দুই লিওনেলের গল্প—যা শেষ হচ্ছে না ফাইনালেও
এক ফোনকল, দুই অবিশ্বাসের পাত্র, আর আট বছরে গড়া ইতিহাস—মেসি ও স্কালোনির গল্প এবার পৌঁছেছে বিশ্বকাপ ফাইনালে
স্কালোনির কৌশল, মেসির নেতৃত্ব! যে জুটিতে লেখা হয়েছে আর্জেন্টিনার বিশ্বজয়ের ইতিহাস, শেষ প্রেস কনফারেন্সেও পাশাপাশি দুই নায়ক। ছবি: এপি
একজনের বয়স ৩৯, আরেকজনের ৪৮। একজন বল পায়ে নাচেন, আরেকজন দাঁড়িয়ে থাকেন ডাগআউটের কোণে, প্রায় নিঃশব্দে। দুজনেরই নাম লিওনেল। আগামী, ২০ জুলাই সোমবার, মেটলাইফ স্টেডিয়ামে যখন আর্জেন্টিনা নামবে স্পেনের বিপক্ষে বিশ্বকাপ ফাইনালে, তখন এই দুই লিওনেলের গল্পটাও পৌঁছাবে তার শেষ অধ্যায়ে—অথবা হয়তো নতুন এক শুরুতে।
গল্পটা শুরু ২০১৮ সালে, দুজনের জন্যই কঠিন এক সময়ে। একদিকে মেসি। রাশিয়া বিশ্বকাপের ব্যর্থতার পর জাতীয় দলের হয়ে তাঁর ওপর ভরসা তলানিতে। ক্লাবে ঝলমলে, দেশের জার্সিতে যেন হারিয়ে যান।
অন্যদিকে স্কালোনি। কোচ হোর্হে সাম্পাওলি বিদায় নেওয়ার পর আর্জেন্টিনা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন যখন দিশাহারা, তখন দায়িত্ব গিয়ে পড়ে তাঁরই সহকারীর কাঁধে— এমন একজন, যাঁর সিনিয়র পর্যায়ে কোনো দল সামলানোর অভিজ্ঞতাই নেই। দিয়েগো ম্যারাডোনা পর্যন্ত হেসে বলেছিলেন, স্কালোনি ভালো ছেলে, কিন্তু রাস্তার ট্রাফিকও সামলাতে পারবেন না তিনি।
একজনকে নিয়ে সন্দেহ, আরেকজনকে নিয়ে ঠাট্টা। দুই লিওনেলেরই তখন প্রমাণ করার ছিল অনেক কিছু।
নিজের নিয়োগ আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা হওয়ার আগেই স্কালোনি ফোন করেছিলেন মেসিকে। সহজ পথ ছিল তরুণদের নিয়ে নতুন দল গড়া, মেসিকে কিছুটা আড়ালে রেখে। স্কালোনি সেই পথে হাঁটেননি।

মেসি ফোনে হেসেছিলেন, খুশি হয়েছিলেন, জানিয়েছিলেন শুভকামনা। স্কালোনি বলেছিলেন, দল তাঁর জন্যই অপেক্ষা করছে।
সেই মুহূর্ত থেকেই দুই লিওনেলের গল্প এক হয়ে যায়। একজন খেলোয়াড়, একজন কোচ—কিন্তু আসলে দুজনেই ছিলেন একরকম মানুষ, নিজেদের প্রমাণ করার তাগিদে জ্বলতে থাকা।
স্কালোনি বড় নাম নয়, বরং একে অপরকে বিশ্বাস করা এক তরুণ দল গড়ে তোলেন। মেসির ওপর বাড়তি বোঝা না চাপিয়ে তাঁর চারপাশে বসান এমন খেলোয়াড়, যাঁরা মাঠে তাঁর জন্য জায়গা করে দেন। এই দলটাই পরে পরিচিত হয় ‘স্কালোনেতা’ নামে।
আর মেসি? তিনি দিলেন সেই বিশ্বাসের প্রতিদান—মাঠে। নেতৃত্ব দিতে শুরু করলেন কথায় নয়, খেলায়।
মেসি নিজেই পরে বলেছেন, স্কালোনির সবচেয়ে বড় গুণ তাঁর সরলতা— প্রতিটি খেলোয়াড়ের সঙ্গে সরাসরি কথা বলার অভ্যাস। স্কালোনিও একবার স্বীকার করেছিলেন, মেসির সঙ্গে আলোচনা ছাড়া কোনো সিদ্ধান্ত নেন না তিনি। একজন কোচ আর একজন অধিনায়ক নন যেন তাঁরা— দুই সমান অংশীদার, একই লক্ষ্যে হাঁটছেন।
২০১৯ কোপা আমেরিকায় তৃতীয় হওয়া দিয়ে শুরু। ২০২১ সালে ভাঙে ২৮ বছরের অপেক্ষা— প্রথম শিরোপা দুই লিওনেলের। এরপর ২০২২ কাতার বিশ্বকাপ। ৩৬ বছরের অপেক্ষার অবসান। মেসি প্রথমবার হাতে তোলেন অধরা সেই ট্রফি, স্কালোনি পান বর্ষসেরা কোচের স্বীকৃতি।
সাত বছরে মাত্র তিনটি ম্যাচ হেরেছেন স্কালোনি, জিতেছেন চারটি বড় শিরোপা। এই রেকর্ড একার নয়—দুই লিওনেলের যৌথ অর্জন।
চার বছর পর, আবার সেই মঞ্চে দুজনে। প্রতিপক্ষ স্পেন। জিতলে আর্জেন্টিনা হবে টানা দুইবার বিশ্বকাপজয়ী দল, মেসি হবেন প্রথম অধিনায়ক যিনি অধিনায়ক হিসেবেই দুইবার বিশ্বকাপ জিতলেন।
৩৯ বছর বয়সেও মেসির পরিসংখ্যান অবিশ্বাস্য— বিশ্বকাপ ইতিহাসে ৩৩ ম্যাচে ৩৩ গোলে সরাসরি অবদান, যা সর্বকালের রেকর্ড। ফাইনালে একটি গোল করলেই তিনি হবেন বিশ্বকাপ ফাইনালের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি বয়সে গোলদাতা।
আর স্কালোনি? তিনি আজও দাঁড়াবেন সেই একই জায়গায়— সাইডলাইনে, চিৎকার-নাটকীয়তা ছাড়া, মেসিকে বদলাতে নয়, বরং তাঁর প্রতিভাকে সবচেয়ে ভালোভাবে কাজে লাগাতে চাওয়া এক নীরব স্থপতির মতো।
আট বছর আগে একজনকে নিয়ে সন্দেহ ছিল, আরেকজনকে নিয়ে ঠাট্টা। আজ দুজনেই দাঁড়িয়ে ইতিহাসের দ্বারপ্রান্তে—একসঙ্গে। একজন মাঠের রাজা, আরেকজন সাইডলাইনের নীরব স্থপতি।
সোমবার মেটলাইফ স্টেডিয়ামে ফলাফল যা-ই হোক না কেন, দুই লিওনেলের এই গল্পটা আর্জেন্টিনা ফুটবলের ইতিহাসে লেখা থাকবে চিরকাল—কারণ এটা কখনোই শুধু একটা ম্যাচের গল্প ছিল না।