‘গোল্ডেন বল’ জিতলেন রদ্রি

গোল-অ্যাসিস্ট ছাড়াই বিশ্বকাপের গোল্ডেন বল জিতে ইতিহাস গড়লেন স্পেনের রদ্রি। ছবি: সংগৃহীত

অ অ

ফুটবল মানেই কি কেবল গোল আর অ্যাসিস্টের ঝলকানি? গোলদাতাই কি সব আলো কেড়ে নেবেন? ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের ফাইনাল শেষে এই সনাতন ফুটবলীয় ধারণাকে পুরোপুরি চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দিলেন একজন স্প্যানিশ চাণক্য—রদ্রি। আর্জেন্টিনার বিপক্ষে ফাইনালে অতিরিক্ত সময়ের নাটকীয় জয়ে স্পেনের বিশ্বকাপ পুনরুদ্ধারের রাতে পুরো ফুটবল বিশ্বের চোখ কপালে তুলেছেন ম্যানচেস্টার সিটির এই রক্ষণাত্মক মিডফিল্ডার। 

পুরো টুর্নামেন্টে তার নামের পাশে নেই কোনো গোল, নেই কোনো অ্যাসিস্ট; অথচ লিওনেল মেসি কিংবা কিলিয়ান এমবাপ্পের মতো গোলমেশিনদের পেছনে ফেলে ফিফার টেকনিক্যাল কমিটির সর্বসম্মত রায়ে বিশ্বকাপের সেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কার ‘গোল্ডেন বল’ উঠেছে রদ্রির হাতে।

আধুনিক ফুটবলে একজন ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডারকে বলা হয় দলের ‘ইঞ্জিনরুম’। রদ্রি পুরো টুর্নামেন্টে স্পেনের রক্ষণভাগ ও আক্রমণভাগের মধ্যে এক অদৃশ্য সেতু হিসেবে কাজ করেছেন। প্রতিপক্ষের আক্রমণ মাঝমাঠেই ভেস্তে দেওয়া, নিখুঁত ট্যাকল এবং বল কেড়ে নেওয়ার পরিসংখ্যানে রদ্রি ছিলেন টুর্নামেন্টের সবার সেরা। তার পজিশনিং সেন্স বা মাঠের কোথায় কখন থাকতে হবে, সেই জাদুকরী ক্ষমতার কারণে স্পেনের রক্ষণভাগকে কখনো আলগা মনে হয়নি। ফাইনাল ম্যাচেও লিওনেল মেসি যখনই নিচে নেমে বল নিয়ে ওপরে ওঠার চেষ্টা করেছেন, রদ্রির শারীরিক ও বুদ্ধিমত্তার ডিফেন্সের সামনে বারবার খেই হারিয়েছেন।

গোল করা বা করানো ফরোয়ার্ডদের কাজ হতে পারে, কিন্তু সেই গোলের সুযোগটা তৈরি করার জন্য যে পুরো মাঠের নিয়ন্ত্রণ দরকার, তা একাই করেছেন রদ্রি। ফাইনাল ম্যাচে স্পেনের ৬৮% বল পজিশন এবং ৯০% নিখুঁত পাসের পেছনের মূল স্থপতি ছিলেন তিনি। রদ্রি হলেন ফুটবল মাঠের ‘মেট্রোনম’—অর্থাৎ খেলা কখন ধীরগতিতে চলবে আর কখন কাউন্টার অ্যাটাকে গতি বাড়াতে হবে, তা রদ্রির পায়ের পাসই ঠিক করে দিয়েছে। প্রতিপক্ষের ৩-৪ জন খেলোয়াড় হাই-প্রেসিং করলেও রদ্রি অত্যন্ত ঠাণ্ডা মাথায় বল নিজের নিয়ন্ত্রণে রেখে নিখুঁত বিল্ড-আপ পাস দিয়েছেন, যা প্রতিপক্ষকে মানসিকভাবে ক্লান্ত করে ফেলেছিল।

লুইস দে লা ফুয়েন্তের ২০২৬ বিশ্বকাপের স্প্যানিশ ট্যাকটিক্স গড়ে উঠেছিল রদ্রিকে কেন্দ্র করে। লামিন ইয়ামাল বা নিকো উইলিয়ামসের মতো তরুণ উইঙ্গাররা যে নির্ভয়ে ওপরে উঠে আক্রমণ করতে পেরেছেন, তার একমাত্র কারণ তাদের পেছনে ভরসা হিসেবে দাঁড়িয়ে ছিলেন রদ্রি। তিনি একা মাঝমাঠ সামলানোর ফলে স্পেনের বাকি মিডফিল্ডাররা আক্রমণের স্বাধীনতা পেয়েছেন। ফুটবলের ভাষায় একে বলা হয় ‘দ্য আনসাং হিরো’ বা প্রচারের আড়ালে থাকা নায়ক, যার উপস্থিতি ছাড়া দলের পুরো কৌশলই ধসে পড়ে।

ফিফার টেকনিক্যাল কমিটির বিশেষজ্ঞরা প্রাইজমানি ও পুরস্কারের ক্ষেত্রে শুধু গোল-অ্যাসিস্ট দেখেন না, তারা দেখেন ‘ইমপ্যাক্ট অন দ্য গেম’ বা ম্যাচে একজন খেলোয়াড়ের সামগ্রিক প্রভাব। রদ্রি মাঠে থাকা অবস্থায় স্পেন গড়ে প্রতি ম্যাচে প্রতিপক্ষের চেয়ে ৪ গুণ বেশি ফাইনাল থার্ডে পাস দিতে পেরেছে। ফাইনালে আর্জেন্টিনার এনজো ফার্নান্দেজ এবং রদ্রিগোর মতো বিশ্বমানের মিডফিল্ডকে রদ্রি কার্যত একাই স্তব্ধ করে দিয়েছিলেন। পরিসংখ্যানের খাতায় গোল বা অ্যাসিস্ট না থাকলেও, প্রতিটা গোলের আগের ৩ বা ৪ নম্বর পাসটি আসতো রদ্রির পা থেকেই।

রদ্রির এই গোল্ডেন বল জয় ফুটবলের একটি বড় জয়। এটি প্রমাণ করে যে ফুটবল শুধু স্কোরবোর্ডের খেলা নয়; এটি স্পেস তৈরি করা, বল হোল্ড করা এবং পুরো ৯০ বা ১২০ মিনিট মাঠের রাজত্ব ধরে রাখার খেলা। ফরোয়ার্ডদের একক আধিপত্যের যুগে একজন ট্র্যাডিশনাল মিডফিল্ডারের এই বিশ্বসেরা হওয়া আগামী প্রজন্মের ফুটবলারদের খেলার ধরন বুঝতে নতুন করে অনুপ্রেরণা জোগাবে।

গোল-অ্যাসিস্ট ছাড়াও যারা হয়েছেন বিশ্বকাপ সেরা

ফুটবল বিশ্বে সাধারণত ফরোয়ার্ড বা গোলদাতাদেরই টুর্নামেন্ট সেরার পুরস্কার ‘গোল্ডেন বল’ পেতে দেখা যায়। তবে ২০২৬ বিশ্বকাপে স্পেনের রদ্রির মতো গোল বা অ্যাসিস্টের চটকদার পরিসংখ্যান ছাড়াই বিশ্বসেরা হওয়ার নজির ফুটবল ইতিহাসে আরও রয়েছে। রদ্রির এই ঐতিহাসিক কীর্তি মনে করিয়ে দিচ্ছে অতীতের আরও কিছু কিংবদন্তিকে।

গোলরক্ষক অলিভার কান ২০০২ বিশ্বকাপে গোল্ডেন বল জেতেন। একজন গোলকিপার হিসেবে তার পক্ষে গোল বা অ্যাসিস্ট করা সম্ভব ছিল না, কিন্তু পুরো টুর্নামেন্টে চীনের প্রাচীর হয়ে দাঁড়িয়ে তিনি জার্মানিকে একাই ফাইনালে তুলেছিলেন। গোলপোস্টের নিচে তার সেই অতিমানবীয় পারফরম্যান্সের কারণেই ফিফা তাকে টুর্নামেন্ট সেরা ঘোষণা করে।

২০০৬ বিশ্বকাপে ফ্রান্সের জিনেদিন জিদান পেনাল্টি থেকে ৩টি গোল করলেও, প্লে-মেকার বা মাঝমাঠের প্রধান চালিকাশক্তি হওয়া সত্ত্বেও পুরো টুর্নামেন্টে অফিসিয়ালি তার নামের পাশে কোনো অ্যাসিস্ট ছিল না। মূলত অ্যাসিস্টের পরিসংখ্যানে খাতা শূন্য থাকলেও মাঠে তার জাদুকরী নিয়ন্ত্রণ ও প্রভাবের কারণেই তাকে গোল্ডেন বল দেওয়া হয়েছিল।

২০১৮ বিশ্বকাপে ক্রোয়েশিয়াকে ফাইনালে তোলার মূল কারিগর লুকা মদ্রিচ গোল্ডেন বল জেতেন। পুরো টুর্নামেন্টে মদ্রিচের মাত্র ২টি গোল এবং ১টি অ্যাসিস্ট ছিল। তবে নকআউটের মহাগুরুত্বপূর্ণ ম্যাচগুলোতে গোল বা অ্যাসিস্টের খাতায় অবদান না রাখলেও, রদ্রির মতোই মাঝমাঠ নিয়ন্ত্রণ করার অসামান্য দক্ষতার কারণে তিনি টুর্নামেন্ট সেরা হন।

তবুও কেন রদ্রির রেকর্ডটি সবচেয়ে আলাদা?

পূর্ববর্তী মিডফিল্ডার বা ফরোয়ার্ডরা কোনো না কোনোভাবে স্কোরবোর্ডে গোল হিসেবে অবদান রেখেছিলেন। কিন্তু রদ্রি হলেন আধুনিক ফুটবল ইতিহাসের প্রথম প্রথাগত ‘ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার’, যিনি সম্পূর্ণ শূন্য গোল এবং শূন্য অ্যাসিস্ট নিয়ে বিশ্বের সবচেয়ে বড় টুর্নামেন্টের সেরা খেলোয়াড় হলেন। তিনি গোল করার চেয়ে প্রতিপক্ষের আক্রমণ ধ্বংস করা এবং টুর্নামেন্টে সবচেয়ে বেশি সফল পাস দেওয়ার অনন্য রেকর্ড গড়ে এই পুরস্কার নিজের করে নিয়েছেন।

আরও পড়ুন