ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬: আর্থিকভাবে কে লাভবান, কার লোকসান?
বিশ্বকাপের মাঠের লড়াই ছাপিয়ে কোটি ডলারের অসম বাণিজ্য যুদ্ধ, জেনে নিন লাভ-ক্ষতির খতিয়ান
ডেইলি সান রিপোর্ট
প্রকাশ: ১৭ জুলাই ২০২৬, ০৮:৩৮ পিএম
মাঠের ট্রফির আড়ালে চলছে বিলিয়ন ডলারের আরেক প্রতিযোগিতা—প্রতীকী ছবি
আগের যেকোনো আসরের চেয়ে অনেক বড় পরিসরে অনুষ্ঠিত হচ্ছে ২০২৬ বিশ্বকাপ। বেশি দেশ অংশ নেওয়ায় বেড়েছে ম্যাচের সংখ্যা, যা কোটি কোটি দর্শকের নজর কাড়ার পাশাপাশি খুলে দিয়েছে বিপুল অর্থ আয়ের পথও। মাঠের খেলায় ফুটবল তারকারা যখন ইতিহাস গড়ছেন, মাঠের বাইরে তখন তৈরি হচ্ছে কোটি কোটি ডলারের বাণিজ্য। তবে এই বিশাল অর্থ-যজ্ঞের সুফল সবাই সমানভাবে পাচ্ছেন না—কেউ এই আয়োজন থেকে বিপুল মুনাফা ঘরে তুলছেন, আবার আর্থিক লোকসানের তালিকায়ও যুক্ত হচ্ছে অনেকের নাম।
বিশ্ব ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফা বিশ্বকাপ থেকে যে পরিমাণ অর্থ আয় করে, তা এককথায় আকাশচুম্বী। ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপ থেকে সংস্থাটি রেকর্ড ৭৬০ কোটি ডলার আয় করেছিল। যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোয় আয়োজিত এবারের বিশ্বকাপে সেই রেকর্ডও ছাড়িয়ে যাবে বলে আশা করা হচ্ছে, বিশেষ করে ৪৮ দলের অংশগ্রহণের কারণে আয়ের পরিমাণ বাড়বে অনেকখানি।
ডয়চে ব্যাংক রিসার্চের সিনিয়র স্ট্র্যাটেজিস্ট মারিয়ন লাবুরে বলেন, চার বছরের চক্রে ফিফার আয় প্রায় ১ হাজার ৩০০ কোটি ডলারে পৌঁছানোয় তারা নিঃসন্দেহে সবচেয়ে বড় লাভবান পক্ষ। মূলত সম্প্রচার স্বত্ব, লাইসেন্সিং, হসপিটালিটি রাইটস, স্পনসরশিপ ও টিকিট বিক্রি থেকে ফিফার এই বিশাল আয় আসে।
ভবিষ্যৎ টুর্নামেন্টগুলোতে এই বাণিজ্যিক তৎপরতা আরও বাড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ফিফা এই টুর্নামেন্টকে আরও বাড়িয়ে ৬৪ দলে উন্নীত করার কথা ভাবছে, যাতে চীন ও ভারতের মতো দেশও অন্তর্ভুক্ত হতে পারে। তা হলে যুক্ত হবে আরও কোটি কোটি নতুন দর্শক ও বিপুল অর্থ।
বিশ্বকাপ দেখার মাধ্যমে কোটি কোটি সমর্থকের আজীবনের স্বপ্ন পূরণ হলেও, আর্থিক দিক থেকে বিচার করলে এই টুর্নামেন্ট তাদের জন্য ছিল বেশ কঠিন।
চাহিদা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে টিকিটের দাম বাড়িয়ে দেওয়ার "ডাইনামিক প্রাইসিং স্ট্র্যাটেজি"র কারণে ফিফাকে পড়তে হয়েছে ব্যাপক সমালোচনার মুখে। এমনকি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও স্বীকার করেছেন, প্যারাগুয়ের বিপক্ষে তার নিজের দেশের উদ্বোধনী ম্যাচের ১ হাজার ডলার মূল্যের টিকিট নিয়ে জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেন, এত টাকা তিনি দেবেন না।
অবশ্য টিকিটের এই আকাশচুম্বী দামের পক্ষে সাফাই দিয়েছেন ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো। তার মতে, যুক্তরাষ্ট্রের অন্যান্য বড় ক্রীড়া ইভেন্টের টিকিটের দামের সঙ্গেই এটি সংগতিপূর্ণ। টিকিটের বাইরেও বিমান ভাড়া, খাবার ও হোটেলের পেছনে পকেট ফাঁকা করতে হয়েছে ভক্তদের।
সম্প্রচারকারীদের এই টুর্নামেন্ট দেখানোর স্বত্ব কিনতে বিপুল অর্থ খরচ করতে হলেও, দর্শকসংখ্যা ও নিজেদের ব্র্যান্ড তুলে ধরতে স্পনসরদের আগ্রহের কারণে বিজ্ঞাপন বিক্রি থেকে বিশাল মুনাফা করেছে তারা।
এবারের বিশ্বকাপে ফিফা চালু করেছে বহুল আলোচিত ‘হাইড্রেশন ব্রেক’। ফিফা প্রধান একে ‘পুরোপুরি ক্রীড়া সংশ্লিষ্ট বিষয়’ বলে দাবি করলেও, খেলোয়াড়দের পানি পানের জন্য দেওয়া তিন মিনিটের এই বিরতি সম্প্রচারকারী ও স্পনসরদের জন্য এনে দিয়েছে নতুন এক বাণিজ্যিক সুযোগ।
যুক্তরাষ্ট্রে সম্প্রচার স্বত্ব পাওয়া ফক্স স্পোর্টস স্বত্ব কিনতে প্রায় ৪৮ কোটি ৫০ লাখ ডলার খরচ করেছিল, আর তারা এই বিরতিগুলোকে নির্দিষ্ট ব্র্যান্ডের ‘স্পনসরড বাই’ বিজ্ঞাপন হিসেবে প্রচার করেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ফক্স স্পোর্টসে বিশ্বকাপের ৩০ সেকেন্ডের একটি বিজ্ঞাপনের গড় মূল্য ২ থেকে ৩ লাখ ডলার, যা যুক্তরাষ্ট্রের নকআউট পর্বের ম্যাচগুলোর সময় ঠেকেছিল সাড়ে ৭ লাখ ডলারে।
ডয়চে ব্যাংক রিসার্চের লাবুরে বলেন, হাইড্রেশন ব্রেক পুরোপুরি বিজ্ঞাপনের একটি বড় ক্ষেত্র, যা ভবিষ্যতে বাদ দেওয়া হলে তিনি অবাক হবেন। তার মতে, টুর্নামেন্টের এই বড় আকার বজায় থাকবে, কারণ ব্যবসাই এখন ফিফার মূল মডেল।
বিশ্বকাপের অফিশিয়াল স্পনসররা টুর্নামেন্টের সঙ্গে নিজেদের নাম জড়াতে অবিশ্বাস্য অঙ্কের অর্থ ব্যয় করে। অ্যাডিডাস ও কোকা-কোলার মতো ব্র্যান্ডের লোগো মাঠের সর্বত্র থাকায় দিনশেষে তারা আর্থিকভাবে ব্যাপক লাভবান হয়।
জার্মান ক্রীড়াসামগ্রী প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান অ্যাডিডাস তাদের চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী নাইকির সঙ্গে তীব্র প্রতিযোগিতায় লিপ্ত রয়েছে। লামিন ইয়ামাল, জুড বেলিংহাম ও লিওনেল মেসিকে নিয়ে নির্মিত তাদের ‘ব্যাকইয়ার্ড লিজেন্ডস’ বিজ্ঞাপনের পেছনেই ব্যয় হয়েছে প্রায় ৫ কোটি পাউন্ড। এই বিজ্ঞাপনে সাবেক তারকা ডেভিড বেকহামের একটি এআই সংস্করণও ব্যবহার করা হয়েছে।
এক দশকেরও বেশি সময় আগে ফুটবল জুতো তুলে রাখলেও বেকহাম এখনো মার্কিন ফুটবলের মূল মুখ। তার যৌথ মালিকানাধীন ক্লাব ইন্টার মায়ামি বর্তমানে মেজর লিগ সকারের সবচেয়ে মূল্যবান ফ্র্যাঞ্চাইজি, যার আনুমানিক মূল্য ১৪৫ কোটি ডলার। মাঠের খেলায় তিনি বিশ্বকাপ ছুঁয়ে দেখতে না পারলেও, মাঠের বাইরের বাণিজ্যিক খেলায় তিনি নিশ্চিতভাবেই একজন বড় বিজয়ী।
যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোর ১৬টি আয়োজক শহর ভক্ত ও পর্যটকদের সমাগমকে স্বাগত জানিয়েছে, যা হোটেল, রেস্তোরাঁ ও স্থানীয় ব্যবসায় কিছুটা গতি এনেছে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আয়োজক শহরগুলোর দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক সুবিধা আসলে যৎসামান্য।
ফিফার অনুমান, এই বিশ্বকাপের ফলে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে যুক্ত হবে প্রায় ৪ হাজার ১০০ কোটি ডলার, যার মধ্যে শুধু যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিতেই যুক্ত হবে ১ হাজার ৭০০ কোটি ডলার এবং মূলত হোটেল ও আতিথেয়তা খাতে তৈরি হবে প্রায় ১ লাখ ৮৫ হাজার কর্মসংস্থান।
তবে অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটির ফেলো ও অক্সফোর্ড গ্লোবাল প্রজেক্টসের প্রধান নির্বাহী আলেকজান্ডার বুডজিয়ার মনে করেন, এত বড় ক্রীড়া ইভেন্ট আয়োজনের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক সুবিধাগুলো শেষ পর্যন্ত বাস্তবে রূপ নেয় না। তার মতে, আয়োজক শহরগুলোতে সাধারণত পর্যটকের সংখ্যা উল্টো কমে যায়, কারণ অনেকে টুর্নামেন্টের সময়কার যানজট ও বিশৃঙ্খলা এড়াতে চান। কর্মসংস্থান বাড়লেও তা সাধারণত হোটেল বা আতিথেয়তা খাতের কম বেতনের কাজের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে।
এবারের আয়োজনে হোটেল রুমের যে বিপুল চাহিদার আশা করা হয়েছিল, বাস্তবে তা দেখা যায়নি। বিভিন্ন শিল্প সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের তুলনায় আয়োজক শহরগুলোতে বুকিংয়ের হার ছিল বেশ কম।
ব্রিটিশ কলাম্বিয়া হোটেল অ্যাসোসিয়েশন জানিয়েছে, কানাডার ভ্যানকুভারে সাতটি ম্যাচ অনুষ্ঠিত হওয়া সত্ত্বেও জুন ও জুলাই মাসের বুকিংয়ের গতি বিগত বছরগুলোর চেয়ে অনেক ধীর ছিল। সংস্থাটির মতে, এই ধরনের টুর্নামেন্ট টানা ৪০ দিন ধরে হোটেলের সব রুম বুকড রাখতে পারে না, বরং নির্দিষ্ট কিছু ম্যাচের তারিখের আশপাশেই কেবল উচ্চ চাহিদা তৈরি করে।
মার্কিন হোটেল মালিকদের জন্যও বিশ্বকাপের আগের উন্মাদনা কাঙ্ক্ষিত ফল বয়ে আনেনি। আমেরিকান হোটেল অ্যান্ড লজিং অ্যাসোসিয়েশন ফিফার বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলেছে, সংস্থাটি নিজেদের ব্যবহারের জন্য আগেই অতিরিক্ত রুম বুক করে রেখেছিল, যা কৃত্রিম চাহিদা তৈরি করেছিল। ফিফা অবশ্য এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
২০২৬ বিশ্বকাপ ইতিহাসের সবচেয়ে বড় জুয়া বা বাজির আসর হিসেবে রেকর্ড গড়তে যাচ্ছে। জুয়া শিল্পে যুক্ত আর্থিক সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান ম্যাককুয়ারির মতে, এবারের আসরে আনুমানিক ৫ হাজার কোটি ডলারের বাজি ধরা হতে পারে—অর্থাৎ প্রতি ম্যাচে গড়ে প্রায় ৫০ কোটি ডলারের বাজি। প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, দল সংখ্যা বৃদ্ধির কারণেই এমনটি ঘটছে।
প্যাডি পাওয়ার, বেটফেয়ার ও স্কাই বেটের মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান ফ্লাটার এন্টারটেইনমেন্ট পূর্বাভাস দিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রাজিলে জুয়ার বাজার সম্প্রসারিত হওয়ায় এবার বাজির পরিমাণ আগের বিশ্বকাপের তুলনায় দ্বিগুণ হবে।